নিউইয়র্কের এক জঙ্গলে ছোট্ট একটি জলপ্রপাতের কাছে পৌঁছালে প্রথমে অস্বাভাবিক কিছু আপনি দেখবেন না। পাথরের ধাপ বেয়ে পানি নেমে আসছে, চারপাশে গাছপালা, ভেজা শিলার গায়ে শ্যাওলা- সবই যেন স্বাভাবিক। কিন্তু আরেকটু কাছে গেলেই দৃশ্যটা বদলে যাবে। জলপ্রপাতের ধারার ঠিক পেছনে পাথরের ছোট্ট একটি খাঁজ থেকে জ্বলতে দেখা যায় আগুন! পানি পড়ছে কয়েক হাত দূরেই, কখনো আগুনের সামনেও। অথচ পাথরের গর্তের ভেতর ছোট শিখাটি জ্বলছে নিজের মতো করে!
যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের এই জায়গার নাম ‘ইটারনাল ফ্লেম ফলস’। নাম শুনে মনে হতে পারে, কোনো অলৌকিক আগুন বুঝি অনন্তকাল ধরে জ্বলছে। বাস্তবে ব্যাপারটি আরও আকর্ষণীয়। আগুনটি অলৌকিক নয়, আবার পুরোপুরি ‘ইটারনাল’ও নয়। এর পেছনে রয়েছে ভূগর্ভ থেকে বেরিয়ে আসা প্রাকৃতিক গ্যাস এবং এমন এক ভূতাত্ত্বিক সিস্টেম, যার কিছু দিক বিজ্ঞানীদেরও বিশেষ আগ্রহের বিষয় হয়ে উঠেছে।
জলপ্রপাতের ভেতরে আগুন এলো কোথা থেকে?
ইটারনাল ফ্লেম ফলস নিউইয়র্কের এরি কাউন্টির চেস্টনাট রিজ পার্কে অবস্থিত। পার্কটির দক্ষিণ-পশ্চিম দিকের অপেক্ষাকৃত নির্জন অংশ ‘শেল ক্রিক প্রিজার্ভ’ নামে পরিচিত। সেখানেই প্রায় ৩০ ফুট উঁচু ছোট এই জলপ্রপাত।
জলপ্রপাতটির সবচেয়ে অদ্ভুত অংশ রয়েছে নিচের দিকে। শেল পাথরের একটি ছোট গুহার মতো খাঁজের ভেতর দিয়ে প্রাকৃতিক গ্যাস বেরিয়ে আসে। সেই গ্যাসে আগুন ধরালে কয়েক ইঞ্চি উঁচু শিখা তৈরি হয়। পাথরের খাঁজটি এমনভাবে তৈরি যে চারপাশের দেয়াল আগুনকে সরাসরি বাতাস ও পানির আঘাত থেকে কিছুটা রক্ষা করে। ফলে জলপ্রপাত বয়ে চললেও শিখাটি টিকে থাকতে পারে।
কাছাকাছি গেলে আরেকটি ব্যাপার টের পাওয়া যায়। বাতাসে কখনো পচা ডিমের মতো গন্ধ পাওয়া যায়। এর কারণ ওই এলাকার প্রাকৃতিক গ্যাসের সঙ্গে থাকা সালফারযুক্ত যৌগ। আশপাশেও ছোট ছোট জায়গা দিয়ে গ্যাস বের হয়। কোথাও পানির নিচ থেকে বুদ্বুদের আকারেও সেই গ্যাস উপরে উঠতে দেখা যায়।
আগুনের চেয়ে বেশি অদ্ভুত এর গ্যাস
২০১৩ সালে ইটারনাল ফ্লেম ফলস নিয়ে বিস্তারিত গবেষণা প্রকাশ করেন জিউসেপ্পে এতিওপে, আগনিয়েশকা দ্রবনিয়াক ও আর্ন্ট শিমেলমান। গবেষণাটি প্রকাশিত হয় মেরিন অ্যান্ড পেট্রোলিয়াম জিওলজি জার্নালে। বিজ্ঞানীরা আগুনের নিচের গ্যাস এবং আশপাশের ছোট ছোট প্রাকৃতিক গ্যাস নিঃসরণের নমুনা পরীক্ষা করেন।
তাদের বিশ্লেষণে দেখা যায়, এটি মানুষের বসানো কোনো গ্যাসলাইন বা কৃত্রিম উৎসের আগুন না। গ্যাসটি মূলত ভূগর্ভে তৈরি হওয়া থার্মোজেনিক ন্যাচারাল গ্যাস, অর্থাৎ দীর্ঘ সময় ধরে মাটির নিচে চাপ ও তাপের প্রভাবে জৈব পদার্থের পরিবর্তন থেকে সৃষ্টি গ্যাস। গবেষকেরা এর সম্ভাব্য উৎস হিসেবে ভূগর্ভস্থ আপার ডেভোনিয়ান যুগের শেল স্তরের কথা উল্লেখ করেন। ফাটল ও ভাঙা শিলাস্তরের পথ ধরে সেই গ্যাস উপরে উঠে আসছে।
আরও বিস্ময়কর ছিল গ্যাসটির গঠন। সাধারণ প্রাকৃতিক গ্যাস নিঃসরণে মিথেনের আধিক্য দেখা গেলেও এখানকার গ্যাসে ইথেন ও প্রোপেন মিলিয়ে প্রায় ৩৫ শতাংশ পাওয়া যায়। গবেষকদের মতে, প্রাকৃতিক গ্যাস নিঃসরণের ক্ষেত্রে এটি অস্বাভাবিক রকমের বেশি। মূল গ্যাস বের হওয়ার স্থান থেকে প্রতিদিন আনুমানিক ১ কিলোগ্রাম মিথেন বের হওয়ার হিসাবও দিয়েছিলেন তারা।
সত্যিই কি এই আগুন কখনো নেভে না?
‘ইটারনাল ফ্লেম’ শুনলে মনে হয় শিখাটি শত শত বছর ধরে এক মুহূর্তের জন্যও নেভেনি। বাস্তবে প্রচণ্ড পানি, বাতাস কিংবা অন্য কারণে আগুনটি মাঝেমধ্যেই নিভে যেতে পারে। তবে গ্যাস বের হওয়া বন্ধ হয় না। ফলে আগুন নিভে গেলে আবার ম্যাচ বা লাইটারের সাহায্যে জ্বালানো সম্ভব। দর্শনার্থীরা অতীতে এভাবেই শিখাটি পুনরায় জ্বালিয়েছেন।
আগুনটি ঠিক কবে প্রথম জ্বালানো হয়েছিল, সে বিষয়ে নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই। কোথাও কোথাও বহু শতাব্দী বা হাজার বছর ধরে আগুন জ্বলার দাবি পাওয়া যায়। ২০১৩ সালের গবেষণাতেও দীর্ঘকাল ধরে এখানে প্রাকৃতিক গ্যাস নিঃসরণের সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে।
বসন্তে বরফগলা পানি ও বৃষ্টির কারণে জলপ্রপাতের প্রবাহ বাড়লে আগুনটি পানির আড়ালে দেখা যায়। আর তুলনামূলক শুষ্ক সময়ে পানি কমে এলে পাথরের খাঁজ এবং শিখা আরও পরিষ্কার হয়। গ্রীষ্ম ও শরতে কখনো জলপ্রপাতের প্রবাহ অনেকটাই কমে যেতে পারে।
জায়গাটির জনপ্রিয়তা বেড়ে যাওয়ায় দর্শনার্থীর চাপও বেড়েছে। নিরাপত্তা ও ক্ষয়রোধের জন্য ২০২৩ সালে এরি কাউন্টি কর্তৃপক্ষ ইটারনাল ফ্লেম ট্রেইলে নতুন কাঠের সিঁড়ি, রেলিং ও পথ সংস্কারের কাজ করে। কারণ দূরত্ব সংক্ষিপ্ত হলেও গিরিখাতে নামার কিছু অংশ ভেজা ও পিচ্ছিল হতে পারে।
তবু ইটারনাল ফ্লেম ফলসে প্রাকৃতিকভাবে এমন দৃশ্য তৈরি হয়েছে, যা প্রথম দেখায় প্রায় অসম্ভব, অতিপ্রাকৃতিক বলে মনে হয়। পানি যেখানে আগুন নেভানোর কথা, সেখানেই পানির পেছনে আগুনের জন্য তৈরি হয়েছে নিরাপদ আশ্রয়! তথাকথিত রহস্যের বড় অংশেরই বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা পাওয়া গেছে, কিন্তু সেই ব্যাখ্যা মানুষের আগ্রহে কোনো কমতি সৃষ্টি করতে পারেনি।
ফিচার ইমেজ: Wikimedia Commons
রেফারেন্স
- Incredibly Rare Eternal Flame Found Inside Waterfall – Newsweek
- Eternal Flame Falls: New York’s mini waterfall that hides a grotto filled with undying fire – Live Science
- Eternal Flame Falls in New York – ToI