Skip to main content

Ridge Bangla

দ্বিতীয় বার্বার যুদ্ধ: ভূমধ্যসাগরে নতুন শক্তির উত্থান

প্রথম বার্বার যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল ১৮০১ থেকে ১৮০৫ সাল পর্যন্ত। উত্তর আফ্রিকার বার্বার রাজ্যগুলোর সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সন্ধির মাধ্যমে আপাত সমাপ্তি ঘটে লড়াইয়ের। তবে বার্ষিক চাঁদা দিয়ে নিজেদের বাণিজ্য জাহাজের নিরাপত্তা বিধানের পদ্ধতি খুব একটা উপাদেয় হয়নি অনেক আমেরিকানের কাছে। বার্বার রাজ্যগুলোও অর্থের পরিমাণে সন্তুষ্ট ছিল না।

নতুন উত্তেজনা

১৮১২ সালে আলজিয়ার্সের শাসক হাজি আলির (Haji Ali ben Khalil) সাথে মনোমালিন্য আরম্ভ হয় মার্কিন সরকারের। প্রথম যুদ্ধের পর বার্ষিক যে চাঁদা নির্ধারিত হয়েছিল সেটা তাঁর কাছে অকিঞ্চিৎকর মনে হলো। এর পেছনে অবশ্য ব্রিটিশ কূটনীতিবিদদেরও হাত ছিল। ব্রিটিশ কানাডার সাথে আমেরিকানদের দ্বন্দ্ব গড়াচ্ছিল যুদ্ধের দিকে। ব্রিটিশরা চাইছিল বার্বার রাজ্যগুলো নতুন করে হামলা শুরু করলে চাপে পড়বে আমেরিকার অর্থনীতি। সেই সুযোগে দাঁও মারবে তারা। তাদের প্ররোচনায় সেই বছরেই অতিরিক্ত চাঁদা দাবি করে প্রত্যাখ্যা হন তিনি, এরপরেই ঘোষণা দেন যুদ্ধের।

কাছাকাছি সময়ে ব্রিটিশ কানাডা আর যুক্তরাষ্ট্র জড়িয়ে পড়ে সংঘাতে। মার্কিনিদের সামরিক শক্তির সিংহভাগ সেদিকে ব্যস্ত ছিল। এজন্য ভূমধ্যসাগর থেকেও ডেকে নিয়ে যাওয়া হয় নৌবহর। ইউরোপিয়ানরাও ব্যস্ত নেপোলিয়নের ফ্রান্সের সাথে শক্তি পরীক্ষায়, জলদস্যুতা নিয়ে মাথা ঘামানোর সময় নেই তাদেরও। সুযোগ চিনতে ভুল হয়নি বার্বার জলদস্যুদের। জোরেশোরে আমেরিকান বাণিজ্যজাহাজ ছিনিয়ে নিতে থাকে তারা। বন্দী নাবিকদের ব্যবহার করা হতো মুক্তিপণের জন্য।

ব্রিটিশদের সাথে চলমান সংঘাতের কারণে বন্দী নাবিকদের ফিরিয়ে আনা এবং আলজিয়ার্সের উপযুক্ত বিহিত করা প্রায় অসম্ভব ছিল। তবে ঘেন্টের চুক্তির মাধ্যমে শান্তি স্থাপিত হলে ভূমধ্যসাগরে মনোযোগ দেয় মার্কিন সরকার। প্রেসিডেন্ট জেমস ম্যাডিসন (James Madison) কংগ্রেসের কাছে অনুরোধ করেন আলজিয়ার্সের বিরুদ্ধে যুদ্ধের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা।

এই সংঘর্ষকে সরাসরি যুদ্ধ বলতে ইতস্তত করেছিল মার্কিন আইনপরিষদ। তবে আইন করে প্রেসিডেন্টকে প্রচুর ক্ষমতা দেয় তারা। সাগরে আমেরিকান জাহাজের সুরক্ষায় পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে নৌবহর পাঠাতে পারবেন তিনি। শুধু তা-ই না, তাঁর দেয়া ক্ষমতাবলে সাগরে চলাচলের সময় আলজিয়ার্সের সমস্ত জাহাজ বৈধ টার্গেট হবে। এজন্য দরকার হলে ব্যক্তিগত জাহাজের মালিকদেরও (privateers) কাজে লাগাতে পারবেন ম্যাডিসন।

সংঘাত

১৮১৫ সালের তেসরা মার্চ কংগ্রেস আলজিয়ার্সের বিরুদ্ধ নৌ-অভিযানের অনুমোদন দেয়। এই দায়িত্ব পড়ে কমোডোর স্টিফেন ডেকাটরের (Stephen Decatu) ওপর। দুই সপ্তাহ পর নয়টি রণতরী নিয়ে রওনা হলেন কমোডোর- কন্সটেলেশন, মেসিডোনিয়া, এপার্ভিয়ার, অন্টারিও, ফায়ারফ্লাই, স্পার্ক, ফ্ল্যাম্বু, টর্চ আর স্পিটফায়ার। ডেকাটর ছিলেন অগ্রবর্তী বাহিনী, কারণ তাঁর পেছনে যাত্রা করে আরো বড় একটি বহর। মূল দলের প্রধান ছিলেন উইলিয়াম বেইনব্রিজ (William Bainbridge)।

জুনের ১৭ তারিখ আলজেরিয়ার ৪৬-কামানের ফ্রিগেট মেশুদা (Meshuda) পড়ে যায় ডেকাটরের মুখোমুখি। মেশুদার দায়িত্বে ছিলেন অ্যাডমিরাল হামিদু (Hamidou), জায়গাটা ছিল স্পেনের দক্ষিণপূর্ব উপকূল, গাটা অন্তরীপ। কেপ গাটার যুদ্ধে (Battle off Cape Gata) একাকী মেশুদা ঘেরাও হয়ে যায় ডেকাটরের জাহাজ দিয়ে। বন্দরের দিকে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে বাধা দেন কমোডোর। একপর্যায়ে বেদখল হয়ে যায় আলজেরিয়ার ফ্রিগেট। নিহত হন হামিদু ও তাঁর ত্রিশ সঙ্গী, বন্দী হয় ৪০৬ জন অফিসার ও নাবিক। ডেকাটরের ক্ষতি ছিল দশজন নিহত ও ত্রিশজন আহত।

দুই দিন পর কেপ পালোসের যুদ্ধেও শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয় আলজিয়ার্সের নৌবহর। ডেকাটরের সামনে এরপর পড়ল ২২ কামানের জাহাজ এস্টেডিও। ছোট্ট এই রণতরী শত্রুদের কাছে অসহায় অনুধাবন করে এস্টেডিওর ক্যাপ্টেন স্পেনের দিকে পিছু হটেন। তীরের দিকে অগভীর পানিতে সরে যান তিনি, যাতে ডেকাটরের বৃহৎ যুদ্ধজাহাজ তাকে ধরতে না পারে।

আমেরিকান কমোডোর তার হাতে থাকা তিনটে ছোট ফ্রিগেট পাঠালেন এস্টেডিওর দিকে- ইউএসএস এপের্ভিয়ের, স্পার্ক, স্পিটফায়ার আর টর্চ। প্রায় আধঘন্টা যুদ্ধে আর ২৩ জন নাবিক নিহত হওয়ার পর আত্মসমর্পণ করে এস্টেডিও। ৮০ জনকে বন্দী করে মার্কিন নৌ-সেনারা। ডেকাটরের ক্ষয়ক্ষতি ছিল শূন্য।

শান্তি আলোচনা

২৯ জুন ডেকাটর যখন আলজিয়ার্সের অদূরে পৌঁছলেন ততদিনে সেখানে ঘটে গেছে পটপরিবর্তন। হাজি আলি মারা গেছেন। মাত্র ষোল দিনের মাথায় গুপ্তহত্যার শিকার হয়েছেন তাঁর উত্তরসূরি । ঘোলাটে পরিস্থিতিতে ক্ষমতা নিয়েছেন ওমর আগা (Omar ben Mohammed)।

ওমর জানতেন ব্রিটিশ আর আমেরিকানদের মধ্যে চুক্তি হয়ে গেছে, এখন যুক্তরাজ্য থেকে কোনো সাহায্য পাওয়া যাবে না। তাঁর নিজের নৌবাহিনী এককভাবে সামাল দিতে পারবে না শত্রুদের। সুতরাং ডেকাটরের আলোচনার প্রস্তাব গ্রহণ করে নেন তিনি। ওমরের সাথে কথাবার্তা চালান ডেকাটর ও উইলিয়াম শেলার (William Shaler)।

মার্কিনিদের শর্ত ছিল যথেষ্ট শক্ত, তবে ওমরের হাতে আর কোনো তাস ছিল না। ফলে তেসরা জুলাই চুক্তি স্বাক্ষর করে দেন তিনি। কারাগারে থাকা সমস্ত মার্কিন যুদ্ধবন্দীকে মুক্তি দেন ওমর, বাধ্য হন ১০,০০০ ইউএস ডলারের সমপরিমাণ ক্ষতিপূরণ দিতে। মেনে নেন ভূমধ্যসাগরে চলাচলের জন্য আমেরিকার বাণিজ্য জাহাজকে কোনো কর দিতে হবে না, এবং যুক্তরাষ্ট্র ভবিষ্যতে এজন্য কোনো চাঁদা দেবে না। বিনিময়ে ডেকাটর মেশুদা আর এস্টেডিও ফিরিয়ে দেন, ছেড়ে দেন তাঁর হাতে বন্দী ৫০০ আলজেরিয়ান নাবিককে। টিকে যায় ওমরের ক্ষমতাও। উইলিয়াম শেলার থেকে যান সেখানে মার্কিন কমিশনার হিসেবে।

আলজিয়ার্সকে দমন করে তিউনিস আর ত্রিপোলির দিকেও অভিযান চালান ডেকাটর। দুই জায়গা থেকেই অনুরূপ চুক্তি আদায় করেন তিনি। ত্রিপোলির শাসক কারামানলির থেকে ইউরোপিয়ান সমস্ত বন্দীকেও মুক্ত করেন আমেরিকান কমোডোর।

ডিসেম্বর মাসে মার্কিন সিনেট সমস্ত চুক্তির আনুষ্ঠানিক অনুমোদন দিলে কাগজে-কলমে সমাপ্ত হয় দ্বিতীয় বার্বার লড়াই। তবে ওমর আগা কিছু কারণে চুক্তি মানতে অস্বীকৃতি জানান। আলজিয়ার্সে বিদেশি স্থাপনা আর সম্পত্তির ওপর আঘাত করেন তিনি। ফলশ্রুতিতে হাজির হয় ব্রিটিশ জাহাজ। অ্যাডমিরাল এডওয়ার্ড (Edward Pellew) কয়েকদিন ধরে অবিশ্রান্ত গোলাবর্ষণ চলিয়ে যান। শেলার তখন ব্রিটিশ জাহাজে আশ্রয় নিয়েছিলেন।

ওমর অবশেষে হার মেনে নেন। নতুন করে চুক্তি করেন শেলার, সেটা আবার সিনেটে পাস হয় ১৮২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে। এরপর নতুন এক শক্তির পদধ্বনি শোনা যায় ভূমধ্যসাগরে।

References
This post was viewed: 67

আরো পড়ুন