Skip to main content

Ridge Bangla

দিয়াতলভ পাস রহস্য: বরফের পাহাড়ে ৯ অভিযাত্রীর মৃত্যুর অমীমাংসিত রহস্য

১৯৫৯ সালের ফেব্রুয়ারির এক হাড়কাঁপানো রাত। সোভিয়েত ইউনিয়নের উত্তর উরাল পর্বতমালা তখন তুষারের নিচে চাপা। চারপাশে জনমানবের চিহ্ন নেই। তাপমাত্রা হিমাঙ্কের বহু নিচে, বইছে প্রবল বাতাস। এমন প্রতিকূল পরিবেশে পাহাড়ের ঢালে একটি তাঁবুর ভেতরে রাত কাটাচ্ছিলেন নয়জন অভিজ্ঞ অভিযাত্রী।

তারপর কোনো এক মুহূর্তে এমন কিছু ঘটল, যার কারণে তাঁরা তাঁবুর স্বাভাবিক দরজা ব্যবহার না করে ভেতর থেকে কাপড় কেটে বেরিয়ে গেলেন। অনেকের পায়ে জুতা ছিল না, কারও শরীরে পর্যাপ্ত শীতের পোশাকও ছিল না। তাঁবুর ভেতরেই পড়ে রইল তাঁদের বুট, পোশাক, খাবার ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম।

প্রচণ্ড ঠান্ডার মধ্যে তাঁরা নেমে গেলেন এক কিলোমিটারেরও বেশি দূরের জঙ্গলের দিকে। আর কখনো ফিরে এলেন না!

কয়েক সপ্তাহ পর উদ্ধারকারীরা যখন প্রথম তাঁবুটি খুঁজে পান, শুরু হয় এমন এক রহস্যের, যা ষাট বছরের বেশি সময় ধরে গবেষক, সাংবাদিক, বিজ্ঞানী এবং রহস্যপ্রেমীদের তাড়া করে বেড়াচ্ছে। কেউ বলেছেন তুষারধস, কেউ গোপন সোভিয়েত সামরিক পরীক্ষা, কেউ ইনফ্রাসাউন্ড, কেউ অজানা আক্রমণকারী, এমনকি ইয়েতি বা ইউএফও পর্যন্ত এসেছে আলোচনায়।

ঘটনাটি আজ পরিচিত ‘দিয়াতলভ পাস ইন্সিডেন্ট’ নামে।

কিন্তু আসলে কী হয়েছিল সেই রাতে?

যাত্রা শুরু হয়েছিল স্বপ্ন নিয়ে

১৯৫৯ সালের জানুয়ারিতে উরাল পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থী ও সাবেক শিক্ষার্থীদের একটি দল উত্তর উরালের দুর্গম অঞ্চলে স্কি অভিযানে বের হওয়ার প্রস্তুতি নেয়। নেতৃত্বে ছিলেন ২৩ বছর বয়সী ইগর দিয়াতলভ। বয়সে তরুণ হলেও তিনি ছিলেন অভিজ্ঞ অভিযাত্রী।

দলের পরিকল্পনা ছিল অত্যন্ত কঠিন একটি শীতকালীন রুট অতিক্রম করা। সে সময়ের সোভিয়েত মানদণ্ড অনুযায়ী এটি ছিল সর্বোচ্চ কঠিন শ্রেণির অভিযানের উপযোগী পথ। অর্থাৎ দলটির সদস্যরা কোনোভাবেই অনভিজ্ঞ পর্যটক ছিলেন না। কঠিন আবহাওয়া, তুষার, পাহাড়ি ভূখণ্ড এবং দীর্ঘদিনের অভিযানের সঙ্গে তাঁদের পরিচয় ছিল।

মূল দলে ছিলেন দশজন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন ইগর দিয়াতলভ, জিনাইদা কোলমোগোরোভা, লিউদমিলা দুবিনিনা, ইউরি দোরোশেঙ্কো, ইউরি ক্রিভোনিশেঙ্কো, রুস্তেম স্লোবোদিন, আলেকজান্ডার কোলেভাতভ, নিকোলাই থিবো ব্রিগনোল, সেমিয়ন জোলোতারিওভ এবং ইউরি ইউদিন।

Image source: BBC

২৩ জানুয়ারি তাঁরা যাত্রা শুরু করেন। কয়েক দিন ট্রেন, ট্রাক এবং শেষে স্কিতে এগিয়ে দলটি পৌঁছায় সভ্যতা থেকে অনেক দূরের তুষারাবৃত অঞ্চলে।

কিন্তু ২৮ জানুয়ারির দিকে ইউরি ইউদিন অসুস্থ হয়ে পড়েন। শারীরিক সমস্যার কারণে তাঁকে ফিরে যেতে হয়।

সে সময় সিদ্ধান্তটি নিশ্চয়ই তাঁর কাছে বেশ হতাশাজনক ছিল। পরে এটিই হয়ে ওঠে তাঁর সবচেয়ে বড় সৌভাগ্য। কারণ দলের অন্য নয়জন আর জীবিত ফিরে আসেননি।

‘ডেড মাউন্টেন’-এর ঢালে শেষ তাঁবু

১ ফেব্রুয়ারি দলটি খোলাত সিয়াখল পাহাড়ের ঢালে পৌঁছায়। স্থানীয় মানসি ভাষায় নামটির অর্থ প্রায় ‘‘মৃত পাহাড়’। নামটি পরবর্তী সময়ের গল্পগুলোকে আরও ভয়ংকর করে তুললেও পাহাড়টির নামের সঙ্গে অভিযাত্রীদের মৃত্যুর কোনো রহস্যময় সম্পর্কের প্রমাণ নেই।

আবহাওয়া ক্রমেই খারাপ হচ্ছিল। তুষার আর বাতাসে দৃশ্যমানতা কমে আসে। দলটি তাদের পরিকল্পিত পথ থেকে কিছুটা বিচ্যুত হয়ে পাহাড়ের ঢালে উঠে আসে।

চাইলেই তারা সম্ভবত নিচের বনাঞ্চলের দিকে ফিরে যেতে পারত, যেখানে গাছপালা বাতাস থেকে কিছুটা আশ্রয় দিত। কিন্তু অভিযাত্রীদের ধারণা ছিল- পরদিন যাত্রা চালিয়ে যাওয়াই সুবিধাজনক হবে। তাই ঢালের ওপরেই তাঁবু স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

তাঁবু বসানোর জন্য জমে থাকা তুষার কেটে সমতল জায়গা তৈরি করা হয়। বহু বছর পর এই ছোট্ট সিদ্ধান্তকেই দিয়াতলভ রহস্যের সম্ভাব্য সমাধানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করবেন বিজ্ঞানীরা।

সন্ধ্যার পর দলটি তাঁবুতে ঢোকে। তাঁদের ক্যামেরায় পাওয়া শেষ ছবিগুলোর একটিতে তুষারের মধ্যে তাঁবু তৈরির প্রস্তুতি দেখা যায়। তারপর রাত নামে।

অপেক্ষা, তারপর উদ্বেগ

অভিযান শেষ করে দলের নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে যোগাযোগ করার কথা ছিল। কয়েক দিন বিলম্ব হলে প্রথমে তেমন উদ্বেগ দেখা দেয়নি। দীর্ঘ শীতকালীন অভিযানে দেরি হওয়া অস্বাভাবিক ছিল না।

কিন্তু সময় পেরোতে থাকলে পরিবারের সদস্যরা উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠেন। অবশেষে অনুসন্ধান শুরু হয়। প্রথমে শিক্ষার্থী ও স্বেচ্ছাসেবীরা, পরে সামরিক বাহিনী ও অন্যান্য উদ্ধারকারীও অভিযানে যুক্ত হন।

২৬ ফেব্রুয়ারি অনুসন্ধানকারীরা খোলাত সিয়াখলের ঢালে দিয়াতলভ দলের তাঁবু খুঁজে পান।

Image source: history.com

তাঁবুটি তুষারের নিচে আংশিকভাবে চাপা ছিল। ভেতরে পড়ে ছিল জুতা, গরম পোশাক, ব্যক্তিগত সামগ্রী, খাবার ও অন্যান্য সরঞ্জাম। তদন্তে দেখা যায়, তাঁবুর কাপড়ে এমনভাবে কাটার চিহ্ন রয়েছে যা ভেতর থেকে তৈরি করা হয়েছিল।

আরও অদ্ভুত ব্যাপার ছিল পায়ের ছাপ।

তাঁবু থেকে নিচের জঙ্গলের দিকে যাওয়া মানুষের চিহ্ন পাওয়া গিয়েছিল। এগুলো দেখে মনে হয়নি যে সবাই আতঙ্কে এলোমেলোভাবে দৌড়াচ্ছিলেন। বরং তাঁরা দলবদ্ধভাবে নিচে নেমেছিলেন বলে ধারণা করা হয়।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, কেন? অভিজ্ঞ নয়জন মানুষ কেন প্রাণঘাতী ঠান্ডার মধ্যে নিজেদের জুতা ও গরম পোশাক ফেলে তাঁবু ছেড়ে চলে যাবেন?

জঙ্গলের নিচে প্রথম দুই মরদেহ

তাঁবু থেকে প্রায় এক কিলোমিটারের বেশি নিচে বনাঞ্চলে একটি বড় সিডার গাছের কাছে পাওয়া যায় ইউরি দোরোশেঙ্কো ও ইউরি ক্রিভোনিশেঙ্কোর মরদেহ। তাঁদের শরীরে পর্যাপ্ত পোশাক ছিল না। কাছেই ছোট একটি আগুন জ্বালানোর চিহ্ন পাওয়া যায়।

ঘটনাস্থলের অবস্থা থেকে একটি সম্ভাব্য দৃশ্য কল্পনা করা যায়। তাঁবু ছেড়ে নিচে নামার পর দলটি বনের আশ্রয়ে পৌঁছেছিল। সেখানে অন্তত কয়েকজন আগুন জ্বালানোর চেষ্টা করেন। সম্ভবত তাঁরা অপেক্ষা করছিলেন পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার জন্য।

Image source: BBC

এরপর হয়তো তাঁবুতে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

সিডার গাছ আর তাঁবুর মাঝামাঝি বিভিন্ন স্থানে পাওয়া যায় ইগর দিয়াতলভ, জিনাইদা কোলমোগোরোভা ও রুস্তেম স্লোবোদিনের মরদেহ। তাঁদের অবস্থান দেখে দীর্ঘদিন ধরে ধারণা করা হয়েছে, তাঁরা হয়তো তাঁবুর দিকে ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু প্রচণ্ড ঠান্ডা, বাতাস এবং অন্ধকারে সেই চেষ্টা সফল হয়নি।

প্রথম পাঁচজনের মৃত্যুর ক্ষেত্রে হাইপোথার্মিয়াকে প্রধান কারণ হিসেবে দেখা হয়। তবে এখানেই রহস্য শেষ হয়নি। কারণ তখনো চারজন নিখোঁজ।

বরফ গলার পর সামনে আসে ভয়ংকর দৃশ্য

মে মাসে বরফ গলতে শুরু করলে একটি গিরিখাতে পাওয়া যায় বাকি চার অভিযাত্রীর মরদেহ। তাঁরা ছিলেন লিউদমিলা দুবিনিনা, সেমিয়ন জোলোতারিওভ, নিকোলাই থিবো ব্রিগনোল এবং আলেকজান্ডার কোলেভাতভ।

তাদের দেহের আঘাতগুলো অনেক বেশি গুরুতর ছিল। থিবো ব্রিগনোলের মাথার খুলিতে মারাত্মক ফ্র্যাকচার ছিল। দুবিনিনা ও জোলোতারিওভের বুকে গুরুতর আঘাত এবং একাধিক ভাঙা পাঁজর পাওয়া যায়।

সবচেয়ে বেশি রহস্য তৈরি করে মৃতদেহগুলোর সফট টিস্যুর ক্ষতি। দুবিনিনার চোখ ও জিহ্বার অংশবিশেষ অনুপস্থিত ছিল, অন্য কয়েকটি দেহেও চোখসহ মুখমণ্ডলের কিছু সফট টিস্যু পাওয়া যায়নি।

এই তথ্যগুলো পরবর্তী দশকগুলোতে প্রায় অতিপ্রাকৃত গল্পে পরিণত হয়।

তবে এখানে এক ভিন্ন বাস্তবতার কথাও বলেন বিশেষজ্ঞরা। এই চারটি মরদেহ কয়েক মাস ধরে গভীর তুষার ও বরফের নিচে একটি স্রোতযুক্ত গিরিখাতে পড়ে ছিল। দীর্ঘ সময় ধরে পানিতে থাকা, পচন এবং প্রাণীর কার্যকলাপ সফট টিস্যুর ক্ষতির সম্ভাব্য ব্যাখ্যা দেয়। ফলে ‘চোখ তুলে নেওয়া’ কিংবা ‘জিহ্বা কেটে নেওয়া’ ধরনের নাটকীয় বর্ণনা ঘটনাটির ফরেনসিক বাস্তবতাকে পুরোপুরি তুলে ধরে না।

তদন্তের অদ্ভুত সমাপ্তি

সোভিয়েত তদন্তকারীরা হত্যা বা অপরাধের স্পষ্ট প্রমাণ পাননি। আশপাশের মানসি জনগোষ্ঠীর কাউকে সন্দেহ করারও ভিত্তি পাওয়া যায়নি। অন্য কারও পায়ের ছাপও শনাক্ত হয়নি।

Image source: BBC

১৯৫৯ সালের তদন্ত শেষ পর্যন্ত মৃত্যুর কারণ হিসেবে ‘প্রবল প্রাকৃতিক শক্তি’ বা এমন এক প্রাকৃতিক শক্তির কথা বলা হয়, যা অভিযাত্রীরা অতিক্রম করতে পারেননি। এই অস্পষ্ট সিদ্ধান্ত রহস্য কমানোর বদলে আরও বাড়িয়ে দেয়। সঙ্গে যোগ হয় আরেকটি তথ্য। কয়েকটি পোশাকে রেডিওঅ্যাকটিভ পদার্থের চিহ্ন পাওয়া গিয়েছিল।

শুরু হয় প্রশ্ন। ওই অঞ্চলে কি গোপন সামরিক পরীক্ষা চলছিল? কোনো ক্ষেপণাস্ত্র বা বিস্ফোরক কি দুর্ঘটনার কারণ ছিল? অভিযাত্রীরা কি এমন কিছু দেখে ফেলেছিলেন, যা তাঁদের দেখার কথা ছিল না?

গোপন অস্ত্র, ইউএফও থেকে ইয়েতি

দিয়াতলভ পাস নিয়ে গত কয়েক দশকে শতাধিক ব্যাখ্যা উঠে এসেছে।

সবচেয়ে জনপ্রিয় তত্ত্বগুলোর একটি ছিল সোভিয়েত সামরিক বাহিনীর গোপন অস্ত্র পরীক্ষা। ওই সময় আকাশে অস্বাভাবিক আলোর গোলা দেখার দাবি এবং পোশাকে রেডিওঅ্যাকটিভিটির উপস্থিতি এই ধারণাকে শক্তিশালী করেছিল।

কিন্তু অভিযাত্রীদের শরীরে বিস্ফোরণ বা সামরিক অস্ত্রের প্রত্যাশিত ধরনের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। রেডিওঅ্যাকটিভিটির মাত্রাও এমন ছিল না যা বড় ধরনের পারমাণবিক দুর্ঘটনার পরিষ্কার প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। দলের অন্তত একজন সদস্য আগে পারমাণবিক শিল্পসংশ্লিষ্ট একটি স্থানে কাজ করেছিলেন, যা পোশাকে সীমিত দূষণের বিকল্প ব্যাখ্যাও দেয়।

আরেকটি তত্ত্ব ছিল ইনফ্রাসাউন্ড। প্রবল বাতাস পাহাড়ের ভূপ্রকৃতির সঙ্গে মিলে মানুষের শ্রবণসীমার নিচের কম্পাঙ্ক তৈরি করে আতঙ্ক বা মানসিক বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে বলে প্রস্তাব করা হয়েছিল। কিন্তু নয়জন অভিজ্ঞ অভিযাত্রীর একই সঙ্গে এত চরম সিদ্ধান্ত নেওয়ার ব্যাখ্যা হিসেবে এর প্রত্যক্ষ প্রমাণ নেই।

এরপর এসেছে ইয়েতি, অজানা প্রাণী, ইউএফও, কেজিবির অভিযান, বিদেশি গুপ্তচর এবং স্থানীয় হামলার গল্প। থিওরিগুলো শুনতে রোমাঞ্চকর লাগলেও সমস্যা একটাই- এগুলোর পক্ষে শক্ত প্রমাণ নেই।

তুষারধস হলে তার চিহ্ন কোথায়?

প্রথম থেকেই তুষারধসের কথা উঠেছিল। কিন্তু সমালোচকেরা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আপত্তি তুলেছিলেন।

  • প্রথমত, তাঁবুর জায়গাকে প্রচলিত বড় অ্যাভালাঞ্চের জন্য যথেষ্ট খাড়া মনে হচ্ছিল না।
  • দ্বিতীয়ত, উদ্ধারকারীরা ঘটনাস্থলে বড় তুষারধসের পরিষ্কার চিহ্ন দেখেননি।
  • তৃতীয়ত, তাঁবু পুরোপুরি ভেসে যায়নি।
  • চতুর্থত, কিছু অভিযাত্রীর বুক ও মাথার আঘাত এত গুরুতর ছিল যে একটি ছোট তুষারধস কীভাবে সেগুলো সৃষ্টি করবে, সেটিও বোঝা কঠিন ছিল।

ফলে বছরের পর বছর তুষারধস তত্ত্বকেও অসম্পূর্ণ মনে হয়েছে।

পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে ২০১৯ সালে।

রুশ প্রসিকিউটররা নতুন করে ঘটনার তদন্ত শুরু করেন। বিভিন্ন প্রাকৃতিক সম্ভাবনা পরীক্ষা করার পর ২০২০ সালে তাঁরা জানান, তুষারধস এবং পরবর্তী প্রতিকূল পরিবেশই ঘটনার সবচেয়ে সম্ভাব্য ব্যাখ্যা।

তদন্তকারীদের মতে, বিপদের কারণে অভিযাত্রীরা তাঁবু ছেড়ে নিরাপদ স্থানে সরে যান। কিন্তু তীব্র তুষারঝড় ও খুব কম দৃশ্যমানতার মধ্যে তাঁবুতে ফেরার পথ হারিয়ে ফেলেন। এরপর প্রচণ্ড ঠান্ডা তাঁদের বাঁচার সম্ভাবনা দ্রুত কমিয়ে দেয়।

৬২ বছর পর বিজ্ঞানীদের নতুন মডেল

২০২১ সালের জানুয়ারিতে বিজ্ঞানী ইয়োহান গাউমে এবং আলেকজান্ডার পুজরিন ‘কমিউনিকেশনস আর্থ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট’ জার্নালে দিয়াতলভ পাস নিয়ে একটি পিয়ার রিভিউড গবেষণা প্রকাশ করেন।

তাঁদের প্রস্তাব ছিল- প্রচলিত বিশাল তুষারধস না, বরং ছোট আকারের ‘স্ল্যাব অ্যাভালাঞ্চ’ এর জন্য দায়ী।

ঘটনার রাতে অভিযাত্রীরা তাঁবু স্থাপন করতে ঢালের তুষার কেটে জায়গা তৈরি করেছিলেন। এতে তুষারের স্তরের স্বাভাবিক স্থিতিশীলতা কিছুটা দুর্বল হতে পারে। এরপর পাহাড়ি প্রবল বাতাস ওপরের অংশ থেকে তুষার এনে ওই জায়গার ওপর জমা করতে থাকে।

Image source: Nature

এখানেই গুরুত্বপূর্ণ হলো সময়।

তাঁবু তৈরির সঙ্গে সঙ্গে তুষার নেমে আসেনি। বাতাসে ধীরে ধীরে অতিরিক্ত তুষার জমার কয়েক ঘণ্টা পর ওপরের শক্ত তুষারের একটি স্ল্যাব দুর্বল স্তরের ওপর দিয়ে সরে গিয়ে তাঁবুর অংশবিশেষে আঘাত করতে পারে।

গবেষকদের কম্পিউটার মডেল দেখায়, তুলনামূলক ছোট তুষারের স্ল্যাবও তাঁবুতে শুয়ে থাকা মানুষের ওপর যথেষ্ট শক্তি প্রয়োগ করে গুরুতর আঘাত করতে পারে, বিশেষ করে মানুষের শরীর যদি নিচের শক্ত তুষার ও ওপর থেকে আসা ভারী স্ল্যাবের মাঝখানে চাপা পড়ে।

এই ব্যাখ্যার আরেকটি সুবিধা হলো, ছোট স্ল্যাব অ্যাভালাঞ্চ ঘটলে বিশাল তুষারধসের মতো দীর্ঘস্থায়ী চিহ্ন না থাকাও সম্ভব। আর উদ্ধারকারীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছান ঘটনার প্রায় তিন সপ্তাহ পর।

তাহলে তাঁবু কেটে পালালেন কেন?

ধরা যাক, রাতে তাঁবুর ওপর হঠাৎ তুষারের একটি ভারী অংশ নেমে এল। তাঁবুর ভেতরে কয়েকজন আহত হলেন, এবং সবাই বুঝলেন- ওপরের ঢাল অস্থিতিশীল। সে অবস্থায় স্বাভাবিক দরজা হয়তো তুষার বা সরঞ্জামে আটকে ছিল, অথবা দ্রুত বের হতে তাঁবুর পাশ কেটে ফেলা সবচেয়ে কার্যকর উপায় ছিল।

তাঁরা জানতেন, সম্ভাব্য আরেকটি তুষারধস থেকে বাঁচতে হলে ঢাল ছেড়ে নিচে যেতে হবে। তাই পোশাক বা বুট পরার জন্য সময় নষ্ট না করে দলটি নিচের বনের দিকে যায়।

এই জায়গায় একটি বিষয় দিয়াতলভের অমীমাংসিত রহস্যকে অনেক বেশি বাস্তবসম্মত করে তোলে। তাঁরা সম্ভবত দিগ্বিবিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে পালাননি। উদ্ধার হওয়া পায়ের চিহ্ন এবং নিচে আগুন জ্বালানোর চেষ্টা বরং ইঙ্গিত করে যে তাঁরা পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন।

জঙ্গলে পৌঁছে আগুন জ্বালানো হয়। আহতদের জন্য তুষারের মধ্যে আশ্রয় তৈরির চেষ্টাও করা হয়ে থাকতে পারে। যারা অপেক্ষাকৃত সক্ষম ছিলেন, তাঁদের কয়েকজন তাঁবুতে ফিরে গরম পোশাক ও সরঞ্জাম আনার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু অন্ধকার, তুষারঝড়, প্রবল বাতাস এবং প্রাণঘাতী ঠান্ডার মধ্যে পাহাড়ের ঢালে একটি নিচু তাঁবু খুঁজে পাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে ওঠে।

২০২০ সালের তদন্তেও অত্যন্ত কম দৃশ্যমানতাকে তাঁদের তাঁবুতে ফিরতে না পারার গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

২০২২ সালে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার

২০২১ সালের গবেষণার পর বিজ্ঞানীরা বিষয়টি নিয়ে কাজ চালিয়ে যান। পরবর্তী অভিযানে ওই অঞ্চলে তুষারধসের বাস্তব চিহ্ন পাওয়া যায়।

২০২২ সালে গাউমে ও পুজরিন জানান, দিয়াতলভ পাসসংলগ্ন এলাকায় স্ল্যাব অ্যাভালাঞ্চের প্রমাণ পাওয়া গেছে এবং অঞ্চলটি অ্যাভালাঞ্চপ্রবণ। বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ ছিল এমন একটি ছোট স্ল্যাব অ্যাভালাঞ্চ, যার চিহ্ন প্রবল বাতাসে এক ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে প্রায় অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছিল।

এতে ১৯৫৯ সালের একটি বড় প্রশ্নের সম্ভাব্য উত্তর পাওয়া যায়। উদ্ধারকারীরা যদি প্রায় তিন সপ্তাহ পর ঘটনাস্থলে পৌঁছান, ছোট তুষারধসের দৃশ্যমান চিহ্ন তখন না থাকাটাই স্বাভাবিক হতে পারে। তবে গবেষকেরা এটাও দাবি করেননি যে তাঁরা সেই রাতের সব রহস্যের সমাধান করে ফেলেছেন।

রহস্য কি তাহলে সমাধান হয়ে গেছে?

আজ পর্যন্ত পাওয়া প্রমাণ বিচার করলে স্ল্যাব অ্যাভালাঞ্চ, প্রচণ্ড বাতাস, কম দৃশ্যমানতা, গুরুতর ঠান্ডা এবং হাইপোথার্মিয়ার সম্মিলিত ব্যাখ্যাই সবচেয়ে শক্তিশালী।

এর মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা যায় যে কেন হঠাৎ তাঁবু ছেড়ে সবাই বেরিয়ে এসেছিল, কেন ভেতর থেকে কাপড় কাটা হয়েছিল, কেন দলটি জঙ্গলের দিকে নেমেছিল, কেন তাঁরা তাঁবুতে ফিরতে পারেননি এবং কীভাবে কয়েকজন গুরুতর আঘাত পেয়েছিলেন। কিন্তু ‘সব প্রশ্নের উত্তর’ আজও পাওয়া যায়নি।

ঠিক কোন মুহূর্তে স্ল্যাব নেমেছিল, কারা তাঁবুর ভেতরেই আহত হয়েছিলেন, কার আঘাত পরে গিরিখাতে পড়ে তৈরি হয়েছিল, কেন প্রত্যেক সদস্য ঠিক সেই সিদ্ধান্তগুলো নিয়েছিলেন- এসবের পূর্ণাঙ্গ উত্তর দেওয়ার মতো কোনো জীবিত সাক্ষী নেই।

যে রহস্যের ভেতর আসলে রয়েছে বেঁচে থাকার লড়াই

দিয়াতলভ পাসের ঘটনাকে প্রায়ই বলা হয় ভয়ংকর মৃতদেহ, কাটা তাঁবু, রেডিয়েশন, ইউএফও বা অজানা শক্তির রহস্যময় গল্প হিসেবে। কিন্তু এই প্রমাণগুলোকে পাশাপাশি রাখলে আরেক ভিন্ন বাস্তবতা দেখা যায়- প্রতিকূল প্রকৃতির মধ্যে আটকে পড়া নয়জন তরুণ ও অভিজ্ঞ মানুষের বেঁচে থাকার লড়াইয়ের গল্প।

হঠাৎ কোনো বিপদ তাঁদের তাঁবু ছাড়তে বাধ্য করেছিল। তাঁরা নিচে নেমেছেন। আগুন জ্বালানোর চেষ্টা করেছেন। আশ্রয় তৈরির চেষ্টা করেছেন। দলের কিছু সদস্য সম্ভবত আহত সঙ্গীদের বাঁচানোর চেষ্টা করেছেন। কেউ কেউ আবার মৃত্যুঝুঁকি নিয়েও তাঁবুতে ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন। অর্থাৎ এটা প্রকৃতির বিরুদ্ধে নয়জন মানুষের শেষ লড়াইয়ের গল্পও বটে।

৬৭ বছর পর আজ আমাদের হাতে উন্নত কম্পিউটার মডেল আছে, তুষারবিদ্যার আধুনিক জ্ঞান আছে, পুরনো তদন্তের ডকুমেন্ট আছে, ফরেনসিক রিপোর্ট আছে। এগুলো দিয়াতলভ পাসের অন্ধকার অনেকটাই সরিয়েছে। তারপরও উরাল পর্বতমালার সেই বরফঢাকা ঢালে একটি প্রশ্ন যেন এখনো তাড়া করে বেড়ায়- ১৯৫৯ সালের ১ ফেব্রুয়ারির গভীর রাতে ঠিক কোন মুহূর্তে নয়জন অভিযাত্রী বুঝেছিলেন, তাঁবুর ভেতরে আর থাকা যাবে না? সেই উত্তর হয়তো তাঁদের সঙ্গেই বরফের পাহাড়ে হারিয়ে গেছে।

ফিচার ইমেজ: History.com

তথ্যসূত্র

  1. Mechanisms of slab avalanche release and impact in the Dyatlov Pass incident in 1959 – January 28, 2021 – Communications Earth & Environment, Nature
  2. Post-publication careers: follow-up expeditions reveal avalanches at Dyatlov Pass – March 24, 2022 – Communications Earth & Environment, Nature
  3. Russia blames avalanche for 1959 Urals mountain tragedy, RIA agency reports – July 11, 2020 – Reuters
  4. Have Scientists Finally Unraveled the 60-Year Mystery Surrounding Nine Russian Hikers’ Deaths? – January 29, 2021 – Smithsonian Magazine
  5. The Dyatlov Pass Incident: Why the Hiker Deaths Remain a Mystery – January 31, 2024, updated July 17, 2025 – HISTORY
  6. Resolution to close the case – May 28, 1959 – DyatlovPass.com / Soviet Investigation Case Files
  7. Dyatlov Pass Case Files – 1959 investigation records – DyatlovPass.com
This post was viewed: 44

আরো পড়ুন