সম্প্রতি ইসরায়েল ইরানের সামরিক ও পরমাণু স্থাপনায় বড় ধরনের হামলা চালিয়েছে। এই হামলার পেছনে ছিল এক দীর্ঘদিনের গোপন প্রস্তুতি ও কৌশলগত পরিকল্পনা। যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম সিএনএনের এক অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, কীভাবে ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ ইরানের ভেতরে একটি বিস্তৃত ছায়াযুদ্ধ পরিচালনা করে আসছে।
প্রতিবেদনটি বলছে, ইরানের অভ্যন্তরে অস্ত্র পাচার, গোপন ঘাঁটি নির্মাণ এবং স্থানীয় নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার মাধ্যমে মোসাদ সরাসরি ইরানের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় আঘাত হানতে সক্ষম হয়েছে। গোপন পথে আনা অস্ত্র ব্যবহার করে তারা ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে আঘাত হানে। এমনকি বিস্ফোরকবাহী ড্রোন নিয়ন্ত্রণের জন্য ভেতরে ঘাঁটিও তৈরি করা হয়।
এই হামলায় ইসরায়েল দাবি করেছে, তারা একযোগে ২০০টিরও বেশি যুদ্ধবিমান ব্যবহার করে ১০০টির বেশি টার্গেটে হামলা চালিয়েছে, এবং প্রথমধাপের সব বিমান নিরাপদে ফিরে এসেছে। মোসাদ শুধু নজরদারিতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং তেহরানসহ বিভিন্ন এলাকায় গোপনভাবে কমান্ডো মোতায়েন করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
এদের কাজ ছিল স্থানীয়ভাবে তথ্য সংগ্রহ, অবস্থান নির্ণয় এবং হামলার প্রস্তুতি নেওয়া। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অভিযানের পেছনে বহু বছরের গোয়েন্দা কার্যক্রম ও পরিকল্পনার প্রতিফলন রয়েছে। ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, কীভাবে তারা ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র লঞ্চার ধ্বংস করে এবং কীভাবে মুখোশধারী এজেন্টরা মাঠে রকেট লঞ্চার বসাচ্ছেন। এতে ইরানের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় মোসাদের প্রভাব গভীরভাবে প্রতিফলিত হয়।
ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউটের বিশ্লেষক হলি ড্যাগ্রেস মন্তব্য করেছেন, “ইরান বহু বছর ধরেই মোসাদের কার্যক্রমের কেন্দ্রস্থল হয়ে উঠেছে।” তার মতে, বিজ্ঞানীদের হত্যা, বিস্ফোরণ কিংবা গুপ্তঘাঁটি সবই ইসরায়েলি কৌশলের অংশ।
‘অপারেশন রাইজিং লায়ন’ নামে পরিচিত এই অভিযান শুরু হয় ১৪ জুন ভোরে। হামলার সময় ইরানের আকাশ রঙিন হয়ে ওঠে বিস্ফোরণের আলোয়। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি সম্ভবত ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধের পর ইরানের ওপর সবচেয়ে বড় সামরিক আঘাত। এই হামলার প্রধান লক্ষ্য ছিল ইরানের পরমাণু গবেষণা কেন্দ্র, দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র কারখানা এবং শীর্ষ সামরিক ও বৈজ্ঞানিক ব্যক্তিত্বরা।
ব্রিটিশ গবেষণা সংস্থা BICOM-এর তথ্য অনুযায়ী, মোসাদ অত্যন্ত নিখুঁতভাবে ভেতর থেকেই ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নিস্ক্রিয় করতে সক্ষম হয়। দ্য টেলিগ্রাফ জানায়, ইরানের অভ্যন্তরে বসানো ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন লঞ্চারগুলো সরাসরি মোসাদের এজেন্টদের মাধ্যমে সক্রিয় করা হয়েছিল।
ভিডিওতে দেখা যায়, সশস্ত্র ব্যক্তিরা হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছেন এবং কিছু ক্ষেত্রে গাড়ি থেকে নিয়ন্ত্রিত অস্ত্রও ব্যবহৃত হয়েছে। মিলিটারি বিশ্লেষক ম্যাথু সাভিলের মতে, এই গোয়েন্দা তৎপরতা ইঙ্গিত দেয় যে মোসাদ ইরানের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় গভীরভাবে প্রবেশ করতে সক্ষম হয়েছে। বহুবার গোপন মিশনের মাধ্যমে তারা প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করেছে এবং অত্যন্ত নির্ভুলভাবে হামলা চালিয়েছে। এই অভিযানে অন্তত তিনজন উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে, যা ইরানের প্রতিরক্ষা পরিকল্পনায় বড় ধাক্কা দিতে পারে। গোয়েন্দা সূত্রগুলো বলছে, শুধু পরমাণু কর্মসূচি নয়, ইরানের সামরিক জবাবদিহিতার সক্ষমতাও দুর্বল করে দেওয়াই ছিল এই হামলার অন্যতম লক্ষ্য।
২০২৪ সালে পাল্টাপাল্টি হামলার পর এই ছায়াযুদ্ধ আরও তীব্র হয়েছে। ইরানের ভেতরে মোসাদের ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র ও রিমোট-কন্ট্রোলড অস্ত্র ব্যবহারের ঘটনা আগের চেয়ে আরও বেশি। এমনকি গাড়ির ভেতর থেকে পরিচালিত অস্ত্র দিয়ে শীর্ষ সেনা কর্মকর্তাদেরও টার্গেট করা হয়েছে।
২০১০ সাল থেকে ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থাটির বিরুদ্ধে একাধিক ইরানি বিজ্ঞানী হত্যার অভিযোগ রয়েছে। এদের মধ্যে অনেকেই রিমোট বোমা বা স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের আঘাতে নিহত হন। ২০১৮ সালে একটি গোপন অভিযান চালিয়ে ইসরায়েল তেহরান থেকে ইরানের পরমাণু আর্কাইভের নথি চুরি করে বলে দাবি করে। পরে নেতানিয়াহু এই নথি প্রকাশ্যে আনেন।
২০২০ সালের নভেম্বরে ইরানের শীর্ষ পরমাণু বিজ্ঞানী মোহসেন ফাখরিজাদেহকে হত্যাও এই ধাঁচের একটি অপারেশন ছিল বলে মনে করা হয়। ইসরায়েল এর দায় স্বীকার না করলেও ঘটনাপ্রবাহ এবং নিখুঁত পরিকল্পনা অনেক কিছু স্পষ্ট করে।
সাবেক মোসাদ কর্মকর্তা রাম বেন বারাক বলেন, ইরানে সরকারবিরোধী জনমত ও অসন্তোষের সুযোগ নিয়ে মোসাদ সেখানে গুপ্তচর নিয়োগ সহজ করেছে। এতে গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক আরও শক্তিশালী হয়েছে।
সর্বশেষে গাজা যুদ্ধের পর, ইসরায়েলি বাহিনী হামাস নেতা ইসমাইল হানিয়াকে তেহরানের একটি গেস্ট হাউজে বিস্ফোরণের মাধ্যমে হত্যা করে বলে প্রতিবেদন উঠে এসেছে। দাবি করা হয়, বোমাটি আগে থেকেই স্থাপন করা ছিল এবং রিমোট কন্ট্রোলে বিস্ফোরণ ঘটানো হয়।
সিএনএন-এর ভাষ্যমতে, ইরানের ভেতরে মোসাদের এই কার্যক্রম এখন এতটাই বিস্তৃত এবং গভীর যে সেটিকে আর সহজে প্রতিহত করা সম্ভব নয়। শুধু প্রযুক্তিগত নয়, মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব ও কৌশলগত সাফল্যেও ইরানকে চাপে ফেলেছে মোসাদ- এমনটাই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।