সকাল কিংবা বিকেল, রাজধানীর অলিগলিতে এখন আর কেবল ফুটবল বা ক্রিকেটের শোরগোল শোনা যায় না। বরং সেখানে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে মোটরসাইকেলের তীব্র হর্ন। এই হর্নেই বিপদের অশনি সংকেত নিয়ে হাজির হচ্ছে কিশোরদের এক রহস্যময় দল, যাদের আমরা চিনি ‘কিশোর গ্যাং’ নামে। এক সময়কার ‘পাড়ার বড় ভাই’ সংস্কৃতি এখন রূপ নিয়েছে ভয়াবহ অপরাধের আস্তানায়। সম্প্রতি কিশোর অপরাধের ভয়াবহতা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।
সারাদেশে বর্তমানে কিশোর গ্যাং একটি জাতীয় সমস্যায় পরিণত হয়েছে। গোয়েন্দা ও পুলিশি তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে অন্তত ২৩৭টি কিশোর গ্যাং সক্রিয় রয়েছে। এর মধ্যে শুধু রাজধানী ঢাকাতেই গ্যাংয়ের সংখ্যা ১১৮টি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সূত্রে জানা যায়, এসব গ্যাংয়ের সদস্য সংখ্যা ৫০ হাজার ছাড়িয়েছে। ২০২৩ সালের তথ্য অনুযায়ী, শুধু রাজধানীতেই কিশোর গ্যাংয়ের হাতে খুনের শিকার হয়েছেন ২৫ জন। দেশের অন্যান্য বড় শহরগুলোতেও এই সংস্কৃতি দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ছে।
সারাদেশের চিত্র ভয়াবহ হলেও রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকাটি বর্তমানে কিশোর গ্যাংয়ের স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে। জেনেভা ক্যাম্প, রায়েরবাজার, বুদ্ধিজীবী কবরস্থান এলাকা, বসিলা এবং চাঁদ উদ্যান- এই পুরো বলয়টি এখন কিশোর অপরাধীদের দখলে। সম্প্রতি পুলিশের অপরাধ দপ্তরে মোহাম্মদপুর এলাকাকে অপরাধপ্রবণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এখানকার কিশোর গ্যাংগুলো এখন কেবল এলাকাভিত্তিক আড্ডার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; তারা এখন পেশাদার অপরাধীর মতো আচরণ করছে।
গত বছর ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সদর দপ্তর রাজধানী ঢাকায় সক্রিয় ১১৮টি কিশোর গ্যাং গ্রুপের তালিকা তৈরি করে। এতে সবচেয়ে বেশি কিশোর গ্যাং তালিকাভুক্ত হয়েছে মিরপুর বিভাগের সাত থানা এলাকায়। এই বিভাগে ৩২টি গ্রুপ রয়েছে। এর মধ্যে পল্লবী থানা এলাকায় সর্বাধিক ১৪টি গ্রুপ সক্রিয়। মিরপুরের পরই তেজগাঁও বিভাগের ছয় থানা এলাকায় ২৬টি কিশোর গ্যাং গ্রুপ সক্রিয়। এর মধ্যে মোহাম্মদপুর থানা এলাকায়ই সর্বাধিক ১৬টি গ্রুপ সক্রিয়, যা এই এলাকার ভয়াবহতার চিত্র আরও স্পষ্ট করে।
পুলিশি তালিকায় ১৬টি হলেও মাঠ পর্যায়ে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এই এলাকায় নামে-বেনামে আরও বেশি কিশোর গ্যাং সক্রিয়। এগুলোর মধ্যে আলোচিত কবজি কাটা গ্রুপ। এই গ্রুপটির ধারালো অস্ত্র দিয়ে মানুষের কবজি বিচ্ছিন্ন করার দৃশ্য দেখে মানুষ কেঁপে ওঠে। গ্রুপের প্রধান আনোয়ার হোসেনসহ বেশ কয়েকজন সহযোগীকে গ্রেপ্তারের পর তাদের তৎপরতা কিছুটা কমেছে। তবে এলেক্স ইমন গ্রুপসহ পাটালি গ্রুপ, বেলচা মনির, ডায়মন্ড, ধাক্কা দে, গ্রুপ টুয়েন্টি ফাইভ, মুরগি গ্রুপ, লাল গ্রুপ, টুন্ডা বাবু, লও ঠেলা, কালা রাসেলসহ বিভিন্ন গ্রুপ এখনো এই এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে চলেছে।
এলাকাবাসী জানায়, সন্ধ্যা নামলেই মোহাম্মদপুরের দৃশ্যপট বদলে যায়। মাগরিবের আজানের পর বাইরে বের হওয়া ঝুঁকিপূর্ণ। এ সময় উঠতি বয়সী কিশোরদের বিভিন্ন গ্রুপ প্রকাশ্যে দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ছিনতাই ও চাঁদাবাজিতে মেতে ওঠে। শুধু রাতেই নয়, অন্য গ্রুপের সামনে নিজেদের প্রভাব জাহির করতে দিনদুপুরেও তারা পথচারীদের পথরোধ করে মোবাইল ফোন, মানিব্যাগ ছিনিয়ে নিচ্ছে। প্রতিবাদ করলে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করার ঘটনাও ঘটছে। এসব ঘটনা মাঝেমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়ে আলোচনার সৃষ্টি করছে।
সম্প্রতি ১২ এপ্রিল রায়েরবাজারের বুদ্ধিজীবী বেড়িবাঁধ এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে কিশোর গ্যাংয়ের দুই গ্রুপের সংঘর্ষে এলেক্স ইমন গ্রুপের মূলহোতা ইমনকে নৃশংসভাবে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। প্রতিপক্ষ গ্যাংয়ের সদস্যরা কুপিয়ে তার হাত-পা বিচ্ছিন্ন করার পর ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। নিহত এলেক্স ইমনের বিরুদ্ধে জোড়া খুনসহ ১৮টি মামলা ছিল। তিন দিনের ব্যবধানে ওই ঘটনার রেশ না কাটতেই রায়েরবাজারে বুধবার রাতে আসাদুল হক ওরফে লম্বু আসাদুল নামের এক মাদক ব্যবসায়ীকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়।
এই মোহাম্মদপুর এলাকায় এখন ভিআইপিরাও অনিরাপদ। গত মার্চ মাসে রাতে ঘুরতে বেরিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের এক মহাপরিচালক ছিনতাইয়ের শিকার হন। সে সময় তার কাছ থেকে আইফোন ও নগদ টাকা ছিনিয়ে নেওয়া হয়।
একের পর এক এমন ঘটনায় কিশোর গ্যাং সদস্যদের দৌরাত্ম্যে অতিষ্ঠ হয়ে গণরোষ ও থানা ঘেরাওয়ের মতো ঘটনাও ঘটছে। চাঁদ উদ্যান এলাকায় একটি এমব্রয়ডারি কারখানায় চাঁদা না পেয়ে কিশোর গ্যাংয়ের হামলায় দুই শ্রমিক গুরুতর আহত হন। এর প্রতিবাদে স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ আদাবর থানা ঘেরাও করে প্রতিকারের দাবি জানান।
গবেষক ও বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সমস্যার মূল রয়েছে সামাজিক কাঠামোর গভীরে। অধিকাংশ কিশোর গ্যাংয়ের পেছনে স্থানীয় তথাকথিত ‘বড় ভাই’ বা রাজনৈতিক নেতাদের হাত রয়েছে। মিছিলে লোক বাড়ানো বা আধিপত্য বিস্তারে এই কিশোরদের ব্যবহার করা হয়। কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা এখন ছুরি বা চাপাতির পাশাপাশি আগ্নেয়াস্ত্রও ব্যবহার করছে। মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণসহ বিভিন্ন অপরাধে পর্দার আড়ালের সন্ত্রাসীরা তাদের ব্যবহার করছে, যা তাদের আরও বেপরোয়া করে তুলছে।
এর পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, বিশেষ করে টিকটক ও ফেসবুকের মাধ্যমে গ্যাং কালচার ও ‘হিরোইজম’ প্রদর্শন করে কিশোরদের প্রলুব্ধ করা হচ্ছে। নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তানদের নজরদারির অভাব, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এবং উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তানদের একাকীত্বও অনেককে এই পথে টেনে আনছে।
এসব প্রতিরোধে মোহাম্মদপুর ও আদাবর এলাকায় পুলিশ ও র্যাব দফায় দফায় অভিযান চালিয়েছে। পুলিশ বলছে, মোহাম্মদপুর এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তারা গ্রেপ্তার অভিযান অব্যাহত রেখেছে। জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত দুই হাজার ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যাদের মধ্যে বিপুল সংখ্যক কিশোর ও তরুণ রয়েছে। পুলিশ কিশোর গ্যাংয়ের এলাকাভিত্তিক তালিকাও তৈরি করেছে। তবে বাস্তবতা হলো, গ্রেপ্তার করেও এই প্রবণতা পুরোপুরি কমানো যাচ্ছে না; অধিকাংশ কিশোর জামিনে বেরিয়ে এসে আবার একই পথে ফিরছে।
সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, কেবল পুলিশি পদক্ষেপে কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য বন্ধ করা সম্ভব নয়। প্রতিটি এলাকায় খেলার মাঠ তৈরি, পাড়ায় পাড়ায় কিশোরদের জন্য লাইব্রেরি ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রম চালু এবং অভিভাবকদের সচেতনতা বৃদ্ধি জরুরি। একই সঙ্গে যারা এই কিশোরদের নেপথ্যে থেকে ‘গডফাদার’ হিসেবে কাজ করছে, তাদের আইনের আওতায় আনা এই সংকট নিরসনের মূল চাবিকাঠি।