একটি পুরনো বই খুলে আপনি দেখলেন- পাতার পর পাতা লেখা রয়েছে। অক্ষরগুলো পরিষ্কার, হাতের লেখা গোছানো, শব্দগুলোর মধ্যে ফাঁক আছে, কোথাও দীর্ঘ প্যারাগ্রাফ, কোথাও ছোট ছোট অংশ। পাশে আঁকা গাছপালা, তারকা, রাশিচক্রের মতো বৃত্ত, ঔষধি উদ্ভিদের শিকড়, রহস্যময় নল-নালা আর সবুজ পানিতে দাঁড়িয়ে থাকা নগ্ন নারীর ছবি।
প্রথম দেখায় মনে হবে, একটু সময় দিলেই হয়তো বোঝা যাবে বইটি কী নিয়ে লেখা!
সমস্যা হলো, এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে ভাষাবিদ, ইতিহাসবিদ, ক্রিপ্টোগ্রাফার, কম্পিউটার বিজ্ঞানী এবং কোড-বিশেষজ্ঞরা ঠিক সেই কাজটিই করার চেষ্টা করছেন। কিন্তু আজও কেউ নির্ভরযোগ্যভাবে বলতে পারেননি, বইটির একটি পূর্ণ বাক্যের অর্থ কী!

এর নাম ভয়নিচ ম্যানুস্ক্রিপ্ট, বর্তমানে ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের Beinecke Rare Book and Manuscript Library-তে সংরক্ষিত Beinecke MS 408। এর লেখক কে, কোন ভাষায় লেখা, কেন লেখা, এমনকি এটি আদৌ কোনো ভাষায় লেখা কি না- এসব প্রশ্নের নিশ্চিত উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি!
যে বইয়ের বয়স বিজ্ঞান কিছুটা হলেও জানে!
ভয়নিচ ম্যানুস্ক্রিপ্ট নিয়ে একসময় সবচেয়ে আলোচিত ধারণাগুলোর একটি ছিল, এটি ত্রয়োদশ শতাব্দীর ইংরেজ পণ্ডিত ও ফ্রান্সিসকান ধর্মযাজক রজার বেকনের লেখা। পরে বিজ্ঞান সেই সম্ভাবনাকে কার্যত বাতিল করে দেয়।
২০০৯ সালে ইউনিভার্সিটি অব অ্যারিজোনায় পাণ্ডুলিপির চারটি ভিন্ন পার্চমেন্টের নমুনার রেডিওকার্বন পরীক্ষা করা হয়। ফলাফল অনুযায়ী, ৯৫ শতাংশ সম্ভাবনায় এগুলোর পার্চমেন্ট তৈরি হয়েছিল আনুমানিক ১৪০৪ থেকে ১৪৩৮ সালের মধ্যে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ হলো- কার্বন ডেটিং সরাসরি কালি বা লেখার বয়স নির্ধারণ করেনি। এটি যে পশুর চামড়া থেকে পার্চমেন্ট তৈরি হয়েছিল, তার সময় নির্দেশ করে। ফলে বইটি ঠিক কোন বছর লেখা হয়েছিল, তা এই পরীক্ষা থেকে নিশ্চিত হওয়া যায় না। তবে রজার বেকন ত্রয়োদশ শতাব্দীর শেষ দিকে মারা যাওয়ায় তাঁর লেখক হওয়ার ধারণা এই ফলাফলের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

একই সময় পাণ্ডুলিপির কালি ও রং নিয়েও বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা চালানো হয়। ম্যাকক্রোন অ্যাসোসিয়েটস ২০০৯ সালে বিভিন্ন পাতার কালি ও পিগমেন্ট পরীক্ষা করে। গবেষণায় এমন কোনো আধুনিক উপাদানের প্রমাণ মেলেনি, যা একে বিংশ শতাব্দীর তৈরি জাল পাণ্ডুলিপি বলে সহজে চিহ্নিত করতে পারে।
বইটির মূল লেখায় বাদামি-কালো ধরনের আয়রন-গল কালির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ উপাদান পাওয়া যায়। চিত্রে ব্যবহৃত রংও ঐতিহাসিক পাণ্ডুলিপিতে ব্যবহৃত পরিচিত খনিজ ও উপাদানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
উইলফ্রিড ভয়নিচের হাতে আসার আগে…
বইটির বর্তমান নাম এসেছে সেই মানুষটির কাছ থেকে, যিনি বিংশ শতাব্দীর শুরুতে একে আবার বিশ্বের সামনে নিয়ে আসেন।

উইলফ্রিড মাইকেল ভয়নিচ ছিলেন পোলিশ বংশোদ্ভূত বই ব্যবসায়ী ও দুর্লভ বইয়ের একজন সংগ্রাহক। ১৯১২ সালে ইতালির ফ্রাসকাতির এক জেসুইট কালেকশন থেকে তিনি পাণ্ডুলিপিটি কেনেন। বইটির রহস্যময় লিপি এবং সঙ্গে থাকা ঐতিহাসিক সূত্র দেখে তিনি এর গুরুত্ব দ্রুত বুঝতে পেরেছিলেন।
তবে বইটির ইতিহাস কিন্তু ১৯১২ সালে শুরু হয়নি।
ইয়েলের সংরক্ষিত প্রোভেন্যান্স অনুযায়ী, এর প্রাথমিক ইতিহাসের সঙ্গে হলি রোমান এম্পেরর ২য় রুডলফের নাম যুক্ত। পরবর্তীকালীন এক চিঠির বর্ণনানুযায়ী, সম্রাট বইটির জন্য ৬০০ ডুকাট দিয়েছিলেন এবং বিশ্বাস করেছিলেন এটি রজার বেকনের রচনা।
এরপর বইটি প্রাগের রাজদরবারের ফার্মাসিস্ট জ্যাকোবাস হরচিকি দি তেপেনেকের হাতে ছিল বলে প্রমাণ পাওয়া যায়। পরবর্তীকালে এর মালিক হন প্রাগের জর্জ বারেশ।

রহস্যময় বইটি বুঝতে না পেরে বারেশ রোমের বিখ্যাত জেসুইট পণ্ডিত অ্যাথানাসিয়াস কার্চারের কাছে নমুনা পাঠিয়েছিলেন। কার্চার মিশরীয় হায়ারোগ্লিফসহ বহু প্রাচীন ভাষা নিয়ে কাজ করতেন।
বারেশ মারা যাওয়ার পর বইটি যায় চিকিৎসক ও পণ্ডিত জোহানেস মার্কাস মার্সির কাছে। ১৬৬৬ সালে মার্সি পাণ্ডুলিপিটি কার্চারের কাছে পাঠান। তাঁর সেই চিঠিটিও বইটির সঙ্গে টিকে আছে।
এরপর দীর্ঘ সময় এটি জেসুইট কালেকশনে ছিল। অবশেষে ১৯১২ সালে ভয়নিচ এটি কিনে নেন।
ভয়নিচ মারা যাওয়ার পর বইটি তাঁর স্ত্রী এথেল ভয়নিচ, পরে তাঁদের সহযোগী অ্যান নিল, এবং তারপর বই ব্যবসায়ী এইচ পি ক্রসের কাছে যায়। ক্রস শেষ পর্যন্ত ১৯৬৯ সালে এটি ইয়েলের বেইনেক লাইব্রেরিকে দান করেন। সেখানেই আজও সংরক্ষিত আছে পাণ্ডুলিপিটি।
বইটির ভেতরে আসলে কী আছে?
ভয়নিচ ম্যানুস্ক্রিপ্টের লেখাই শুধু এর সবচেয়ে বড় আকর্ষণ না। এর ছবিগুলোও প্রায় সমান রহস্যময়।
বর্তমানে টিকে থাকা পাণ্ডুলিপিটি আনুমানিক ২৪০ পৃষ্ঠার। কিছু পাতা হারিয়ে গেছে এবং কয়েকটি বড় পাতা ভাঁজ খুলে দেখতে হয়। পাণ্ডুলিপির উচ্চতা প্রায় ২৩.৫ সেন্টিমিটার এবং প্রস্থ প্রায় ১৬.২ সেন্টিমিটার। ছবির বিষয়বস্তুর ভিত্তিতে গবেষকেরা সাধারণত বইটিকে কয়েকটি বড় অংশে ভাগ করেন।
প্রথমদিকের বহু পাতায় একেকটি বড় উদ্ভিদের ছবি, পাশে ভয়নিচ লিপিতে লেখা। সমস্যা হলো, অনেক গাছকে বাস্তব কোনো পরিচিত প্রজাতির সঙ্গে নিশ্চিতভাবে মেলানো যায় না। কোথাও পাতা একটি উদ্ভিদের মতো, ফুল আরেকটির মতো, শিকড় আবার সম্পূর্ণ অদ্ভুত। ফলে এগুলো বাস্তব উদ্ভিদ, প্রতীকী চিত্র, সংকর চিত্র নাকি অঙ্কনের সীমাবদ্ধতার ফল, তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে।
আরেক অংশে সূর্য, চাঁদ, তারকা এবং রাশিচক্রের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ বৃত্তাকার ডায়াগ্রাম দেখা যায়। কয়েকটি পাতায় পরিচিত জোডিয়াক চিহ্নও আছে। আবার এমন বিশাল ভাঁজ করা কসমোলজিক্যাল ডায়াগ্রাম রয়েছে, যার উদ্দেশ্য আজও পরিষ্কার নয়।

সবচেয়ে অদ্ভুত অংশগুলোর একটিতে বহু নারীকে তরলভর্তি পুল বা পাত্রের মধ্যে দেখা যায়। চারদিকে জটিল নল বা পাইপের মতো কাঠামো। এগুলোকে কখনো গোসল, চিকিৎসা, মানবদেহ, প্রজনন কিংবা মধ্যযুগীয় চিকিৎসাবিজ্ঞানের কোনো ধারণার সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু কোনো ব্যাখ্যাই প্রমাণিত নয়।
শেষের দিকে উদ্ভিদের শিকড়, পাত্র ও ঔষধ তৈরির উপকরণের মতো ছবি পাওয়া যায়। আর শেষ অংশে ছোট ছোট লেখার ব্লকের পাশে তারকার মতো চিহ্ন আছে। তাই কেউ কেউ এগুলোকে রেসিপি বা চিকিৎসা-নির্দেশনার অংশ মনে করেন।
ইয়েলও ছবির ভিত্তিতে অংশগুলোকে হারবাল, অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল বা অ্যাস্ট্রোলজিক্যাল, কসমোলজিক্যাল, ফার্মাসিউটিক্যাল এবং সম্ভাব্য রেসিপি অংশ হিসেবে বর্ণনা করে। তবে এগুলো ছবির বিষয়ভিত্তিক শ্রেণিবিন্যাস, লেখার অনুবাদ না।
ভাষা, সাইফার, নাকি অর্থহীন?
ভয়নিচের আসল রহস্য শুরু হয় এখানেই।
লেখাটি বাম থেকে ডানে লেখা। অসংখ্য চিহ্ন বারবার ফিরে আসে। নির্দিষ্ট কিছু চিহ্ন শব্দের শুরুতে বেশি দেখা যায়, কিছু আবার শেষে। একই ধরনের শব্দ নির্দিষ্ট অংশে বেশি দেখা যায় এবং শব্দের ব্যবহারে এমন কিছু নিয়ম আছে, যা নিছক এলোমেলো অক্ষর লিখে যাওয়া হলে অপ্রত্যাশিত।
২০১৩ সালে PLOS ONE-এ প্রকাশিত একটি গবেষণায় ভয়নিচ টেক্সটের পরিসংখ্যানগত বৈশিষ্ট্য পরীক্ষা করে গবেষকেরা দেখেন, এর মধ্যে এমন কাঠামো রয়েছে যা প্রাকৃতিক ভাষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
একই বছরে আরেকটি গবেষণায় বিভিন্ন অংশে কিছু শব্দের বণ্টন ও উপস্থিতির ধরন বিশ্লেষণ করে অর্থপূর্ণ টেক্সটের মতো কাঠামোর পক্ষে প্রমাণ পাওয়া যায়।

কিন্তু কোনো টেক্সটে ভাষার মতো পরিসংখ্যানগত বৈশিষ্ট্য থাকা মানেই সেই টেক্সটের ভাষা শনাক্ত হয়ে যাওয়া বোঝায় না। দক্ষতার সঙ্গে তৈরি কৃত্রিম পদ্ধতিতেও জটিল প্যাটার্ন সৃষ্টি করা সম্ভব।
২০২১ সালে অ্যানুয়াল রিভিউ অব লিঙ্গুয়িস্টিক্স-এ ক্লেয়ার বাওয়ার্ন ও লুক লিন্ডেম্যান ভয়নিচ নিয়ে ভাষাতাত্ত্বিক গবেষণার বিস্তৃত পর্যালোচনা করেন। তাঁদের বিশ্লেষণ ভয়নিচ টেক্সটকে মধ্যযুগীয় অর্থহীন প্রতারণা হিসেবে সরাসরি বাতিল না করে একটি প্রাকৃতিক ভাষা বা ভাষাভিত্তিক ব্যবস্থার দৃষ্টিতে অধ্যয়ন করার যথেষ্ট কারণ দেখায়।
একই সঙ্গে তাঁরা দেখান, ভাষার পরিচয় না জেনেও টেক্সটের ধ্বনিগত, শব্দগঠনগত এবং কাঠামোগত বৈশিষ্ট্য নিয়ে কিছু পরিসংখ্যানগত পর্যবেক্ষণ সম্ভব।
একজন না, পেছেন সম্ভবত কয়েকজন লেখক আছেন!
ভয়নিচ ম্যানুস্ক্রিপ্টকে দীর্ঘদিন এমনভাবে আলোচনা করা হয়েছে যেন কোনো এক রহস্যময় ব্যক্তি বসে পুরো বইটি লিখেছেন। আধুনিক প্যালিওগ্রাফিক গবেষণা সেই পর্যালোচনাকে আরও জটিল করেছে।
পাণ্ডুলিপি বিশেষজ্ঞ লিসা ফাগিন ডেভিস ২০২০ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় ভয়নিচের হাতের লেখা ডিজিটাল প্যালিওগ্রাফির সাহায্যে বিশ্লেষণ করেন। তাঁর গবেষণায় অন্তত পাঁচটি আলাদা লেখকের হাত শনাক্ত করার পক্ষে প্রমাণ পাওয়া যায়।
২০২৫ সালে ইয়েলের ক্লেয়ার বাওয়ার্নও এই গবেষণার কথা উল্লেখ করে বলেন, প্যালিওগ্রাফি থেকে পাঁচজন মানুষের সহযোগিতায় বইটি লেখা হয়েছিল বলে শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে।
বিশ্বের সেরা কোড-বিশেষজ্ঞরাও যেখানে আটকে গেছেন
ভয়নিচ ম্যানুস্ক্রিপ্টের খ্যাতি বেড়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ হলো, এর পেছনে শুধু শখের রহস্যসন্ধানীরাই সময় ব্যয় করেননি। আমেরিকান ক্রিপ্টোলজির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব উইলিয়াম ফ্রিডম্যান বহু বছর ভয়নিচ নিয়ে আগ্রহী ছিলেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে জাপানের বিখ্যাত পার্পল সাইফার ব্রেকিং টিমের নেতৃত্ব দেওয়া ফ্রিডম্যান আধুনিক আমেরিকান ক্রিপ্টোলজির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে পরিচিত। তাঁর মতো বিশেষজ্ঞও ভয়নিচের কোনো চূড়ান্ত সমাধান দিতে পারেননি।
এর আগে ১৯২০-এর দশকে ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভানিয়ার অধ্যাপক উইলিয়াম রোমেইন নিউবোল্ড দাবি করেছিলেন, তিনি বইটির রহস্যভেদ করেছেন এবং এর মধ্যে রজার বেকনের গুপ্ত বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের বর্ণনা আছে।
তাঁর পদ্ধতিতে অক্ষরের কালির ক্ষুদ্র ফাটলের মধ্যেও আলাদা সংকেত খোঁজা হয়েছিল। পরবর্তী গবেষকেরা দেখান, এই পদ্ধতি অত্যন্ত ব্যক্তিনির্ভর এবং একই উপাদান থেকে ইচ্ছামতো ভিন্ন পাঠ তৈরি করা সম্ভব। দাবিটি শেষ পর্যন্ত গ্রহণযোগ্যতা হারায়।

এরপরও প্রায় নিয়মিত বিরতিতে কেউ না কেউ ঘোষণা করেছেন, ভয়নিচের ভাষা শনাক্ত হয়েছে। কখনো হিব্রু, কখনো প্রাচীন বা বিলুপ্ত কোনো ভাষা, কখনো সাংকেতিক চিকিৎসাবিষয়ক লেখা বলে দাবি করা হয়েছে।
সাম্প্রতিক যুগে কম্পিউটার অ্যালগরিদম এবং আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্সও এই অনুসন্ধানে যুক্ত হয়েছে।
সমস্যা হলো, প্রকৃত পাঠোদ্ধারের মানদণ্ড অনেক কঠিন। একটি বিশ্বাসযোগ্য সমাধানকে একই নিয়ম ব্যবহার করে পাণ্ডুলিপির বড় অংশ ধারাবাহিকভাবে পড়তে সক্ষম হতে হবে, ব্যাকরণ ও শব্দভাণ্ডারের ব্যাখ্যা দিতে হবে, ছবির সঙ্গে লেখার সম্পর্ক বোঝাতে হবে এবং অন্য গবেষকদের কাছেও সেই পদ্ধতি গ্রহণযোগ্য হতে হবে।
বিচ্ছিন্ন কয়েকটি শব্দকে কোনো পরিচিত ভাষার সঙ্গে মিলিয়ে ফেলাই যথেষ্ট না। আর এখন পর্যন্ত কোনো পদ্ধতিই সেই পরীক্ষায় সর্বজনস্বীকৃতভাবে উত্তীর্ণ হয়নি।
এটা কি তাহলে বিশাল এক স্ক্যাম?
এই প্রশ্নই ভয়নিচ ম্যানুস্ক্রিপ্টের সবচেয়ে আলোচিত সম্ভাবনাগুলোর একটি।
ধরা যাক, বইটির কোনো অর্থই নেই। কোনো ব্যক্তি বা দল এমন একটি লেখা তৈরি করেছে, যা দেখতে ভাষার মতো হলেও প্রকৃতপক্ষে অর্থহীন। উদ্দেশ্য হতে পারে ধনী সংগ্রাহককে ঠকানো, রহস্যময় জ্ঞানের বই হিসেবে বিক্রি করা বা অন্য কোনো কারণে একটি কৃত্রিম পাণ্ডুলিপি তৈরি করা।
তাত্ত্বিকভাবে এটি অসম্ভব নয়। কিন্তু সমস্যা তৈরি করে বইটির ধারাবাহিকতা। প্রায় পুরো বইজুড়ে লিপির নির্দিষ্ট নিয়ম, শব্দের অবস্থানগত বৈশিষ্ট্য, অংশভেদে শব্দ ব্যবহারের পরিবর্তন এবং পরিসংখ্যানগত কাঠামো পাওয়া যায়।

PLOS ONE-এর একাধিক গবেষণা এবং পরবর্তী ভাষাতাত্ত্বিক পর্যালোচনা এই কাঠামোগুলোকে গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়ার কারণ দেখিয়েছে। অন্যদিকে এই গবেষণাগুলো এমন কোনো সিদ্ধান্তও দেয় না যে ভয়নিচ অবশ্যই পরিচিত অর্থে একটি সাধারণ প্রাকৃতিক ভাষায় লেখা।
এটি সাইফার হতে পারে, কোনো অজানা বা বিলুপ্ত ভাষা হতে পারে, কৃত্রিম লিখনব্যবস্থা হতে পারে, সংক্ষিপ্ত লিপির জটিল পদ্ধতি হতে পারে কিংবা এমন কোনো টেক্সট-জেনারেশন ব্যবস্থা হতে পারে, যার নিয়ম আমরা এখনো বুঝিনি।
সর্বশেষ পরিস্থিতি
একবিংশ শতাব্দীতে ভয়নিচ ম্যানুস্ক্রিপ্ট নিয়ে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে গবেষণার সুবিধা অনেক বেশি। ইয়েল পুরো পাণ্ডুলিপির হাই রেজল্যুশনের ডিজিটাল ছবি গবেষকদের জন্য উন্মুক্ত রেখেছে। ফলে পৃথিবীর যেকোনো জায়গা থেকে এর ক্ষুদ্রতম অক্ষর, দাগ, ছবি ও পাতার বিন্যাস বিশ্লেষণ করা সম্ভব।
কম্পিউটেশনাল লিঙ্গুইস্টিকস এখন বিপুল সংখ্যক পরিচিত ভাষার টেক্সটের সঙ্গে ভয়নিচের প্যাটার্ন তুলনা করতে পারে। ডিজিটাল প্যালিওগ্রাফি বিভিন্ন লেখকের হাত আলাদা করছে। ইমেজ অ্যানালাইসিস চিত্রের ধরন তুলনা করছে মধ্যযুগীয় হারবাল, চিকিৎসা ও জ্যোতির্বিদ্যার বইয়ের সঙ্গে। রাসায়নিক পরীক্ষা বইটির বস্তুগত ইতিহাসকে তুলে ধরছে।
তবু ফেব্রুয়ারি ২০২৫-এ ইয়েল যখন পাণ্ডুলিপিটি নিয়ে নতুন করে লিখেছিল, তখনও এর রহস্যের কোনো সমাধান মেলেনি।
আমরা এমন এক যুগে বাস করছি, যেখানে হাজার বছরের পুরনো ডিএনএ বিশ্লেষণ করা যায়, স্যাটেলাইট দিয়ে মাটির নিচে হারিয়ে যাওয়া স্থাপনা শনাক্ত করা যায়, আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স কয়েক সেকেন্ডে বিপুল টেক্সট বিশ্লেষণ করতে পারে। অথচ কয়েকশ বছরের পুরনো একটি ছোট বই আমাদের সামনে খোলা অবস্থায় পড়ে আছে, প্রতিটি অক্ষর দেখা যাচ্ছে, প্রায় পুরো বই অনলাইনে দেখা যায়, তারপরও আমরা জানি না লেখক আমাদের কী বলতে চেয়েছিলেন!
একদিন হয়তো ভয়নিচ ম্যানুস্ক্রিপ্টের পাঠোদ্ধার হবে। তখন হয়তো জানা যেতে পারে এটি কোনো চিকিৎসকের বই, ঔষধবিষয়ক নির্দেশিকা, জ্যোতিষ ও চিকিৎসার সংকলন, কোনো সাংকেতিক জ্ঞানভাণ্ডার কিংবা সম্পূর্ণ ভিন্ন কিছু। অথবা আবিষ্কারটি আরও অস্বস্তিকর হতে পারে।
সেই উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত এই পাণ্ডুলিপির পাতাগুলো আমরা দেখতে পারি, এর বয়স সম্পর্কে ধারণা করতে পারি, এর কালি পরীক্ষা করতে পারি, লেখকদের হাত আলাদা করতে পারি, শব্দের গাণিতিক প্যাটার্ন পর্যন্ত বের করতে পারি, শুধু পারি না সেই বইটিই পড়তে!
ফিচার ইমেজ: Cesar Manso / AFP / Getty
তথ্যসূত্র
- The Beinecke Cipher (Voynich) Manuscript – Current collection record – Yale University Library, Beinecke Rare Book & Manuscript Library
- Deciphering a Mysterious Manuscript – February 21, 2025 – Yale News
- Probing the Statistical Properties of Unknown Texts: Application to the Voynich Manuscript – June 21, 2013 – PLOS ONE
- Keywords and Co-Occurrence Patterns in the Voynich Manuscript: An Information-Theoretic Analysis – June 21, 2013 – PLOS ONE
- How Many Glyphs and How Many Scribes? Digital Paleography and the Voynich Manuscript – 2020 – Manuscript Studies: A Journal of the Schoenberg Institute for Manuscript Studies
- The Linguistics of the Voynich Manuscript – January 4, 2021 – Annual Review of Linguistics