জন বোলবির অ্যাটাচমেন্ট তত্ত্বানুযায়ী, শৈশবে কেউ নিরাপদ পারিবারিক পরিবেশ না পেলে প্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় যেকোনো সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে সমস্যায় পড়ে। পরবর্তীতে বিবাহ থেকে শুরু করে অনেক সম্পর্কই ভেঙে যায়। ১৯৫৭ সালে মার্কিন সমাজ-মনোবিজ্ঞানী লিওন ফেস্টিনগারের প্রবর্তিত কগনিটিভ ডিসোন্যান্স তত্ত্ব অনুযায়ী, যখন জীবনে কোনো কিছুর প্রত্যাশা ও বাস্তবতার মধ্যে অমিল দেখা দেয়, তখন সেখানে মানসিক দ্বন্দ্ব বাড়ে। কোনো সম্পর্কের মধ্যে দীর্ঘদিন এ দ্বন্দ্ব চললে তা একসময় প্রকট আকার ধারণ করে বিচ্ছেদ ঘটাতে পারে। এর ফলে বিবাহবিচ্ছেদ থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত সম্পর্ক, পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে নানা নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
বাংলাদেশের সামাজিক কাঠামো প্রাচীনকাল থেকেই পরিবারকেন্দ্রিক। এখানে প্রতিটি মানুষের জীবন তার পরিবারকে কেন্দ্র করে অতিবাহিত হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সেই কাঠামোয় দৃশ্যমান পরিবর্তন এসেছে। বিশেষ করে বিবাহবিচ্ছেদের হার দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ার মাধ্যমে একসময় যে বিষয়টি সামাজিকভাবে ‘ট্যাবু’ ছিল, এখন তা ক্রমেই সাধারণ বাস্তবতায় পরিণত হচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এই প্রবণতা কি ইতিবাচক সামাজিক রূপান্তরের ফল, নাকি এটি গভীর কোনো সংকটের আগাম ইঙ্গিত?
পরিসংখ্যান বলছে, চিত্রটা উদ্বেগজনক। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (BBS) তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে দেশে প্রতি হাজারে বিবাহবিচ্ছেদের হার বেড়ে দাঁড়ায় ১.৪, যা ২০২১ সালে ছিল ০.৭। অর্থাৎ, এক বছরে এই হার প্রায় দ্বিগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। রাজধানী ঢাকার চিত্র আরও স্পষ্ট। এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ঢাকায় গড়ে প্রতি ৪০ মিনিটে একটি করে ডিভোর্স হচ্ছে। শুধু ২০২২ সালেই ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনে ১৩ হাজারের বেশি বিবাহবিচ্ছেদের আবেদন জমা পড়ে। এছাড়া ২০২০ ও ২০২১ সালে বিবাহবিচ্ছেদের জন্য ১২ হাজারেরও বেশি আপিল নিবন্ধিত হয়েছিল। ঢাকার দুই সিটির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২০ ও ২০২১ সালে জমা হওয়া বিবাহবিচ্ছেদের আবেদনের সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ১২,৫১৩ এবং ১৪,৬৫৯টি।
২০২৪ সালে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনে ৭,৯১৩টি বিবাহবিচ্ছেদের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ৫,৭৬৪টি বিচ্ছেদের আবেদন করেছেন নারীরা, বিপরীতে পুরুষের আবেদনের সংখ্যা ২,১৪৯টি। বিবাহবিচ্ছেদের ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে শিক্ষিত ও কর্মজীবী দম্পতিরাই বেশি আবেদন করছেন। এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি যে দিক দেখা যাচ্ছে, তা হলো বিবাহবিচ্ছেদের আবেদনকারীদের মধ্যে নারীর সংখ্যা বেশি। ঢাকায় প্রায় ৬৫–৭০ শতাংশ ক্ষেত্রে নারীরাই বিচ্ছেদের আবেদন করছেন। গ্রামাঞ্চলের চিত্রে এই পরিসংখ্যানে পুরুষরা নারীদের তুলনায় কিছুটা এগিয়ে থাকলেও সেখানেও ক্রমান্বয়ে পরিস্থিতি বদলে যাচ্ছে।
বর্তমান আধুনিকতার এই যুগে, যখন সবকিছু দ্রুত পরিবর্তনশীল, সেখানেই এই পরিবর্তনের সঙ্গে মানুষের দাম্পত্য জীবনেও বাড়ছে অস্থিরতা। পরিবর্তনের সঙ্গে বদলে যাচ্ছে আমাদের সম্পর্কের ধরণও। কিন্তু কেন বাড়ছে বিবাহবিচ্ছেদ? এই সমস্যা নিয়ে সমাজবিজ্ঞানীদের করা বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে কিছু তথ্য।
সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করেন, নারীর শিক্ষা ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতা বৃদ্ধিই বিবাহবিচ্ছেদের অন্যতম প্রধান কারণ। আগে অনেক নারী নির্যাতনের মধ্যেও সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতেন, কিন্তু এখন তারা অসন্তোষজনক বা সহিংস সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসার সাহস পাচ্ছেন।
গবেষণায় দেখা গেছে, গৃহস্থালি সহিংসতা, মানসিক নির্যাতন, পরকীয়া ও আর্থিক শোষণ বিবাহবিচ্ছেদের প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে। বিবাহবিচ্ছেদের ক্ষেত্রে বড় কারণ বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক। এক জরিপে অংশ নেওয়া উত্তরদাতাদের প্রায় ২৩ শতাংশ দাম্পত্য জীবনে বিচ্ছেদের জন্য এই কারণের কথা বলেছেন। এরপরই রয়েছে দাম্পত্যজীবন পালনে অক্ষমতা, যার হার ২২ শতাংশ। ভরণপোষণের ব্যয় বহন করতে অসামর্থ্য অথবা অস্বীকৃতি, পারিবারিক চাপ, শারীরিক নির্যাতন, যৌন অক্ষমতা বা অনীহা ইত্যাদিও রয়েছে বিবাহবিচ্ছেদের কারণের তালিকায়।
দ্রুত নগরায়ণ, একক পরিবার ব্যবস্থা এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক জীবনধারা দাম্পত্য সম্পর্কে দূরত্ব তৈরি করছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিস্তার এবং আধুনিক মূল্যবোধের প্রভাব বিবাহকে আগের মতো ‘অবিচ্ছেদ্য’ রাখছে না।
একসময় বিবাহবিচ্ছেদকে সামাজিকভাবে অসম্মানজনক মনে করা হতো। এখন সেই দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তিত হচ্ছে। ফলে মানুষ, বিশেষ করে নারীরা, অসুখী সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসতে আগ্রহী হচ্ছেন।
বাংলাদেশে এখনও শিশুবিবাহ একটি বড় সমস্যা। অল্প বয়সে বিয়ে হওয়ায় দাম্পত্য সম্পর্কে পরিপক্বতা ও সহনশীলতার অভাব দেখা দেয়, যা বিচ্ছেদের ঝুঁকি বাড়ায়।
বর্তমান প্রজন্মের মধ্যে পারস্পরিক প্রত্যাশা অনেক বেশি, কিন্তু সেই অনুযায়ী সমঝোতা ও যোগাযোগ দক্ষতা সবসময় গড়ে ওঠে না। ফলে ছোটখাট মতবিরোধও বড় সংকটে রূপ নেয়।
একটি প্রচলিত ধারণা ছিল যে শহরে বিবাহবিচ্ছেদ বেশি। তবে সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, গ্রামাঞ্চলেও বিচ্ছেদের হার বাড়ছে এবং কিছু ক্ষেত্রে শহরকেও টেক্কা দিচ্ছে।
একটি পরিবারে হওয়া বিবাহবিচ্ছেদের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী ওই পরিবারে থাকা শিশু। ভাঙা পরিবারের মানসিক প্রভাব তাদের ব্যক্তিত্ব ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কের ওপর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে। অনেকেই এর প্রভাবে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বড় হচ্ছে, যা আবার অনেককে ফেলছে অস্তিত্ব সংকটে। এছাড়া সমাজে একক পরিবার বৃদ্ধি, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা এবং সামাজিক অস্থিরতাও বাড়তে পারে।
একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি হলো, বিবাহবিচ্ছেদের হার বৃদ্ধি নারীর ক্ষমতায়ন ও অধিকার সচেতনতার প্রতিফলন। অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, এটি একটি ‘সাইলেন্ট সোশ্যাল রেভল্যুশন’, যেখানে মানুষ আর অন্যায় বা অস্বাস্থ্যকর সম্পর্ক মেনে নিচ্ছে না। তবে একদল বিশেষজ্ঞ বলছেন, এটি পারিবারিক মূল্যবোধের দুর্বলতা ও সামাজিক অস্থিরতার ইঙ্গিতও হতে পারে। যার ফলে মানুষ এখন আর ধৈর্য ধরে কোনো একটি সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার ওপর মনোযোগী হচ্ছেন না। ফলে তারা অল্পতেই অতিষ্ঠ হয়ে এগোচ্ছেন বিচ্ছেদের দিকে।
পারিবারিক ও দাম্পত্য কাউন্সেলিং জোরদার করা গেলে সম্পর্কের গুরুত্ব ও ব্যক্তিগত মূল্যবোধ বৃদ্ধি পাবে। বিয়ের আগে সচেতনতা ও প্রশিক্ষণ বৃদ্ধি করে দম্পতিদের মধ্যে প্রত্যাশা ও দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করলে ভবিষ্যতের দ্বন্দ্ব কমতে পারে। গৃহস্থালি সহিংসতা প্রতিরোধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে। নারীর নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করতে হবে, যাতে তারা সংসারে তাদের প্রাপ্য সামাজিক মর্যাদা ও সম্মান পায়। শিশুদের মানসিক সহায়তা প্রদান জরুরি, এবং মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষায় বিশেষায়িত কাউন্সেলিং ও থেরাপি প্রয়োজন। এছাড়াও যোগ্য মনোবিজ্ঞানী বা কাউন্সিলরের মাধ্যমে যোগাযোগ, সহমর্মিতা ও সমস্যা সমাধানের দক্ষতা শেখা যেতে পারে।
যত ধরনের করণীয় থাকুক না কেন, মূলকথা হলো কোনো একটি সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার জন্য প্রাথমিক পর্যায়ে দরকার একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও বিশ্বাস। পরস্পরের মধ্যে সহনশীলতা ও টিকে থাকার ইচ্ছা না থাকলে সেই সম্পর্ক দীর্ঘ সময় ধরে রাখা মুশকিল।
এককথায়, বিবাহবিচ্ছেদ এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে নেতিবাচক ছাপ ফেলে যায়, যা জাতীয় উন্নয়নের জন্যও অন্তরায় হয়ে দাঁড়াতে পারে। এটি একজন মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। এতে হতাশা, একাকিত্ব, উদ্বেগ, আত্মসম্মানবোধের হ্রাস, এমনকি ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার অনুভূতি তৈরি হয়। তাই এ সময়ে মানসিক ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত জরুরি।