Skip to main content

Ridge Bangla

শৈশব গ্রাস করছে ‘ডিজিটাল স্ক্রিন’, অকালেই ঝুঁকিতে স্বাস্থ্য

জনসংখ্যার চাপে পিষ্ট এক নগরী ঢাকা। এখানে বয়স্কদের খেলার মাঠ থেকে শুরু করে শিশুদের জন্য অতি প্রয়োজনীয় খোলা জায়গারও বড্ড অভাব। ইট-কাঠের এই ব্যস্ত খাঁচায় বিনোদন খুঁজতে বা অবসর সময়ে শিশু-কিশোরদের বেশিরভাগ সময় কাটে এখন ডিজিটাল ডিভাইসের স্ক্রিনে।

একটা সময় যেখানে আমাদের অবসর ছিল নিজ বয়সীদের সঙ্গে আড্ডা-খেলাধুলা থেকে শুরু করে পরিবারের লোকজনের সঙ্গে ঘরে বসে খাবার তৈরি কিংবা খুনসুটির মতো আনন্দময় বিষয়গুলো, সময় ও প্রযুক্তির বিবর্তনে আজ সেই স্থান দখল করেছে মোবাইল, ট্যাব, ল্যাপটপ, কম্পিউটার বা স্মার্ট টিভির মতো ডিজিটাল ডিভাইসের উজ্জ্বল স্ক্রিন।

এখন এই ডিজিটাল ডিভাইসের ব্যবহার শুধু শহরের চার দেয়ালের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। প্রযুক্তির উন্নতি ও সহজলভ্যতায় তা ছড়িয়ে পড়েছে দেশের প্রান্তিক অঞ্চলগুলোতেও। গ্রাম কিংবা শহর- যেকোনো স্থানে গেলে কেউ একজন ডিজিটাল স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে আছেন, এই দৃশ্য এখন স্বাভাবিক।

তবে এই ডিজিটাল স্ক্রিন আমাদের তৎক্ষণাৎ বিনোদন বা আনন্দ দিলেও এর আড়ালে লুকিয়ে আছে এক ভয়ংকর দিক। বেশি সময় ধরে ডিজিটাল ডিভাইসের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকার ফলে আমাদের চোখ শুকিয়ে যাচ্ছে, শারীরিক ও মানসিক ক্ষতি হচ্ছে। এর সঙ্গে আমরা সমাজ ও পরিবার থেকে একপ্রকার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছি।

এর সবচেয়ে ক্ষতিকর ও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব দেখা যাচ্ছে কোমলমতি শিশুদের ক্ষেত্রে। তারা ঘরে মা-বাবার কাছে থেকেও ডিজিটাল ডিভাইসের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে হারিয়ে যাচ্ছে এক কৃত্রিম দুনিয়ায়।

আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) সাম্প্রতিক এক গবেষণায় উঠে এসেছে উদ্বেগজনক চিত্র। ঢাকার শিশুদের এক বিরাট অংশই এখন ডিজিটাল স্ক্রিনে অতিরিক্ত সময় কাটাচ্ছে। যার ফলে তাদের ওজন বাড়ছে, কমছে ঘুম, তৈরি হচ্ছে মাথাব্যথা ও চোখের গুরুতর সমস্যা। এ ছাড়া শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও পড়ছে মারাত্মক প্রভাব। গবেষকরা এই ভয়াবহ বিষয়টিকে আখ্যায়িত করেছেন ‘অদৃশ্য মহামারী’ হিসেবে।

সম্প্রতি ২০২২-২০২৪ সময়কালে ঢাকার ছয়টি স্কুলের (তিনটি বাংলা মাধ্যম ও তিনটি ইংরেজি মাধ্যম) ৬ থেকে ১৪ বছর বয়সী ৪২০ জন শিশুর ওপর পরিচালিত একটি গবেষণা প্রতিবেদনের ফল প্রকাশ করে আন্তর্জাতিক জার্নাল ‘জার্নাল অব মেডিকেল ইন্টারনেট রিসার্চ (জেএমআইআর) হিউম্যান ফ্যাক্টরস’।

গবেষণায় শিশুদের শারীরিক পরীক্ষা, সরাসরি সাক্ষাৎকার এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত কিছু নির্দেশক (পিটসবার্গ স্লিপ কোয়ালিটি ইনডেক্স, স্ট্রেংদস অ্যান্ড ডিফিকাল্টিস কোয়েশ্চেনেয়ার এবং ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড ওয়েল-বিয়িং অ্যাসেসমেন্ট) ব্যবহার করে তাদের ঘুম, আচরণ ও মানসিক অবস্থার তথ্য সংগ্রহ করা হয়।

সেই গবেষণা প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, ঢাকার প্রতি ৫ জন শিশুর মধ্যে ৪ জনই (৮৩ শতাংশ) প্রতিদিন দুই ঘণ্টার বেশি সময় স্ক্রিন ব্যবহার করে, যা তাদের বিনোদনমূলক স্ক্রিন ব্যবহারের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সীমাকে বহু আগেই ছাড়িয়ে গেছে। এই শিশুরা ডিজিটাল ডিভাইসে দিনে গড়ে প্রায় ৪ দশমিক ৬ ঘণ্টা সময় পার করছে।

এর ফলস্বরূপ, এক-তৃতীয়াংশের বেশি শিশু ভুগছে চোখের নানা সমস্যায় এবং প্রায় ৮০ শতাংশ শিশু নিয়মিত মাথাব্যথার কথা জানাচ্ছে। যারা দিনে ২ ঘণ্টার বেশি স্ক্রিন ব্যবহার করে, তারা ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গড়ে মাত্র ৭ দশমিক ৩ ঘণ্টা ঘুমানোর সুযোগ পায়, যা এই বয়সের শিশুদের সুস্থ শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় ঘুমের তুলনায় অনেক কম।

এ ছাড়া প্রায় ১৪ শতাংশ শিশু অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতার শিকার। গবেষণায় দেখা গেছে, যারা বেশি স্ক্রিন ব্যবহার করে, তাদের মধ্যেই এই স্থূলতার হার বেশি। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়ে বলছেন, শৈশবে এই দীর্ঘমেয়াদি ঘুমের অভাব শিশুদের স্মৃতিশক্তি, মনোযোগ, শেখার ক্ষমতা, আবেগ নিয়ন্ত্রণ, শারীরিক বৃদ্ধি এবং সামগ্রিক মানসিক সুস্থতার ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে।

গবেষণায় উঠে আসা আরও একটি আশঙ্কাজনক দিক হলো, প্রতি ৫ জন শিশুর মধ্যে প্রায় ২ জন শিশু দুশ্চিন্তা, অতি-চঞ্চলতা বা আচরণগত সমস্যার মতো এক বা একাধিক মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছে।

গবেষকদের মতে, রাতে স্ক্রিন ব্যবহার মূলত মস্তিষ্ককে উত্তেজিত করে তোলে, যা শরীরের স্বাভাবিক ঘুমের চক্র বা ‘সার্কাডিয়ান রিদম’ ব্যাহত করে। অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহারের কারণে শিশুদের সামাজিকীকরণ কমে যাচ্ছে, যা তাদের মন-মেজাজ ও আবেগকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

শুধু বাংলাদেশেই নয়, বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণাতেও শিশুদের অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহারের সঙ্গে অপর্যাপ্ত ঘুম, শারীরিক পরিশ্রম কমে যাওয়া, স্থূলতা, তীব্র উদ্বেগ এবং পড়াশোনায় দুর্বল ফলাফলের স্পষ্ট যোগসূত্র পাওয়া গেছে।

এই গবেষণার প্রধান গবেষক ও আইসিডিডিআরবি’র সহকারী সায়েন্টিস্ট ডা. শাহরিয়া হাফিজ কাকন বলেন, অভিভাবকদের উচিত শিশুদের দেরিতে ঘুমানো, মাথাব্যথা, চোখের অস্বস্তি, খিটখিটে মেজাজ বা নিজেকে গুটিয়ে নেওয়ার মতো লক্ষণগুলোকে কোনোভাবেই উপেক্ষা না করা। কারণ এগুলো অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহারেরই বিরূপ প্রভাব।

এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য গবেষকরা শিশুদের চোখের যত্নে ২০-২০-২০ নিয়ম মেনে চলার পরামর্শ দিয়েছেন। নিয়মটি হলো, প্রতি ২০ মিনিট স্ক্রিন ব্যবহারের পর অন্তত ২০ ফুট দূরের কোনো বস্তুর দিকে ২০ সেকেন্ড তাকিয়ে থাকা, যা চোখের পেশিকে স্বস্তি দেয়।

আইসিডিডিআরবি’র নির্বাহী পরিচালক ড. তাহমিদ আহমেদ এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘ডিজিটাল ডিভাইস এখন আমাদের জীবনের অংশ হয়ে উঠলেও শিশুদের সুস্থতার স্বার্থে এর ব্যবহারের একটি সুনির্দিষ্ট সীমা নির্ধারণ করা প্রয়োজন। বাবা-মায়ের উচিত সন্তানের স্বাভাবিক বেড়ে ওঠায় সাহায্য করতে ডিজিটাল ডিভাইসমুক্ত একটি সুস্থ পারিবারিক পরিবেশে সময় কাটাতে শিশুদের উৎসাহিত করা।’

আধুনিকতার এই যুগে এসে ডিভাইস কিংবা প্রযুক্তি হয়তো পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া বাস্তবসম্মত কোনো সমাধান নয়। বরং সঠিক সমাধান হতে পারে বাড়িতে ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিশুদের জন্য একটি স্বাস্থ্যকর এবং ভারসাম্যপূর্ণ ডিজিটাল অভ্যাস গড়ে তোলা।

This post was viewed: 65

আরো পড়ুন