১৯৬২ সালের ৩০ জানুয়ারি; পূর্ব আফ্রিকার টাঙ্গানিকার কাশাশা গ্রামের একটি মেয়েদের বোর্ডিং স্কুলে হঠাৎ অস্বাভাবিক আচরণ শুরু করল তিন ছাত্রী। তারা হাসছিল, কিন্তু সেটি কোনো মজার ঘটনা দেখে স্বাভাবিক হাসি ছিল না। তাদের হাসি থামানো যাচ্ছিল না, পড়াশোনায় মন দেওয়া যাচ্ছিল না! কিছুক্ষণের মধ্যে আরও কয়েকজন ছাত্রী একই ধরনের সমস্যায় আক্রান্ত হতে শুরু করল।
কয়েক সপ্তাহ যেতে না যেতেই পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছাল যে স্কুল চালু রাখাই অসম্ভব হয়ে পড়ল! ১৫৯ জন ছাত্রীর মধ্যে ৯৫ জনই আক্রান্ত হলো এতে। শেষ পর্যন্ত ১৮ মার্চ স্কুল বন্ধ করে সবাইকে বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হয়। কর্তৃপক্ষ তখনও জানত না, স্কুল বন্ধ করার মধ্য দিয়ে সমস্যার শেষ হচ্ছে না। বরং কাশাশার গণ্ডি পেরিয়ে ঘটনাটি ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে আশপাশের জনপদেও!
পরবর্তী মাসগুলোতে কয়েকটি গ্রাম ও স্কুলে একই ধরনের উপসর্গ দেখা যায়। শেষ পর্যন্ত ঘটনাটি এতটাই বড় আকার ধারণ করে যে পরবর্তী বিবরণগুলোতে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা প্রায় ১ হাজার এবং সাময়িকভাবে বন্ধ হওয়া স্কুলের সংখ্যা ১৪ পর্যন্ত বলা হয়েছে। ইতিহাসে ঘটনাটি পরিচিত হয়ে যায় ‘টাঙ্গানিকা লাফটার এপিডেমিক’ নামে।
যে হাসি ছিল যন্ত্রণার অংশ!
ইন্টারনেটে ঘটনাটির বর্ণনা পড়লে মনে হতে পারে, কোনো অদ্ভুত কারণে একদল মানুষ হাসতে শুরু করেছিল এবং তারপর হাসি যেন সংক্রামক রোগের মতো একজন থেকে আরেকজনের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। ঘটনা আসলে এমন ছিল না।
এই ঘটনার পর চিকিৎসক এ এম র্যাঙ্কিন ও পি জে ফিলিপ আক্রান্ত এলাকা পরিদর্শন করেন। ১৯৬৩ সালে তাদের রিপোর্টে ঘটনাটিকে শুধু হাসির সমস্যা হিসেবে বর্ণনা করা হয়নি। তারা লিখেছিলেন হাসি, কান্না এবং অস্থিরতার কথা। শারীরিক পরীক্ষায় তেমন কোনো অস্বাভাবিকতা পাওয়া যায়নি, ল্যাবরেটরির পরীক্ষাও স্বাভাবিক ছিল। খাবারে বিষাক্ত কোনো উপাদানের প্রমাণও মেলেনি। মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেনি।

পরবর্তী বিবরণে আক্রান্তদের মধ্যে ব্যথা, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া, শ্বাসকষ্ট, ত্বকে র্যাশ, চিৎকার এবং প্রবল অস্থিরতার মতো আরও নানা উপসর্গের উল্লেখ পাওয়া যায়। অনেক ক্ষেত্রে হাসির পাশাপাশি কান্না করতেও দেখা যেত তাদের।
কাশাশার আক্রান্ত ছাত্রীদের বয়স ছিল ১২-১৮ বছরের মধ্যে। কারও সমস্যা কয়েক ঘণ্টা স্থায়ী হয়েছে, কারও ক্ষেত্রে একই উপসর্গ ছিল কয়েক দিন। বহুল উদ্ধৃত মেডিক্যাল বিবরণ অনুযায়ী কোনো কোনো আক্রান্ত ছাত্রীর উপসর্গ সর্বোচ্চ ১৬ দিন পর্যন্ত ছিল। এই সময়ে হাসি, কান্না ও অন্যান্য উপসর্গ বারবার ফিরে আসছিল। আরেকটি বিষয়ও চিকিৎসকদের নজর এড়ায়নি। স্কুলের শিক্ষার্থীরা আক্রান্ত হলেও শিক্ষকরা হননি!
স্কুল বন্ধ হলো, কিন্তু সমস্যা ছড়িয়ে পড়ল
১৮ মার্চ কাশাশার স্কুল বন্ধ হওয়ার পর ছাত্রীরা নিজ নিজ বাড়িতে ফিরে যায়। এরপর নতুন নতুন জায়গায় একই ধরনের ঘটনার খবর আসতে শুরু করে। কাশাশার কয়েকজন ছাত্রীর বাড়ি এনশাম্বা নামের একটি গ্রামে ছিল। এপ্রিল-মে মাসের মধ্যে সেখানে ২১৭ জনের মধ্যে অনুরূপ সমস্যা দেখা যায়। আক্রান্তদের বড় অংশই ছিল স্কুলপড়ুয়া শিশু ও তরুণ।
কাশাশার স্কুলটি ২১ মে আবার খোলা হয়। কিন্তু পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়নি। নতুন করে আরও ৫৭ জন ছাত্রী আক্রান্ত হওয়ার পর জুনের শেষ দিকে স্কুলটি আবার বন্ধ করতে হয়। একই সময়ে বুকোবার কাছে রামাশেনিয়ে গার্লস মিডল স্কুলেও সমস্যা দেখা দেয়, সেখানে অন্তত ৪৮ জন ছাত্রী আক্রান্ত হয়। অন্য কয়েকটি স্কুল ও গ্রাম থেকেও একই ধরনের খবর আসতে থাকে।
এই ছড়িয়ে পড়ার বিষয়টি দেখতে সংক্রামক রোগের মতো হলেও কোনো ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়া পাওয়া যাচ্ছিল না। বিষক্রিয়ার প্রমাণ ছিল না। আক্রান্তরা সবাই একই খাবারও খাচ্ছিল না। তাহলে কী ছড়াচ্ছিল?
কোনো রহস্যময় ভাইরাস ছিল কি?
ঘটনার অদ্ভুত প্রকৃতি স্বাভাবিকভাবেই নানা ব্যাখ্যার জন্ম দেয়। বিষাক্ত খাবার, পরিবেশগত দূষণ থেকে শুরু করে অজানা জীবাণুর কথাও ভাবা হয়। স্থানীয় পর্যায়েও নানা বিশ্বাস ও গুজব তৈরি হয়। কিন্তু বৈজ্ঞানিক পরীক্ষায় কোনো পরিচিত জৈবিক কারণ শনাক্ত করা যায়নি। র্যাঙ্কিন ও ফিলিপ শেষ পর্যন্ত ঘটনাটিকে সে সময়ের ভাষায় ম্যাস হিস্টেরিয়া হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। বর্তমানে এ ধরনের ঘটনার ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে নিরপেক্ষ শব্দ ম্যাস সাইকোজেনিক ইলনেস বা ম্যাস সোসিওজেনিক ইলনেস বেশি ব্যবহৃত হয়।

নামটি শুনে মনে হতে পারে আক্রান্তরা হয়তো অভিনয় করছিলেন বা তাদের অসুস্থতা কাল্পনিক ছিল। বিষয়টি আসলে তা না। ম্যাস সাইকোজেনিক ইলনেসে কোনো গোষ্ঠীর মধ্যে বাস্তব শারীরিক উপসর্গ দেখা দিতে পারে, অথচ সেই উপসর্গের পেছনে কোনো সংক্রামক জীবাণু, বিষ বা স্পষ্ট শারীরিক রোগ খুঁজে পাওয়া যায় না। মানসিক চাপ, ভয়, উদ্বেগ এবং অন্য মানুষের উপসর্গ দেখার মতো সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব এখানে ভূমিকা রাখতে পারে। এ কারণেই একজনের অস্বাভাবিক আচরণ দেখে একই পরিবেশে থাকা অন্য মানুষের মধ্যেও অনুরূপ শারীরিক প্রতিক্রিয়া তৈরি হতে পারে।
একটি কৌতুক থেকে সব শুরু হয়েছিল?
টাঙ্গানিকা লাফটার এপিডেমিক নিয়ে সবচেয়ে জনপ্রিয় কাহিনিগুলোর একটি হলো- তিন ছাত্রী কোনো একটি কৌতুক শুনে হাসতে শুরু করেছিল। সেই হাসিই পরে গোটা এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে! এই দাবির পেছনে শক্ত প্রমাণ নেই।
ঘটনাটি নিয়ে পরবর্তী সময়ে বিস্তারিত গবেষণা করা ভাষাবিদ ক্রিশ্চিয়ান হেম্পেলম্যান দেখিয়েছেন, আধুনিক জনপ্রিয় বর্ণনায় হাসির ভূমিকাকে অনেক সময় অতিরঞ্জিত করা হয়েছে। একটি হাস্যকর ঘটনা, কোনো ভাইরাস কিংবা সাধারণভাবে একজনের হাসি দেখে আরেকজনের হেসে ওঠাকে এই ঘটনার যথেষ্ট ব্যাখ্যা হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক না। তিনি একে ম্যাস সাইকোজেনিক ইলনেসের একটি রূপ হিসেবে দেখেছেন, যেখানে হাসি একাধিক উপসর্গের একটি হিসেবে ছিল।
ঘটনাটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল সময়কাল। টাঙ্গানিকা ব্রিটিশ শাসন থেকে স্বাধীনতা লাভ করে ১৯৬১ সালের ৯ ডিসেম্বর। কাশাশার স্কুলে প্রথম ঘটনা ঘটে তার মাত্র ৭ সপ্তাহের মতো পরে, ১৯৬২ সালের ৩০ জানুয়ারি। পরবর্তী কয়েকজন গবেষক মনে করেছেন, এই সামাজিক পরিবর্তনের সময়কার চাপ ঘটনার পেছনে ভূমিকা রেখে থাকতে পারে। স্বাধীনতার পর নতুন রাষ্ট্রে শিক্ষা নিয়ে প্রত্যাশা বাড়ছিল। একই সঙ্গে মিশনারি বোর্ডিং স্কুলের কঠোর পরিবেশ, পরিবারের প্রত্যাশা এবং কিশোরীদের সীমিত সামাজিক ক্ষমতার মতো বিষয়ও মানসিক চাপ তৈরি করতে পারে বলে ধারণা করা হয়েছে।
হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘটনাটি নিয়ে দীর্ঘ গবেষণা করা লতিফ নাসেরও একে সদ্য স্বাধীন একটি সমাজের বৃহত্তর সাংস্কৃতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষণ করেছেন। তার গবেষণা অনুযায়ী শেষ পর্যন্ত ১ হাজারের বেশি মানুষ কোনো না কোনোভাবে এই ঘটনার মধ্যে পড়ে এবং সময়ের সঙ্গে প্রাদুর্ভাবটি নিজে থেকেই স্তিমিত হয়ে যায়। কেউ মারা যায়নি এবং আক্রান্তরা ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠে।
সত্যিই কি ১৮ মাস ধরে সবাই হাসছিল?
বিভিন্ন জনপ্রিয় কাহিনিতে বলা হয়, ঘটনাটি প্রায় ১৮ মাস স্থায়ী হয়েছিল। কোথাও সময়কাল আরও দীর্ঘ বলা হয়েছে। কিন্তু তার মানে এই না যে একই মানুষ পুরো দেড় বছর ধরে হাসছিলেন! বরং বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন স্কুল ও গ্রামে নতুন করে উপসর্গ দেখা দিয়েছিল। কোনো ব্যক্তির ক্ষেত্রে উপসর্গ কয়েক ঘণ্টা থেকে কয়েক দিন চলেছে, এরপর থেমেছে। এক এলাকায় পরিস্থিতি শান্ত হওয়ার সময় অন্য এলাকায় নতুন ঘটনা দেখা গেছে। এই ধারাবাহিকতাই পুরো ঘটনাটিকে দীর্ঘস্থায়ী করেছে।
ছয় দশকের বেশি সময় পরও টাঙ্গানিকা লাফটার এপিডেমিক জনপ্রিয় মূলত এর অদ্ভুত নামের জন্য। হাসি সাধারণত আনন্দ-বিনোদনের সঙ্গে জড়িত এক মানবিক প্রতিক্রিয়া। তাই ১ হাজার মানুষকে আক্রান্ত করা ‘হাসির মহামারি’ শুনলে ঘটনাটি প্রায় অবিশ্বাস্য বলে মনে হয়। কিন্তু বাস্তবতা মোটেও এমন ছিল না।
কাশাশার মেয়েরা হাসছিল ঠিকই, কিন্তু তারা আনন্দে হাসছিল না। কেউ কাঁদছিল, কেউ অস্থির হয়ে পড়ছিল, কেউ শারীরিকভাবে অসুস্থ বোধ করছিল। চিকিৎসকেরা এর পেছনে দায়ী জীবাণু বা বিষের কিছুই পেলেন না। শেষ পর্যন্ত যে ব্যাখ্যা সবচেয়ে বেশি গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে, সেটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়- মানুষের মন ও শরীরকে আলাদা দুটি জগৎ হিসেবে দেখা সব সময় সম্ভব না। প্রবল মানসিক চাপ কখনো কখনো শরীরের ভাষায় প্রকাশ পেতে পারে। আবার একটি ঘনিষ্ঠ সামাজিক গোষ্ঠীতে ভয়, উদ্বেগ ও আচরণ অন্যদের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
১৯৬২ সালের টাঙ্গানিকার সেই ঘটনার সব প্রশ্নের নিখুঁত উত্তর আজও আমাদের হাতে নেই। কোন নির্দিষ্ট চাপ প্রথম তিন ছাত্রীর উপসর্গের সূচনা করেছিল, কেন একজন আক্রান্ত হলো অথচ পাশের মানুষটি হলো না, কিংবা কেন হাসিই এত দৃশ্যমান উপসর্গ হয়ে উঠল- এসবের নিশ্চিত উত্তর পাওয়া কঠিন। তবে একটি বিষয় পরিষ্কার। এটা এমন এক পরিস্থিতির গল্প, যেখানে মানুষের শরীর এমন কিছু প্রকাশ করেছিল, যা হয়তো তারা অন্যভাবে প্রকাশ করতে পারছিল না। আর সে কারণেই টাঙ্গানিকার সেই হাসির মহামারি আজও ইতিহাসের সবচেয়ে অদ্ভুত জনস্বাস্থ্য ঘটনাগুলোর একটি হয়ে আছে।
ফিচার ইমেজ: Arabia Weather
রেফারেন্স
- An epidemic of laughing in the Bukoba district of Tanganyika – May 1, 1963 – Central African Journal of Medicine
- The laughter of the 1962 Tanganyika ‘laughter epidemic’ – March 12, 2007 – HUMOR / De Gruyter
Full source - The outbreak of hysteria that’s no fun at all – November 21, 2007 – The Guardian
Full source - Spasms of the Soul: The Tanganyika Laughter Epidemic in the Age of Independence – June 6, 2014 – Harvard University
Full source - The 1962 Laughter Epidemic of Tanganyika Was No Joke – January 15, 2016 – Atlas Obscura
Full source - The Tanganyika laughter epidemic of 1962: When uncontrollable laughing became a public health crisis – July 2, 2026 – The Times of India
Full source