Skip to main content

Ridge Bangla

হিজবুল্লাহ: একটি রাজনৈতিক শক্তি, একটি সামরিক সংগঠন, একটি মতাদর্শ

লেবাননের শিয়া মুসলমানদের মধ্যে গড়ে ওঠা হিজবুল্লাহ মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি ও সংঘাত পটভূমিতে এক বলিষ্ঠ এবং বিতর্কিত নাম। আরবি ভাষায় ‘হিজবুল্লাহ’ অর্থ ‘আল্লাহর দল’। ১৯৮২ সালে লেবাননের গৃহযুদ্ধ ও ইসরায়েলের দক্ষিণ লেবানন দখলের প্রেক্ষাপটে শিয়া মিলিশিয়াদের সমন্বয়ে গঠিত হয় এই সংগঠন। ১৯৮৫ সালে তারা নিজেদের আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করে এবং সেই সময় থেকেই ইসরায়েল বিরোধিতাকে তাদের প্রধান লক্ষ্য বলে ঘোষণা করে। হিজবুল্লাহর সূচনালগ্ন থেকেই সংগঠনটির ঘনিষ্ঠ মিত্র ইরান। অর্থ, অস্ত্র প্রশিক্ষণ, সবকিছুতেই তেহরানের সহায়তা তাদের উত্থান ও বিস্তারকে ত্বরান্বিত করেছে। সংগঠনটি শুরু থেকেই লেবাননে ইসলামি শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার কথা বললেও, ২০০৯ সালের নতুন রাজনৈতিক ঘোষণাপত্রে তারা সে দাবি থেকে সরে এসে ইসরায়েল রাষ্ট্রের অস্তিত্ব মেনে নেওয়ার সকল সম্ভাবনাকে সরাসরি নাকচ করে দেয়।

যুদ্ধ ও প্রতিরোধের রাজনীতি

২০০০ সালে ইসরায়েল দক্ষিণ লেবানন থেকে তাদের দীর্ঘ ১৮ বছরের দখল শেষ করে সেনা প্রত্যাহার করলে, হিজবুল্লাহ একে ‘বিজয়’ হিসেবে চিহ্নিত করে। লেবাননে দিনটি “প্রতিরোধ ও মুক্তি দিবস” হিসেবে পালন করা হয়। এরপরেও, তারা অস্ত্র সংবরণ করেনি। বরং দক্ষিণ লেবাননে শক্তিশালী সামরিক অবকাঠামো গড়ে তোলে এবং নিজেদের অস্ত্রভাণ্ডার বাড়াতে থাকে। ২০০৬ সালের জুলাই মাসে হিজবুল্লাহর এক আকস্মিক আক্রমণে ইসরায়েলের দুই সেনা নিহত ও দু’জন অপহৃত হলে ইসরায়েল পাল্টা সামরিক অভিযান চালায়। টানা ৩৪ দিনের যুদ্ধে ১,১২৫ জন লেবানিজ নাগরিক নিহত হন, যাদের অধিকাংশই বেসামরিক। অপরদিকে, ইসরায়েলে মারা যান ১১৯ জন সেনা ও ৪৫ জন বেসামরিক নাগরিক।

সিরিয়ায় হস্তক্ষেপ ও আঞ্চলিক বিস্তার

২০১৩ সাল থেকে হিজবুল্লাহ সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশ নেয়। বাশার আল-আসাদের পক্ষে যুদ্ধ করে তারা বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এর ফলে তাদের যোদ্ধারা আরও অভিজ্ঞ হয়ে ওঠে এবং সংগঠনটি সামরিক দিক থেকে আরও শক্তিশালী হয়। এই সময়ের মধ্যে, হিজবুল্লাহ আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও নানা হামলার অভিযোগের মুখোমুখি হয়। বিশেষ করে, ইসরায়েলি ও ইহুদি স্বার্থের বিরুদ্ধে বিদেশে বোমা হামলা ও ষড়যন্ত্রে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে।

২০২৩-২৪ সালের সংঘাত

২০২৩ সালের অক্টোবর মাসে গাজা যুদ্ধ শুরু হলে হিজবুল্লাহ ফ্রন্টিয়ার পার হয়ে ইসরায়েলের দিকে রকেট নিক্ষেপ শুরু করে। তারা জানায়, এটি হামাসের সঙ্গে সংহতি প্রকাশের অংশ। ইসরায়েলও পাল্টা বিমান হামলা শুরু করে। পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে। ইসরায়েল জানায়, হিজবুল্লাহর হামলায় বাস্তুচ্যুত হাজার হাজার মানুষ এখন নিরাপদে নিজ ঘরে ফিরতে পারে। এরপরই ইসরায়েল দক্ষিণ লেবাননে ব্যাপক বিমান হামলা চালায় এবং একপর্যায়ে স্থল অভিযানেও নামে। এই সংঘাতে লেবাননে প্রায় ৪,০০০ মানুষ নিহত হয়, যাদের মধ্যে অধিকাংশই ছিল বেসামরিক নাগরিক। অক্টোবর ২০২৩ থেকে শুরু করে নভেম্বরে যুদ্ধবিরতির আগে পর্যন্ত প্রায় ১০ লাখ মানুষ লেবাননে বাস্তুচ্যুত হন। ইসরায়েলি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এ সময় তাদের ৪৫ জন বেসামরিক নাগরিক এবং ৭৫ জন সেনা নিহত হয়েছেন।

নেতৃত্বহীন হিজবুল্লাহ?

ইসরায়েলি বিমান হামলায় হিজবুল্লাহর বহু শীর্ষ নেতা নিহত হন। ১৯৯২ সাল থেকে সংগঠনের নেতৃত্বে থাকা দীর্ঘদিনের মহাসচিব হাসান নাসরুল্লাহ ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে নিহত হন। তার মৃত্যুর পর, সংগঠনের ডেপুটি সেক্রেটারি জেনারেল নাঈম কাসেমকে নতুন নেতা ঘোষণা করা হয়। অন্য এক সম্ভাব্য উত্তরসূরি, শীর্ষ ধর্মীয় নেতা হাসেম সাফিয়েদ্দিনও ইসরায়েলি হামলায় নিহত হন।

হিজবুল্লাহর সামরিক শক্তি

হিজবুল্লাহর বর্তমান সামরিক সক্ষমতা নিরূপণ করা কঠিন। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া সংঘাতে সংগঠনটি ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়ে। নভেম্বরে যুদ্ধবিরতির আগে, তাদের বহু সামরিক স্থাপনা ধ্বংস হয়ে যায়, অস্ত্রভাণ্ডার উল্লেখযোগ্যভাবে নিঃশেষিত হয়, এবং শত শত যোদ্ধা নিহত হয়। পাশাপাশি, সিরিয়ায় বাশার আল-আসাদের পতন হিজবুল্লাহর জন্য একটি কৌশলগত ধাক্কা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। আসাদের শাসনকালেই ইরানের সঙ্গে হিজবুল্লাহর সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হয়, এবং সিরিয়া হয়ে ওঠে অস্ত্র ও রসদের প্রধান সরবরাহ পথ।

একসময় হিজবুল্লাহকে বিশ্বের সবচেয়ে সুসজ্জিত ও শক্তিশালী অ-রাষ্ট্রীয় সামরিক সংগঠনগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করা হতো। ২০২১ সালে সংগঠনটি দাবি করে, তাদের সদস্যসংখ্যা এক লাখ ছাড়িয়েছে। যদিও বিশ্লেষকদের মতে প্রকৃত সংখ্যা ২০,০০০ থেকে ৫০,০০০-এর মধ্যে।

যুদ্ধ শুরুর আগে পর্যন্ত হিজবুল্লাহর কাছে প্রায় ১,২০,০০০ থেকে ২,০০,০০০ ক্ষেপণাস্ত্র ও রকেট ছিল বলে অনুমান করে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠান Center for Strategic and International Studies (CSIS)। এই বিপুল অস্ত্রভাণ্ডারের বড় অংশজুড়ে ছিল সাটার ফেস-টু-সারফেস রকেট। পাশাপাশি, সংগঠনটির কাছে ছিল বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, জাহাজ বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র।

লেবাননের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হিজবুল্লাহর অবস্থান

ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধ শুধু হিজবুল্লাহর সামরিক শক্তিকেই নয়, রাজনৈতিক অবস্থানকেও চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে লেবানন দুই বছরের বেশি সময় পর নতুন রাষ্ট্রপতি জোসেফ আউনকে পেয়েছে। লেবাননের সেনাবাহিনীর সাবেক প্রধান এই ব্যক্তিকে হিজবুল্লাহ কখনো সমর্থন করেনি। দায়িত্ব নেওয়ার পর আউন হিজবুল্লাহর অস্ত্রধারণের বিরুদ্ধে সরাসরি ইঙ্গিত দেয়।

পরবর্তী সময়ে গঠিত নতুন মন্ত্রিসভাও হিজবুল্লাহকে বাইরে রেখেই গঠিত হয়। প্রধানমন্ত্রী নওয়াফ সালাম এই মন্ত্রিসভায় ধর্মীয় ভারসাম্য বজায় রাখলেও এতে হিজবুল্লাহর সরাসরি অংশগ্রহণ নেই। তবে তাদের মিত্র ‘আমাল আন্দোলন’ চারটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছে।

লেবাননের রাজনৈতিক দৃশ্যপটে হিজবুল্লাহর প্রভাব কমে আসলেও একে একেবারে উপেক্ষা করা যায় না। ২০০৫ সাল থেকে তারা প্রতিটি মন্ত্রিসভায় কোনো না কোনোভাবে প্রতিনিধিত্ব করে এসেছে এবং তাদের সমাজসেবামূলক কার্যক্রম (শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে) দলের প্রতি এক শ্রেণির জনগণের আস্থা বাড়িয়েছে। হিজবুল্লাহর সমর্থকরা মূলত হিজবুল্লাহকে একটি প্রতিরোধ শক্তি হিসেবে দেখে, যারা ইসরায়েলের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করে এসেছে।

তথ্যসূত্র
  1. What Is Hezbollah?
  2. What is Hezbollah? What to know about its origins …
  3. What is Hezbollah and why has it been fighting Israel in …
  4. What is Hezbollah, and how will it influence the Israel …
  5. Does Hezbollah represent Lebanon? And what impact will …
This post was viewed: 39

আরো পড়ুন