Skip to main content

Ridge Bangla

পরকীয়া: যে নীরব, বর্ধিষ্ণু ক্যান্সারে আক্রান্ত গোটা জাতি

পরিবারকেন্দ্রিক বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক বাস্তবতায় দাম্পত্য সম্পর্ক যুগ যুগ ধরে বিশ্বাস, দায়িত্ব ও আত্মিক বন্ধনের ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে রয়েছে। কিন্তু সম্প্রতি সেই কাঠামোতে দৃশ্যমান পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিশেষ করে, বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক বা পরকীয়ার প্রবণতা বৃদ্ধির মাধ্যমে এটি এখন শুধু ব্যক্তিগত সম্পর্কের সমস্যা নয়, বরং সামাজিক, মানসিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হয়ে উঠেছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রকাশিত এক জরিপ অনুযায়ী, দেশে বিবাহবিচ্ছেদের অন্যতম প্রধান কারণ এখন পরকীয়া। জরিপে দেখা গেছে, মোট বিবাহবিচ্ছেদের প্রায় ২৩ শতাংশ ক্ষেত্রে পরকীয়া সরাসরি দায়ী। ঢাকা বিভাগে পরকীয়ার ফলে হওয়া বিবাহবিচ্ছেদের হার সবচেয়ে বেশি- ২৮.৩ শতাংশ। বিবাহবিচ্ছেদের ক্ষেত্রে এরপরই রয়েছে দাম্পত্যজীবন পালনে অক্ষমতা, যার হার ২২ শতাংশ। ২০০৬ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে দেশে বিবাহবিচ্ছেদের হার ০.৬ থেকে বেড়ে ১.৪-এ পৌঁছেছে, যা সম্পর্কের ভাঙনের পেছনে নতুন বাস্তবতার ইঙ্গিত দেয়।

উল্লেখ্য, বাংলাদেশে কেন বিবাহবিচ্ছেদ বাড়ছে- এ বিষয়ে জানতে চাইলে আমাদের প্রকাশিত ‘বাড়ছে বিবাহবিচ্ছেদ: সমাজ পরিবর্তনের প্রতিচ্ছবি না সংকটের সংকেত?’ লেখাটি পড়তে পারেন। চলুন, ফেরা যাক মূল আলোচনায়; খুঁজে দেখি কেন বাড়ছে পরকীয়া?

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দাম্পত্য সম্পর্কের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা ও সম্মান কমে যাওয়াই পরকীয়ার অন্যতম প্রধান কারণ। সম্পর্ক যখন ‘অনাস্থা ও হতাশার ওপর দাঁড়ায়’, তখন মানুষ বিকল্প সম্পর্কের দিকে ঝুঁকে পড়ে। যৌথ পরিবারগুলো ভেঙে একক পরিবারে রূপান্তরের মাধ্যমে সামাজিক নিয়ন্ত্রণ কমেছে। ফলে ব্যক্তিগত স্বাধীনতা বাড়লেও সম্পর্কের দায়বদ্ধতা অনেক ক্ষেত্রে কমে যাচ্ছে।

বিদেশে বা দূরে কোথাও কর্মরত থাকার কারণে স্বামী-স্ত্রীর একে অপরের থেকে দীর্ঘদিন আলাদা থাকতে হচ্ছে। এটাও পরকীয়ার একটি কারণ হিসেবে উঠে এসেছে। কারণ, দীর্ঘ সময় ধরে স্বামী-স্ত্রী একজন অপরজনের কাছ থেকে দূরে থাকার ফলে তাদের মধ্যে শারীরিক ও মানসিক দূরত্ব তৈরি হয়। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, এমন অবস্থায় দৈহিক চাহিদা মেটাতে গিয়েও অনেকে জড়িয়ে পড়ছেন পরকীয়ার মতো সম্পর্কে। অন্য এক জরিপে দেখা গেছে, দাম্পত্য জীবন চালিয়ে যাওয়ার অক্ষমতাও একটি বড় কারণ, যা পরোক্ষভাবে পরকীয়াকে উৎসাহিত করে।

নিজেকে স্বাধীনচেতা মনে করে একঘেয়ে সংসার থেকে বেরিয়ে নতুন কিছু অনুভবের উদ্দেশ্যে অনেকে পরকীয়ায় জড়াচ্ছেন। তবে এখানে উদ্বেগেরও বিষয় আছে। গবেষণা বলছে, এ ধরনের সম্পর্কগুলো সাধারণত বেশি সময় টেকে না। দায়িত্ব আর দুশ্চিন্তার ভারে ক্লান্ত হয়ে অনেক মানুষ সম্পর্কের বাইরে গিয়ে নতুন আশ্রয় খোঁজেন। বিপরীত লিঙ্গ হলে সেটাই হয়ে যায় পরকীয়া।

অনেক মানুষ আছেন, যারা বারবার প্রেমে পড়তে অভ্যস্ত। এক্ষেত্রে তাদের সঙ্গী যত ভালোই হোক, তারা নতুন সম্পর্কে জড়িয়ে পড়বেনই। সামাজিক মর্যাদা বা আর্থিক সুবিধার জন্যও কেউ কেউ পরকীয়ার মতো সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন।

অল্প বয়সে বিয়ে হয়ে যাওয়া পরকীয়ার একটি বড় কারণ। পরিণত বয়সের আগেই যাদের বিয়ে হয়, তাদের একটি অংশ পরিণত বয়সে এসে অনুভব করেন যে সে সময় না বুঝে ভুল করে ফেলেছেন। এই ধরনের চিন্তাভাবনা থেকে তাদের মধ্যে পরে অন্য কারও সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ার প্রবণতা বেশি দেখা যায়।

তবে এখন সমাজে পরকীয়া এভাবে বেড়ে যাওয়ার পেছনে অন্যতম কারণ আধুনিক প্রযুক্তি ও এর বিভিন্ন উপাদান। মোবাইল ফোন, হোয়াটসঅ্যাপ, ফেসবুক, ইন্টারনেটসহ বিভিন্ন কমিউনিকেশন অ্যাপস আমাদের সামনে হাজির করেছে হাজার হাজার বিকল্প। ফোনের একটি স্ক্রলেই পাওয়া যায় সহস্রাধিক অপশন।

এসব মাধ্যম সহজেই নতুন সম্পর্ক গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি করছে। সাংসারিক কিংবা পারিবারিক জীবনে দাম্পত্য সঙ্গীর সঙ্গে কোনো প্রকার ঝামেলা বা মনোমালিন্য হলে অনেক মানুষ একাকিত্বে বসে না থেকে এসব আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে অন্য কারও সঙ্গে যোগাযোগ করে কথা বলছে। একপর্যায়ে সেসব সম্পর্কই রূপ লাভ করছে পরকীয়ায়। গোপন যোগাযোগের সুযোগ থাকায় এখানে পরকীয়ার ঝুঁকিও বেশি।

পরকীয়ার প্রভাবে বিবাহবিচ্ছেদ বৃদ্ধি পাচ্ছে, এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে সামাজিক কাঠামোর ওপর। ফলে পরিবার ভাঙছে, যা সমাজের মৌলিক কাঠামোকেই দুর্বল করছে। শিশুরা পড়ছে মানসিক সংকটে; ভাঙা পরিবারে বেড়ে ওঠা শিশুরা মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাদের মধ্যে অনিরাপত্তা, হতাশা ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতা তৈরি হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে পরকীয়াকে কেন্দ্র করে দাম্পত্য কলহ, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন বেড়ে যায়, যা সমাজে সহিংসতার মাত্রা বাড়ায়।

পরকীয়ার প্রসার অনেকের কাছে ‘নৈতিক অবক্ষয়’। আবার কেউ কেউ একে সামাজিক পরিবর্তনের অংশ হিসেবে দেখেন। তবে এটি যে সামাজিক মূল্যবোধে প্রভাব ফেলছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। কিছু ক্ষেত্রে পরকীয়াকে কেন্দ্র করে হত্যা, আত্মহত্যা বা প্রতিশোধমূলক অপরাধের ঘটনাও ঘটছে, যা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে প্রভাবিত করছে। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গিও রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সব পরকীয়া একই কারণে হয় না। অনেক ক্ষেত্রে এটি অসুখী বা নির্যাতনমূলক সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসার একটি উপসর্গ।

অর্থাৎ, এটি একদিকে যেমন সম্পর্কের ভাঙনের সংকেত, অন্যদিকে ব্যক্তির স্বাধীনতা ও ইচ্ছার প্রকাশও হতে পারে। তবে আমাদের দেশের সামাজিক বাস্তবতায় এর প্রভাব পুরোটাই নেতিবাচক। সামাজিক, পারিবারিক ও দাম্পত্য জীবনকে পরকীয়ার প্রভাব থেকে মুক্ত রাখতে হলে দাম্পত্য শিক্ষা ও কাউন্সেলিং করে দম্পতিদের বিয়ের আগে ও পরে সম্পর্ক ব্যবস্থাপনা শেখানো জরুরি। বিশ্বাস, সম্মান ও পারস্পরিক বোঝাপড়া জোরদার করতে হবে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে দায়িত্বশীল আচরণ নিশ্চিত করতে হবে। দাম্পত্য সমস্যা সমাধানে সরকারের উচিত কাউন্সেলিং সহজলভ্য করা। এছাড়াও দম্পতিদের নিজেদের মধ্যে বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে খোলামেলা আলোচনা করা প্রয়োজন।

This post was viewed: 39

আরো পড়ুন