Skip to main content

Ridge Bangla

প্রাচীন মিশরে জাদুবিদ্যা: দৈনন্দিন জীবনে এর প্রভাব

প্রাচীন মিশরীয়দের জীবনে জাদুবিদ্যা ছিল এক অবিচ্ছেদ্য উপাদান। ধর্ম, চিকিৎসা, ও দৈনন্দিন কার্যকলাপের প্রতিটি স্তরে এর গভীর প্রভাব ছিল। ঘরের কোণে ঝুলে থাকা ছোট্ট তাবিজ থেকে শুরু করে আয়োজিত জটিল ধর্মীয় আচার, সবখানেই ছিল জাদুবিদ্যার উপস্থিতি। মিশরীয়রা বিশ্বাস করত, অদৃশ্য অশুভ শক্তি চারদিকে ঘুরে বেড়াচ্ছে, এবং সেগুলো মোকাবিলা করতে পারে জাদুবিদ্যার শক্তি হেকা।

হেকা: সৃষ্টি আর সুরক্ষার শক্তি

মিশরীয় ভাষায় ‘হেকা’ শব্দটি জাদু বোঝাতে ব্যবহৃত হতো। এটি ছিল সৃষ্টির আদি শক্তিগুলোর একটি। হেকা শুধু এক ধরনের শক্তিই নয়, ছিল একজন দেবতাও। হেকাকে প্রাচীন মিশরের দেবতাদের তালিকায় অনেকসময়ই উপেক্ষা করা হয়। কারণ, তাঁর উপস্থিতি সর্বব্যাপী ছিল বলে তিনি আলাদা করে নজরে পড়তেন না।

জাদু চর্চার পুরোহিতরা

অশুভ শক্তিকে আয়ত্তে আনার জন্য প্রাচীন মিশরে প্রায় সকলেই কোনো না কোনোভাবে জাদুবিদ্যা চর্চা করত। তবে এর প্রাতিষ্ঠানিক রূপ ছিল ধর্মীয় পুরোহিতদের হাতে। এর মধ্যে ‘লেক্টর পুরোহিত’ ছিলেন সবচেয়ে অভিজ্ঞ। রাজদরবারের ধর্মীয় আচার কিংবা কোনো ব্যক্তিগত অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া, উভয় ক্ষেত্রেই মন্ত্র পাঠ করে আত্মা ও বিশ্বচেতনার ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করতেন তারা। ‘লেক্টর’ শব্দের অর্থই ছিল ‘আচারবিধির গ্রন্থবাহক’। প্রধান লেক্টর পুরোহিতের কাজ ছিল মন্দিরের সব ধর্মীয় ও জাদুবিদ্যার পাঠ্যসংগ্রহ রক্ষা ও পরিচালনা করা। হেকা জাদুবিদ্যার প্রধান দেবতা হলেও, পরবর্তী যুগে এই বিদ্যার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত হয়ে ওঠেন জ্ঞানের দেবতা থট। চন্দ্রশক্তির সূত্রে থটের সঙ্গে জ্যোতির্বিদ্যা ও জ্যোতিষচর্চাও যুক্ত হয়। এ দুটিই প্রাচীন সময়ের জাদুবিদ্যার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত ছিল।

মিশরীয় সমাজে চিকিৎসকরা শুধু শারীরিক উপসর্গ নয়, বরং আত্মিক ও অতিপ্রাকৃত কারণকেও গুরুত্ব দিয়ে দেখতেন। রোগ-ব্যাধি অনেকসময়ই তাদের কাছে অশুভ আত্মার ফল বলে বিবেচিত হতো, আর তার প্রতিকার ছিল জাদুবিদ্যা।

সাধারণ মানুষও প্রতিদিনের জীবনে জাদু ব্যবহার করত। কেউ গলায় তাবিজ ঝুলিয়ে শয়তানি শক্তির হাত থেকে বাঁচতে চাইত, কেউ উষালগ্নে করত মন্ত্র পাঠ। কারণ, প্রাচীন মিশরীয়রা বিশ্বাস করত দিনের শুরুতে জাদু সবচেয়ে কার্যকর থাকে। তবে এই সব অনুশীলনের আগে একজন জাদু-চর্চাকারীকে মানতে হতো ‘শুদ্ধতার’ শর্ত। যেমন, যৌনসংগম থেকে বিরত থাকা, ঋতুমতী নারীদের কাছাকাছি না যাওয়া, স্নান করে পরিচ্ছন্ন পোশাক পরা ইত্যাদি। কারণ, জাদুর কার্যকারিতা নির্ভর করত শরীর ও আত্মার শুদ্ধতার ওপর।

মাতৃত্ব, প্রসব ও জাদুবিদ্যা

খ্রিষ্টপূর্ব ১৫৫০ সালের ইবের্স প্যাপিরাসে ধাত্রীদের অস্তিত্বের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। ধনী পরিবারে নিযুক্ত সেবিকা থাকতেন, আর দরিদ্র পরিবারের জন্য প্রসবকালে সহায়তা করতেন আত্মীয় বা পরিচিতজনেরা।

প্রসবের সময়ে ব্যবহৃত ইটের তৈরি চৌকি বা চেয়ারগুলিতে বিভিন্ন দেবীর চিত্র খোদাই করা থাকত। এসময় ডাকা হতো বিভিন্ন দেবদেবী যেমন, হাথোর, বেস, তাওয়েরেত, থোথকে। প্রসবকক্ষে সাজানো থাকত বিভিন্ন দেবতার প্রতিকৃতি, কখনো আবার জাদুমন্ত্র খোদাই করা হাতির দাঁতের কাঠি মায়ের পেটে রাখা হতো সুরক্ষার জন্য। বেসের প্রতিচ্ছবি যুক্ত তাবিজ দেওয়া হতো নারীর গর্ভধারণের জন্য, মাতৃত্বকালে এবং শিশুদের সুরক্ষায়। এমনকি নারীদের শরীরে বেস দেবতার ট্যাটুরও প্রমাণ পাওয়া গেছে।

স্বপ্নব্যাখ্যায় ‘নারী’

যেসকল নারী স্বপ্নের ব্যাখ্যা দিতেন, তাদের বলা হতো বিদুষী রমণী। দেবতা ও মৃতেরা স্বপ্নের মাধ্যমে প্রতীকী ও ধাঁধার রূপে বার্তা দিতেন। এই ভাষা বোঝার জন্য প্রয়োজন হতো দক্ষ ব্যাখ্যাকারীর, যা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই হতেন নারী। হাথোর দেবীর উপাসনাকেন্দ্র দেন্ডেরার মন্দির ছিল স্বপ্নব্যাখ্যার কেন্দ্রস্থল, যেখানে মূলত নারীরাই ধর্মীয় দায়িত্ব পালন করতেন।

তাবিজ ও প্রতীক: প্রতিরক্ষার বাহক

প্রাচীন মিশরে তাবিজ ছিল দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এগুলোর মূল উদ্দেশ্য ছিল অপশক্তি বা অশুভ ভাগ্য থেকে রক্ষা প্রদান করা। তাবিজকে শক্তিশালী করে তুলত তার গঠন, খোদাই, উপাদান কিংবা উচ্চারিত মন্ত্র। সাধারণত ব্যবহৃত তাবিজগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল আঁখ, হোরাসের চক্ষু, এবং স্কারাব বিটল। কোনো কোনো তাবিজ ছিল কাগজে লেখা ছোট মন্ত্র, যা গুটিয়ে পকেটে বা গলায় ঝুলিয়ে রাখা হতো।

দৈনন্দিন জীবনের জাদুময় বস্তু

আয়না, শিরোপা ইত্যাদিতে দেবতা ও ধর্মীয় প্রতীক খোদাই করা থাকত। স্তম্ভ বা মূর্তিগুলোও বহন করত জাদুবল। যেমন, বিষাক্ত দংশনের চিকিৎসার জন্য হোরাসের সিপ্পাসে তেরোটি মন্ত্র খোদাই করা ছিল। হোরাস, থোথ ও বেস, তিনজনই উপস্থিত থাকতেন এই খোদাইচিত্রে। ফলে নিরক্ষর ব্যক্তিও বুঝতে পারত যে এটি রক্ষাকারী বস্তু।

জাদু ও চিকিৎসাশাস্ত্র

প্রাচীন মিশরে রোগব্যাধির উৎস হিসেবে যেমন অতিপ্রাকৃত শক্তিকে ধরা হতো, তেমনি তার প্রতিকারও খুঁজে নেওয়া হতো জাদুমন্ত্র, দেবতার আশীর্বাদ ও গোপন শক্তির মধ্য দিয়ে। রোগের পেছনে থাকা অতিপ্রাকৃত সত্তার নাম উচ্চারণ করতে পারা মানে ছিল সেই সত্তার ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা।

প্রাচীন মিশরীয় চিকিৎসাবিদ্যায় পশুর বিষ্ঠা, মধুসহ নানা উপকরণ ব্যবহার হতো। অনেক ক্ষেত্রে বিষ্ঠার গন্ধ দিয়ে দানবকে শরীর থেকে বের করে আনার চেষ্টা চলত। আবার কখনো মধুর মতো মিষ্টি কিছু দিয়ে তাকে প্রলুব্ধ করে শরীর ত্যাগ করানো হতো। দেবতার ছবি এঁকে রোগীকে দিয়ে তা চাটানো হতো হতো। কারণ, তাদের বিশ্বাস ছিল, দেবতার প্রতিচ্ছবি তার শরীরে প্রবেশ করে নিরাময় ঘটাবে। ভেষজ বা শল্যচিকিৎসার পাশাপাশি উচ্চারিত হতো প্রার্থনা, মন্ত্র ও জাদুবাক্য। দেবতাদের সাহায্য চেয়ে এসব মন্ত্র পাঠ করতেন চিকিৎসক ও পুরোহিতরা। জটিল রোগব্যাধির ক্ষেত্রে মন্দিরে দেবতাদের উদ্দেশে পূজা আয়োজন করা হতো।

মৃত্যুর পরে জাদুর প্রভাব

মৃত্যুর সঙ্গে যুক্ত মিশরীয় জাদুবিদ্যার প্রভাব ছিল অসামান্য। ১৯২টি মন্ত্রলিখিত ‘বুক অভ দ্য ডেড’ মূলত মৃত ব্যক্তিকে পরলোকের পথে সুরক্ষিতভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য ব্যবহৃত হতো।

এই গ্রন্থ ছাড়াও, মমির গায়ে মোড়ানো কাপড়ে লেখা মন্ত্র, রক্ষাকবচ বা দেবতার চিহ্নবিশিষ্ট তাবিজ পাওয়া যায় প্রায় প্রতিটি সমাধিতে। মিশরীয় আত্মা-ধারণায় নয়টি উপাদানের কথা বলা হয় বিভিন্ন সময়। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল ‘কা’ এবং ‘বা’। ‘কা’ ছিল জীবনশক্তি, যা মৃতের দেহ ত্যাগ করে চলেছিল অন্য জগতে। জীবিতদের তরফ থেকে খাবারদাবারের উৎসর্গই ছিল এই ‘কা’র খাদ্য। আর ‘বা’ ছিল ব্যক্তিত্বের প্রতীক। অর্থাৎ, একজন মানুষের সবটুকু স্বাতন্ত্র্য।

এই ‘কা’ ও ‘বা’ একত্র হয়ে গড়ে তোলে ‘আখ’, যে ছিল এক ধরনের অতিপ্রাকৃত অস্তিত্ব, মৃত ব্যক্তির পূর্ণ রূপ। ‘আখ’-কে ডাকা যেত, চাওয়া যেত সহায়তা, সে দিতে পারত আশীর্বাদ, আবার দিতে পারত দুর্ভাগ্যও। তাই, মৃত্যুর পরেও একজন মানুষের জাদুসম্পৃক্ত অস্তিত্ব সমাজে প্রভাব রাখত।

প্রাচীন মিশরীয় সমাজে জাদুবিদ্যা কল্পনা বা কুসংস্কার ছিল না। বরং এটি ছিল বাস্তবতার ব্যাখ্যা, দুঃসময়কে মোকাবিলা করার একটি সরল ও বোধগম্য উপায়। দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি স্তরে জাদু ছিল এক চেনা সহচর।

তথ্যসূত্র
  1. Magic in Ancient Egypt – World History Encyclopedia
  2. Ancient History in depth: Ancient Egyptian Magic – BBC
  3. Magic in the Ancient World: Egyptian Deities and Uses – TheCollector
  4. Heka | Magic, Rituals & Spells – Britannica
This post was viewed: 43

আরো পড়ুন