Skip to main content

Ridge Bangla

বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের অজানা যত দিক

১. বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য নামকরণ

আজ যাকে আমরা “বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য” নামে চিনি, তৎকালে এমন নামের প্রচলন ছিল না। তারা নিজেদের বলত “রোমায়োই”— অর্থাৎ রোমান। বাইজান্টাইন নামটি এসেছে তাদের পুরনো রাজধানী “বাইজান্টিয়াম” থেকে। এই নাম প্রচলিত হয় ১৮শ ও ১৯শ শতকের ইউরোপীয় ইতিহাসবিদদের কলমে। প্রকৃতপক্ষে, তাদের চোখে তারা ছিল পূর্ব রোমান সাম্রাজ্যের উত্তরসূরি। রোম থেকে রাজধানী সরিয়ে আনা হয়েছিল কনস্টান্টিনোপলে। কিন্তু রোমান আইন, ঐতিহ্য ও গৌরবের প্রতি ভালোবাসা তাদের রক্তে মিশে ছিল।

২. নতুন রাজধানী নোভা রোমা

৩২৪ খ্রিষ্টাব্দে সম্রাট কনস্টান্টিন যখন রোম নগরীর বিশৃঙ্খলা ও দুর্বল প্রশাসন দেখে হতাশ হন, তখন তিনি বসফরাস প্রণালীর তীরে অবস্থিত বাইজেন্টিয়াম শহরকে নতুন রাজধানী হিসেবে নির্বাচিত করেন। এটি ইউরোপ ও এশিয়ার সংযোগস্থলে অবস্থিত হওয়ায় কৌশলগতভাবে ছিল অতি গুরুত্বপূর্ণ। মাত্র ছয় বছরের মধ্যেই সেখানে গড়ে তোলা হয় রাজপ্রাসাদ, সিনেট ভবন, বাণিজ্যকেন্দ্র, বিশাল প্রতিরক্ষা প্রাচীর ও ধর্মীয় উপাসনালয়। প্রথমে এর নাম দেওয়া হয় নোভা রোমা, অর্থাৎ, নতুন রোম। কিন্তু সেটিই পরে কনস্টান্টিনোপল নামে ইতিহাসে স্থায়ী হয়ে যায়।

৩. জাস্টিনিয়ানের উত্থান

সম্রাট জাস্টিনিয়ানের শাসনকালে বাইজান্টাইন সাম্রাজ্য প্রবেশ করেছিল স্বর্ণযুগে। অথচ তিনি জন্মেছিলেন এক সাধারণ কৃষক পরিবারে। সাদাসিধে শুকরপালক তাঁর চাচা জাস্টিন সেনাবাহিনীর মাধ্যমে উঠে এসে একসময় সিংহাসন দখল করেন। জাস্টিনের মৃত্যুর পর ৫২৭ সালে জাস্টিনিয়ান সিংহাসনে বসেন। তিনি পুরনো রোমান ভূখণ্ডের অনেকটাই পুনর্দখল করেন। তিনি রোমান আইনসমূহ সংকলনের মাধ্যমে Corpus Juris Civilis রচনা করেন, যা আধুনিক ইউরোপীয় আইনের ভিত্তি হিসেবে গণ্য করা হয়।

৪. নিক দাঙ্গা

৫৩২ খ্রিষ্টাব্দে কনস্টান্টিনোপলে ঘটা ভয়াবহ দাঙ্গা, “নিক দাঙ্গা” নামে পরিচিত। ওই আমলে রথ দৌড় ছিল তুমুল জনপ্রিয়। একে কেন্দ্র করে “ব্লুজ” ও “গ্রিনস” নামে দুটি দলের সমর্থকদের মধ্যে চরম শত্রুতা বজায় ছিল। একপর্যায়ে এই দুই প্রতিদ্বন্দ্বী দল করব্যবস্থা ও শাসননীতির বিরুদ্ধে এক হয়ে বিদ্রোহ শুরু করে। পুরো শহরে অগ্নিসংযোগ, লুণ্ঠন আর হত্যাকাণ্ড শুরু হয়। জাস্টিনিয়ান রাজপ্রাসাদ ত্যাগের চিন্তা করলেও তাঁর স্ত্রী থিওডোরা তাঁকে মোকাবেলার অনুপ্রেরণা দেন। ফলত, জাস্টিনিয়ান সেনাবাহিনী পাঠিয়ে হিপোড্রোম ঘিরে বিদ্রোহ দমন করেন। প্রায় ৩০,০০০ বিদ্রোহী নিহত হয় এই সংঘর্ষে, যা শহরের জনসংখ্যার প্রায় এক-দশমাংশ।

বাইজেন্টাইন রাজনীতিতে প্রতিদ্বন্দ্বীকে শারীরিকভাবে অক্ষম করে সরিয়ে দেওয়া ছিল স্বাভাবিক রীতি। দৃষ্টিশক্তি কেড়ে নেওয়া, নাক বা কান কেটে দেওয়া, এমনকি খোজা করে ফেলা হতো, যাতে তারা সেনাপতি হতে না পারে বা উত্তরাধিকার রেখে যেতে অসমর্থ হয়। বিশ্বাস করা হতো, দৈহিক কোনো অপূর্ণতা থাকলে কেউ সিংহাসনের দাবিদার হতে পারবে না। কিন্তু এই পন্থা সব সময় কাজে আসত না। সম্রাট ২য় জাস্টিনিয়ান এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। ৬৯৫ সালে তাঁর নাক কেটে দেয়া হয়েছিল। তবুও নির্বাসন থেকে ফিরে এসে তিনি আবার রাজসিংহাসনে বসেন।

৬. গ্রিক ফায়ার

সপ্তম শতাব্দী থেকে বাইজেন্টাইন নৌবাহিনী গ্রিক ফায়ার নামে এক রহস্যময় দাহ্য তরলের ব্যবহার শুরু করে। এটি ছিল এমন এক আগুন, যা পানিতে ফেললেও নিভতো না। উপাদান হিসেবে সম্ভবত ব্যবহৃত হতো পেট্রোলিয়ম, রজন, গন্ধক ও সল্টপিটার। এটি নৌযুদ্ধে পাইপ দিয়ে ছোড়া যেত বা কাদামাটির হাঁড়িতে ভরে শত্রুপক্ষের দিকে ছুড়ে মারা হতো। এই অস্ত্রের ভয়ে আরব ও রুশ বাহিনী বহুবার কনস্টান্টিনোপল অবরোধ করেও ব্যর্থ হয়। গ্রিক ফায়ার ছিল বাইজান্টাইন সামরিক কৌশলের অন্যতম রহস্যময় ও বিধ্বংসী দিক।

৭. হায়া সোফিয়া

সম্রাট জাস্টিনিয়ান নির্মিত হায়া সোফিয়া শুধু একটি ধর্মীয় উপাসনালয় নয়, এটি বাইজেন্টাইন স্থাপত্যের গৌরবময় প্রতীক বটে। ৫৩৭ খ্রিষ্টাব্দে সম্পন্ন এই গির্জার বিশাল গম্বুজ, সূক্ষ্ম মোজাইক, এবং স্তম্ভশোভিত নকশা শতাব্দীর পর শতাব্দী স্থাপত্যশিল্পে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে। প্রায় হাজার বছর ধরে এটি ছিল খ্রিষ্টান বিশ্বের সবচেয়ে বড় গির্জা। পরে এটি মসজিদ, এরপর জাদুঘর, এবং এখন আবার মসজিদ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

৮. ধর্মীয় বিভাজন

বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য ছিল খ্রিষ্টীয় চিন্তায় গড়া। কিন্তু ধীরে ধীরে তাদের ধর্মাচার রোমান ক্যাথলিক চার্চ থেকে আলাদা হয়ে যায়। ১০৫৪ সালে প্যাট্রিয়ার্ক ও পোপ একে অপরকে বহিষ্কার করলে এই দ্বন্দ্ব চূড়ান্ত আকারে রূপ নেয়। এর ফলে খ্রিষ্টধর্ম ভাগ হয়ে যায় রোমান ক্যাথলিক ও ইস্টার্ন অরথোডক্স চার্চে। বহিষ্কারপত্র পরে রদ হলেও বিভাজন থেকেই যায়।

৯. ল্যাটিন সাম্রাজ্য

১২০৪ সালে চতুর্থ ক্রুসেডের বাহিনী বাইজেন্টাইন রাজধানী কনস্টান্টিনোপল দখল করে ভয়াবহ লুটপাট চালায়। বহু মূল্যবান শিল্পকর্ম ও ধর্মীয় নিদর্শন বিনষ্ট হয়। সাময়িকভাবে তারা এখানে “ল্যাটিন সাম্রাজ্য” প্রতিষ্ঠা করে। ১২৬১ সালে শহর পুনরুদ্ধার করা হলেও সাম্রাজ্য তখন ছিল জৌলুশহীন।

১০. সাম্রাজ্যের পতন

১৪৫৩ সালে অটোমান সুলতান মুহাম্মদ দ্বিতীয় বিশাল কামান দিয়ে কনস্টান্টিনোপল ঘিরে ধরেন। দীর্ঘ গোলাবর্ষণে শহরের প্রাচীর ভেঙে পড়ে। সম্রাট ১১শ কনস্টান্টিন যুদ্ধের ময়দানে মৃত্যুবরণ করেন। এর মাধ্যমে প্রায় ১১০০ বছরের বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের ইতি ঘটে।

১১. জ্ঞানের পৃষ্ঠপোষকতা

প্লেটো, এরিস্টটল থেকে গ্যালেনসহ অনেক প্রাচীন গ্রিক মনীষীর লেখাই বাইজান্টাইনদের কপিকৃত পাণ্ডুলিপির মাধ্যমে আজও টিকে আছে। কনস্টান্টিনোপলের গ্রন্থাগার এসব পাণ্ডুলিপি সংরক্ষণ করেছিল। এই সংরক্ষিত জ্ঞানই পরে ইউরোপের রেনেসাঁয় বড় ভূমিকা রাখে।

তথ্যসূত্র

১। 5 Facts About the Byzantine Empire – Owlcation

২। 10 Fascinating Facts about the Byzantine Empire – History Adventures

৩। Lesser Known Byzantine Empire Facts – History Collection

৪। Byzantine Empire – World History Encyclopedia

৫। 10 Things You May Not Know About the Byzantine Empire | HISTORY

This post was viewed: 40

আরো পড়ুন