Ridge Bangla

সালমান শাহ: সাড়ে তিন বছরের ঝলকে আজীবনের কিংবদন্তি

প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ‘আনন্দ মেলা’ হিন্দি ছবি ‘সনম বেওয়াফা’, ‘দিল’ ও ‘কেয়ামত সে কেয়ামত তক’ এর মেধাস্বত্ব নিয়ে পরিচালক সোহানুর রহমান সোহানের কাছে এসে এর যেকোনো একটিকে বাংলায় পুনর্নির্মাণ করার কথা বললে তিনি এর জন্য উপযুক্ত নায়ক-নায়িকা খুঁজে পাচ্ছিলেন না। সে সময় নায়ক আলমগীরের সাবেক স্ত্রী খোশনূর আলমগীর চৌধুরী মোহাম্মদ শাহরিয়ার ইমন নামের এক যুবকের সন্ধান দেন। প্রথম দেখাতেই তাঁকে পছন্দ করে ফেলেন সোহানুর রহমান এবং ‘সনম বেওয়াফা’ ছবির জন্য প্রস্তাব দেন।

কিন্তু ইমন ‘কেয়ামত সে কেয়ামত তক’ ছবির কথা জানতে পেরে সেই ছবিতে অভিনয়ের জন্য জোরাজুরি করতে থাকেন। ইমনের ভাষ্যমতে, ‘কেয়ামত সে কেয়ামত তক’ ছবি তার এতই প্রিয় যে, তিনি ইতিমধ্যে ২৬ বার ছবিটি দেখেছেন বলে পরিচালককে জানান। শেষ পর্যন্ত পরিচালক তাঁকে নিয়ে ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ চলচ্চিত্রটি নির্মাণের সিদ্ধান্ত নিলে ইমনের নাম পরিবর্তন করে সালমান শাহ রাখা হয়। এই ছবিতে সালমান শাহের পাশাপাশি অভিষেক হয় চিত্রনায়িকা মৌসুমী ও গায়ক আগুনের।

মুক্তির পর সিনেমাটি বাংলাদেশে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। দর্শক মহলে তুমুল সাড়া ফেলে ব্যবসায়িকভাবে সফল হয়। এই ছবির মাধ্যমেই বাংলা চলচ্চিত্রে তরুণ প্রজন্মের কাছে সদ্য আগত সালমান শাহ স্টাইল আইকন হিসেবে পরিচিতি পান। এই একটি সিনেমায় কাজের মাধ্যমেই তিনি নিজের পায়ের তলার মাটি শক্ত করে ভক্ত-অনুরাগীদের কাছে পরম কাঙ্ক্ষিত এক অভিনেতায় পরিণত হন।

১৯৯৩ সালে ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ সিনেমার মাধ্যমে শুরু, এরপর ১৯৯৬ সাল অবধি সাড়ে তিন বছরে তিনি অভিনয় করেছেন ২৭টি সিনেমায়। এর মধ্যে ‘তুমি আমার’, ‘অন্তরে অন্তরে’, ‘বিক্ষোভ’, ‘প্রেমযুদ্ধ’, ‘দেনমোহর’, ‘স্বপ্নের ঠিকানা’, ‘আঞ্জুমান’, ‘বিচার হবে’, ‘এই ঘর এই সংসার’, ‘স্বপ্নের পৃথিবী’, ‘সত্যের মৃত্যু নেই’, ‘জীবন সংসার’, ‘মায়ের অধিকার’, ‘চাওয়া থেকে পাওয়া’, ‘আনন্দ অশ্রু’র মতো ব্যবসাসফল বিভিন্ন সিনেমা রয়েছে।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ১৯৭১ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর সিলেটে জন্ম নেয়া এই ক্ষণজন্মা অভিনেতা তার অভিনয় শুরু করেন ১৯৮৬ সালে। তখন বিটিভি’তে হানিফ সংকেত পরিচালিত ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ইত্যাদির জন্য একটি মিউজিক ভিডিওর মডেল হিসেবে কাজ করেন তিনি। এরপর বেশ কয়েকটি টিভি বিজ্ঞাপনে কাজ করার পাশাপাশি স্টেজ শোতে মডেল এবং বিভিন্ন নাটকেও অভিনয় করেন। তার অভিনীত ‘নয়ন’ (১৯৯৫) নাটকটি সে বছর শ্রেষ্ঠ একক নাটক হিসেবে বাচসাস পুরস্কার লাভ করে।

নিজস্ব অভিনয়গুণে সালমান শাহ শুধু চলচ্চিত্রে নয়, ভক্তদের হৃদয়েও দ্রুত জায়গা করে নেন। নিজের অভিনয় ও স্টাইল দিয়ে বাংলা চলচ্চিত্রে এক নতুন ধারার প্রবর্তন করেন তিনি। তরুণ প্রজন্মের চোখে তিনি হয়ে উঠেছিলেন ফ্যাশন আইকন ও আবেগের প্রতীক, যিনি পর্দায় প্রেম ও যন্ত্রণার অনুভূতিকে জীবন্ত করে তুলেছিলেন। তার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে তৎকালীন বলিউডেও।

তবে মানুষের জীবন বড্ড অনিশ্চিত, ক্ষণিকের মুহূর্তেই তা বাঁক নিতে পারে ভালো বা মন্দের দিকে। এমনি এক সময় এসেছিল ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর। প্রথম সিনেমা ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’-এর শেষ দৃশ্যের মতো সালমানের নিজের জীবনের পথচলাও থেমে গিয়েছিল ছবিটি করার সাড়ে তিন বছর পর এদিন।

সেদিন সকালে বাবা কমর উদ্দিন চৌধুরী সালমানের সঙ্গে দেখা করতে ইস্কাটনের বাসায় যান। দেখা না পেয়ে তিনি ফিরে আসেন। এরপর বেলা এগারোটার দিকে একটি ফোন আসে সালমান শাহের মা নীলা চৌধুরীর বাড়িতে। টেলিফোনে বলা হলো, সালমান শাহকে দেখতে হলে এখনই যেতে হবে।

এরপর নীলা চৌধুরী দ্রুত ছেলের বাসায় যান। বাসায় গিয়ে তিনি সালমানকে বিছানার ওপর যেদিকে মাথা দেবার কথা সেদিকে পা, আর যেদিকে পা দেবার কথা সেদিকে মাথা দেয়া অবস্থায় দেখতে পান। তখন সেখানে কিছু তরুণী সালমান শাহের হাতে-পায়ে সর্ষের তেল মালিশ করছিল। তারা সালমান শাহের বাসার পাশেই থাকা তার স্ত্রী সামিরার এক আত্মীয়ের পার্লারের কর্মী ছিল। এরপর দ্রুত ইস্কাটনের বাসা থেকে সালমান শাহকে হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে নেয়া হলে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ময়নাতদন্ত শেষে জানায় সালমান শাহ আত্মহত্যা করেছেন।

তবে বরাবরই সালমান শাহের পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, সালমান শাহকে হত্যা করা হয়েছে। তার মা নীলা চৌধুরীর অভিযোগ ছিল, তারা হত্যা মামলা করতে গেলে পুলিশ সেটিকে অপমৃত্যুর মামলা হিসেবে নথিভুক্ত করে। পুলিশ বলেছিল, অপমৃত্যুর মামলা তদন্তের সময় যদি বেরিয়ে আসে যে এটি হত্যাকাণ্ড, তাহলে সেটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে হত্যা মামলায় মোড় নেবে। এ মামলার তদন্ত সংস্থা পিবিআই ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে এক সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছিল, সালমান শাহকে হত্যা করা হয়নি, তিনি আত্মহত্যা করেছেন। সে সময় সালমান শাহের আত্মহত্যার পেছনে পাঁচটি কারণও উল্লেখ করে তারা।

সালমানের পরিবারের অভিযোগের প্রধান তীর তার স্ত্রী সামিরার দিকে। তবে সামিরা বরাবরই এ ব্যাপারটি অস্বীকার করে আসলেও পরিবারের ধারণা, ১৯৯০ দশকে দেশের অন্যতম জনপ্রিয় চলচ্চিত্র প্রযোজক আজিজ মোহাম্মদ ভাইকে নিয়ে এই হত্যাকাণ্ড ঘটান সামিরা। অভিযোগ ওঠে, একটি অনুষ্ঠানে সালমানের স্ত্রী সামিরাকে চুমু খান আজিজ মোহাম্মদ ভাই। বিষয়টিকে কেন্দ্র করে সেখানেই সালমান শাহ আজিজকে থাপ্পড় মারেন। ধারণা করা হয়, এই বিরোধের জেরেই সালমানের মৃত্যুর ঘটনা ঘটে।

সালমান শাহের মৃত্যুর পর রমনা থানায় হওয়া অপমৃত্যুর মামলাটিকে গত ২০ অক্টোবর ঢাকার ষষ্ঠ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ মো. জান্নাতুল ফেরদৌস ইবনে হক বাদী পক্ষের করা রিভিশন মঞ্জুর করে মামলাটি হত্যা মামলা হিসেবে গ্রহণের নির্দেশ দেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২১ অক্টোবর সালমান শাহের মামা মোহাম্মদ আলমগীর রমনা থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। এর তদন্ত প্রতিবেদন জমার দিন ধার্য করা হয়েছে ১৪ই মে ২০২৬।

সালমান শাহ তার অসাধারণ অভিনয়, সুদর্শন চেহারা, আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব ও সর্বমহলে গ্রহণযোগ্যতার জন্য অত্যন্ত জনপ্রিয় ও প্রভাবশালী হয়ে উঠেছিলেন, যা তাঁর মৃত্যুর পর আজও বজায় আছে। তার পেশাগত অর্জন, শৈল্পিক সম্ভাবনা, অকালমৃত্যু এবং আকাশছোঁয়া জনপ্রিয়তা আজও তরুণ-বৃদ্ধ সবাইকে ভাবায়।

তাঁর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ও জনপ্রিয়তার পেছনে তাঁর মুখের অভিব্যক্তি, সংলাপ, বাচনভঙ্গি, কণ্ঠস্বর ও ফ্যাশন সেন্সকে উল্লেখ করা যায়। চলচ্চিত্র বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, তাঁর সাবলীল অভিনয়, শারীরিক ভাষা, চরিত্রগুলোর সাথে মিলিয়ে করা স্টাইল তখনকার সময়ের চেয়ে অনেক এগিয়ে ছিল, যা আজও ভক্তদের অন্তরে বাঁচিয়ে রেখেছে ক্ষণজন্মা এই নায়ককে।

This post was viewed: 5

আরো পড়ুন