Skip to main content

Ridge Bangla

কর্পস ফ্লাওয়ার: পচা লাশের গন্ধ ছড়িয়ে যে ফুল ডেকে আনে অতিথি!

একটি ফুল ফুটেছে, আর সেটি দেখতে মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে আছে। অথচ ফুলটির কাছে পৌঁছানোর পর নাকে কোনো সুগন্ধ আসছে না, বরং এর গন্ধ অনেকটা পচে যাওয়া মাংস, নষ্ট মাছ কিংবা দীর্ঘদিন পড়ে থাকা মৃতদেহের মতো! অদ্ভুত শোনালেও এটাই কর্পস ফ্লাওয়ারের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ!

ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রার রেইনফরেস্টের এই উদ্ভিদের বৈজ্ঞানিক নাম Amorphophallus titanum। টাইটান অ্যারাম নামেও এটি পরিচিত। ইতালীয় উদ্ভিদবিদ ওদোয়ার্দো বেক্কারি ১৮৭৮ সালে উদ্ভিদটিকে বৈজ্ঞানিকভাবে বর্ণনা করেন। এরপর থেকেই এর বিশাল আকৃতি এবং অসহনীয় গন্ধ উদ্ভিদবিদ থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের কৌতূহলের বিষয় হয়ে আছে।

আসলে এটি ফুল না!

দেখে মনে হতে পারে, মাটি ফুঁড়ে উঠে এসেছে দৈত্যাকার একটি ফুল। কিন্তু এটি আসলে একক ফুল না। এটি একটি ইনফ্লোরেসেন্স, অর্থাৎ অনেকগুলো ছোট ফুল নিয়ে তৈরি একটি ফুলের কাঠামো। মাঝখানে থাকা লম্বা স্তম্ভের মতো অংশটির নাম স্প্যাডিক্স। তাকে ঘিরে থাকে বড়, ভাঁজযুক্ত স্প্যাথ, যার বাইরের দিক সবুজ আর ভেতরটা গাঢ় লালচে বা মেরুন। আসল ফুলগুলো থাকে স্প্যাডিক্সের একেবারে নিচের দিকে, চোখের আড়ালে। সেখানে স্ত্রী ও পুরুষ ফুল আলাদা সারিতে সাজানো থাকে।

Image courtesy: Mangiwau via Getty Images
Image courtesy: Mangiwau via Getty Images

টাইটান অ্যারাম পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আনব্রাঞ্চড ইনফ্লোরেসেন্স তৈরি করতে পারে। কোনো কোনোটি প্রায় তিন মিটার পর্যন্ত উঁচু হয়। মাটির নিচে থাকে আলুর মতো বিশাল একটি অংশ, যেখানে গাছটি খাবার ও শক্তি জমিয়ে রাখে। এই শক্তি সঞ্চয়ের কারণেই কর্পস ফ্লাওয়ারে প্রতিবছর ফুল ফোটে না। একটি গাছ প্রথমবার ফুল দিতে ৭-১০ বছর, কখনো আরও বেশি সময় নিতে পারে। ফুল ফুটলেও সেই দৃশ্য দীর্ঘস্থায়ী হয় না। সাধারণত ২৪-৩৬ ঘণ্টার মধ্যেই বিশাল কাঠামোটি ঝিমিয়ে পড়তে শুরু করে।

এত দুর্গন্ধ কেন?

মানুষের কাছে যে গন্ধ অসহ্য, কর্পস ফ্লাওয়ারের কাছে সেটিই বংশবিস্তারের উপায়। বেশিরভাগ পরিচিত ফুল মৌমাছি বা প্রজাপতির মতো পরাগবাহী পতঙ্গদের আকৃষ্ট করতে রং ও সুগন্ধ ব্যবহার করে। কর্পস ফ্লাওয়ারের লক্ষ্য আসলে অন্য ধরনের পতঙ্গ। পচা প্রাণীর দেহে আসা ক্যারিয়ন বিটল এবং বিভিন্ন ধরনের মাছির কাছে মৃত মাংসের গন্ধ অত্যন্ত আকর্ষণীয়। তাই কর্পস ফ্লাওয়ার শুধু পচা মাংসের মতো গন্ধই তৈরি করে না, তার গাঢ় লালচে ভেতরের অংশটিও দেখতে অনেকটা মাংসের মতো।

 

Image courtesy: Sebastien Bozon/AFP/Getty Images
Image courtesy: Sebastien Bozon/AFP/Getty Images

এর এমন গন্ধের পেছনে রয়েছে একাধিক সালফারযুক্ত রাসায়নিক যৌগ। এর মধ্যে ডাইমিথাইল ডাইসালফাইড, ডাইমিথাইল ট্রাইসালফাইড এবং মিথেনথিওলের মতো যৌগ পাওয়া গেছে। কোনোটি রসুনের মতো, কোনোটি পচা বাঁধাকপি বা পেঁয়াজের মতো গন্ধ তৈরি করে। সব মিলিয়ে তৈরি হয় সেই বিখ্যাত ‘মৃতদেহের গন্ধ’।

কিন্তু কর্পস ফ্লাওয়ার এখানেই থামে না। ফুল ফোটার সময় এর স্প্যাডিক্স নিজেই উত্তপ্ত হতে পারে। এই প্রক্রিয়ার নাম থার্মোজেনেসিস। তাপ গন্ধযুক্ত রাসায়নিকগুলোকে বাতাসে আরও ভালোভাবে ছড়িয়ে দিতে সাহায্য করে।

দুর্গন্ধের আসল দায়িত্ব স্ত্রী ফুলের

২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের কলোরাডো স্টেট ইউনিভার্সিটিতে ‘কসমো’ নামের একটি কর্পস ফ্লাওয়ার ফোটার সময় বিজ্ঞানীরা গাছটির গন্ধ প্রায় সেকেন্ড ধরে ধরে মাপার সুযোগ পান। ফলাফল সামনে আসার পর এর পরাগায়ন কৌশল সম্পর্কে আরও চমকপ্রদ তথ্য জানা যায়।

কর্পস ফ্লাওয়ারে স্ত্রী ও পুরুষ ফুল একই সময়ে সক্রিয় হয় না। প্রথম রাতে সক্রিয় হয় স্ত্রী ফুল। তখনই দুর্গন্ধ সবচেয়ে তীব্র থাকে এবং বিপুল পরিমাণ সালফারযুক্ত যৌগ বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে। গবেষকদের হিসাবে, স্বল্প সময়ের জন্য এর নির্গমনের হার ল্যান্ডফিলের তুলনায় প্রায় দশ গুণ পর্যন্ত বেশি হতে পারে। পরের রাতে পুরুষ ফুল সক্রিয় হলে সালফারের নির্গমন অনেকটাই কমে যায়।

Image courtesy: Genevieve Vallee/Alamy
Image courtesy: Genevieve Vallee/Alamy

এর সুবিধাও আছে। প্রথম রাতে দুর্গন্ধে আকৃষ্ট হয়ে আসা পোকামাকড় অন্য একটি কর্পস ফ্লাওয়ারের পরাগ সঙ্গে নিয়ে এলে স্ত্রী ফুল পরাগায়িত হতে পারে। এরপর পুরুষ ফুল থেকে পরাগ নিয়ে সেই পোকাই অন্য গাছের দিকে যেতে পারে। একই গাছের স্ত্রী ও পুরুষ ফুল আলাদা সময়ে সক্রিয় হওয়ায় নিজের পরাগে নিজের পরাগায়নের সম্ভাবনাও কমে যায়।

আজ কর্পস ফ্লাওয়ার ফুটলে বিশ্বের বিভিন্ন বোটানিক্যাল গার্ডেনে ভিড় জমে শুধু তাকে দেখতে এবং তার কুখ্যাত গন্ধ অনুভব করতে। কিন্তু প্রকৃতিতে এই দুর্গন্ধ কোনো প্রদর্শনী না, বরং এটি তার বংশবিস্তারের মাধ্যম। অল্প সময়ের ফুল ফোটার মধ্যে পোকামাকড় টেনে এনে পরাগায়নের সুযোগ তৈরি করাই এর লক্ষ্য। তারপর শুরু হয় দীর্ঘ অপেক্ষা। এই অদ্ভুত জীবনচক্র কর্পস ফ্লাওয়ারকে শুধু বিরলই না, সত্যিকারের বিস্ময়কর এক সৃষ্টিতে পরিণত করেছে।

ফিচার ইমেজ: GVSU

রেফারেন্স

This post was viewed: 8

আরো পড়ুন