মহামারি শব্দটি শুনলেই আমাদের চোখের সামনে চলে আসে এক বিশাল ঝুঁকি, একটি ভয়াবহ পরিস্থিতির কথা, যা সমগ্র পৃথিবীকে ঝাঁকিয়ে দিয়ে যায়। প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে শুরু করে আধুনিক যুগ পর্যন্ত মানুষের ইতিহাসে নানা মহামারি এসেছে, যার মধ্যে অন্যতম হলো হাম।
প্রাচীনকাল থেকে আমরা দেখেছি, একাধিক ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগ মানবজাতির প্রাণহানি ঘটিয়েছে। তবে হাম, যেটি মিজেলস ভাইরাস দ্বারা সৃষ্ট, একটি অত্যন্ত সংক্রামক রোগ। এর প্রভাব এখনও পৃথিবীজুড়ে রয়েছে। বিশেষ করে এমন কিছু অঞ্চলে যেখানে শিশুদের নিয়মিত টিকা দেওয়া হয়নি, সেখানে এই রোগের প্রাদুর্ভাব আবারও উদ্বেগ সৃষ্টি করছে।
হাম ভাইরাসের উৎস সম্পর্কে বিজ্ঞানীরা নানা গবেষণা করেছেন। তাদের ধারণা, প্রায় হাজার বছর আগে এই ভাইরাস প্রথম মানুষের মধ্যে ছড়াতে শুরু করে। যদিও ১০ম শতাব্দীতে পারস্যের চিকিৎসক মুহাম্মদ ইবনে জাকারিয়া আল-রাজি এই রোগ সম্পর্কে প্রথম বিস্তারিত বর্ণনা দেন, এবং হাম ও গুটিবসন্তের মধ্যে পার্থক্য তুলে ধরেন, তবুও গবেষকরা মনে করেন, হাম ভাইরাসের উৎপত্তি মূলত গবাদি পশুর মধ্যে থাকা একধরনের ভাইরাস থেকে, যা পরবর্তীতে মানুষের মধ্যে সংক্রমিত হতে শুরু করে।
হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক রোগ। এটি একজন আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে অন্য ব্যক্তির শরীরে খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। কাশি বা হাঁচির মাধ্যমে সহজেই ভাইরাসটি পরিবাহিত হয়। বিশেষ করে শহরাঞ্চলে, যেখানে মানুষের ঘনবসতি রয়েছে এবং চিকিৎসাব্যবস্থা দুর্বল ছিল, সেখানে এই রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে থাকে। মধ্যযুগে ইউরোপে যখন জনসংখ্যা বাড়তে শুরু করে, তখন শহরগুলোতে হাম মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়ে। বিভিন্ন বাণিজ্য রুট, যুদ্ধ এবং মানুষের চলাচলও এই রোগের বিস্তারে সাহায্য করেছিল।
১৫ ও ১৬ শতকের সময়ে ইউরোপীয় অভিযাত্রীরা যখন আমেরিকা মহাদেশে পৌঁছায়, তখন তাদের সঙ্গে হাম ভাইরাসও সেখানে পৌঁছায়। তখনকার স্থানীয় জনগণের শরীরে এই ভাইরাসের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের প্রতিরোধ ক্ষমতা ছিল না। ফলে সেখানে ব্যাপক মৃত্যু ঘটে। অনেক ইতিহাসবিদের মতে, ইউরোপীয় অভিযাত্রীরা যে অঞ্চলে পৌঁছেছিল, সেখানে অনেক জায়গায় পুরো জনসংখ্যার একটি বড় অংশই এই রোগে মারা গিয়েছিল।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০ শতকের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত হাম ছিল শিশুমৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ। প্রতি বছর বিশ্বজুড়ে লাখ লাখ শিশু এই রোগে মারা যেত। আফ্রিকা ও এশিয়ার দরিদ্র দেশগুলোতে এর মৃত্যুহার ছিল অনেক বেশি। ১৯৮০ সালের আগে প্রতিবছর প্রায় ২৬ লাখ মানুষ হাম রোগে মারা যেত, যা তখনকার পৃথিবীজুড়ে বিশাল সংকট সৃষ্টি করে। তবে ১৯৫৪ সালে মার্কিন বিজ্ঞানী জন এফ. এন্ডার্স এবং তার সহকর্মীরা হাম ভাইরাসকে আলাদা করে শনাক্ত করতে সক্ষম হন। এরপর ১৯৬৩ সালে প্রথম হাম প্রতিরোধী টিকা তৈরি করা হয়, যা চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার।
টিকা আবিষ্কারের পর বিশ্বের বিভিন্ন দেশে হাম প্রতিরোধী কর্মসূচি শুরু হয়। বিশেষ করে ১৯৭০-এর দশক থেকে শুরু করে ২০০০ সালের পর বিশ্বের নানা দেশে হাম টিকাদান কার্যক্রম ব্যাপকভাবে বিস্তৃত হয়। এর ফলে হামে আক্রান্ত এবং মৃত্যুর সংখ্যা নাটকীয়ভাবে কমে আসে। বিশেষত শিশুদের মধ্যে এই রোগের প্রাদুর্ভাব অনেকাংশেই নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, ২০০০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে হাম প্রতিরোধ কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রায় ৩ কোটি মানুষের জীবন রক্ষা করা সম্ভব হয়েছে। তবে হাম পুরোপুরি নির্মূল হয়নি, কারণ নানা কারণে টিকা গ্রহণের হার কমে গেলে আবারও সংক্রমণ বেড়ে যায়।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কিছু অঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতা, টিকা সম্পর্কে ভুল ধারণা, এবং যুদ্ধ বা রাজনৈতিক সংকটের কারণে টিকাদান কর্মসূচি ব্যাহত হলে হাম দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে।
বাংলাদেশের পরিস্থিতিও কিছুটা এমনই। দেশের জাতীয় টিকাদান কর্মসূচির আওতায় বহু বছর ধরে শিশুদের হাম টিকা প্রদান করা হচ্ছে, যার ফলে এই রোগের প্রাদুর্ভাব অনেকটা নিয়ন্ত্রণে ছিল। তবে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে কিছু এলাকায় এখনো টিকার আওতায় না থাকা শিশু রয়েছে এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও শহরাঞ্চলে মানুষের ঘনবসতির কারণে হাম ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে। দেশে যদি সময়মতো টিকা নিশ্চিত করা যায়, তবে হাম থেকে সহজেই সুরক্ষা পাওয়া সম্ভব।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন এলাকায় যদি শিশুদের নিয়মিত টিকা নিশ্চিত করা যায়, তবে এই রোগের বিস্তার রোধ করা সম্ভব। হাম প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো টিকা। সাধারণত শিশুদের নির্দিষ্ট বয়সে দুই ডোজ টিকা দেওয়া হয়, যা দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষা প্রদান করে। এছাড়া আক্রান্ত ব্যক্তিকে আলাদা রাখা, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা এবং দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
এছাড়া জনগণের মধ্যে টিকা গ্রহণের সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন প্রচারণা এবং সরকারের তৎপরতা জরুরি। টিকা সম্পর্কিত ভুল ধারণা দূর করা, স্বাস্থ্যসেবা খাতে উন্নতি করা এবং সংকটকালে টিকাদান কর্মসূচি সচল রাখা একান্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সার্বিকভাবে, হাম মহামারী মানবজাতির দীর্ঘ ইতিহাসের একটি ভয়াবহ অধ্যায়। তবে এটি এখন চিকিৎসাবিজ্ঞানের উন্নতির মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণযোগ্য রোগে পরিণত হয়েছে। তবে এর পুনরায় বিস্তার রোধ করতে টিকাদান, স্বাস্থ্যসেবা এবং জনগণের সচেতনতা বৃদ্ধি অত্যন্ত জরুরি।