Skip to main content

Ridge Bangla

ক্লিওপেট্রা: মৃত্যু, রূপ, ও তাঁর ঘিরে গড়ে ওঠা কিংবদন্তি

প্রাচীন বিশ্বের অন্যতম প্রতিভাধর ও আলোচিত নারীনেত্রী ছিলেন রানি সপ্তম ক্লিওপেট্রা। রোমান প্রজাতন্ত্রের পতন এবং মিশরের রাজতন্ত্রের অন্তিম অধ্যায়ে তাঁর প্রভাব ছিল ব্যাপক। বুদ্ধিমত্তা, রাজনৈতিক দূরদৃষ্টি, অর্থভাণ্ডারের প্রাচুর্য এবং রোমের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে আলোচিত সম্পর্ক, সব মিলিয়ে ক্লিওপেট্রা ছিলেন এক ব্যতিক্রমী ব্যক্তিত্ব, যিনি পুরুষশাসিত রাজনীতির মাঠে অনন্য কুশলতায় নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন।

আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটের সঙ্গে সংযোগ

অনেকে মনে করেন ক্লিওপেট্রা ছিলেন মিশরীয়। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তিনি ছিলেন গ্রিক বংশোদ্ভূত। খ্রিষ্টপূর্ব ৭০ বা ৬৯ সালে জন্ম নেওয়া ক্লিওপেট্রা ছিলেন দ্বাদশ টলেমি দ্বাদশ ও পঞ্চম ক্লিওপেট্রা ট্রাইফেইনার কন্যা। তাঁদের পূর্বপুরুষ টলেমি প্রথম সোটার ছিলেন আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটের এক বিশ্বস্ত সেনাপতি। টলেমিই মিশরের টোলেমাইক রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা। এই সূত্রে ক্লিওপেট্রার শিকড় প্রোথিত মেসিডোনিয়ায়। তিনি নিজেকে গ্রিক হিসেবে ভাবতেন। “ক্লিওপেট্রা” নামটির অর্থই হলো “পিতার গৌরব”, গ্রিক ঐতিহ্যেরই প্রতিচ্ছবি।

ভাইদের সঙ্গে রাজনৈতিক বিয়ে

মাত্র আঠারো বছর বয়সে ক্লিওপেট্রার বিয়ে হয় তাঁর ১০ বছরের ছোট ভাই ত্রয়োদশ টলেমির সঙ্গে, যিনি তখন সদ্য রাজা হয়েছেন। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই টলেমি তাঁর প্রাণনাশের চেষ্টা করলে ক্লিওপেট্রা পালিয়ে আশ্রয় নেন সিরিয়ায়। সেখান থেকেই সেনাবাহিনী গড়ে তুলে তিনি ফেরেন আলেকজান্দ্রিয়ায় এবং ভাইয়ের বিরুদ্ধে গৃহযুদ্ধে অবতীর্ণ হন।

এই সময়ে রোমান সম্রাট জুলিয়াস সিজার টলেমির আমন্ত্রণে আলেকজান্দ্রিয়া এসেছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ক্লিওপেট্রাই সিজারের সমর্থন অর্জন করেন, এবং তাঁদের সম্মিলিত সেনাশক্তি টলেমিকে পরাজিত করে।

এরপর ক্লিওপেট্রা বিয়ে করেন তাঁর ছোট ভাই চতুর্দশ টলেমিকে। তাঁর বয়স তখন ২২ এবং ভাইয়ের বয়স মাত্র ১২। জুলিয়াস সিজারের মৃত্যুর পর, খ্রিষ্টপূর্ব ৪৪ সালে টলেমি চতুর্দশও রহস্যজনকভাবে মারা যান। ধারণা করা হয়, ক্লিওপেট্রা নিজেই তাঁকে বিষ প্রয়োগে হত্যা করেন যাতে তাঁর পুত্রকেই উত্তরাধিকারী ঘোষণা করা যায়।

প্রজ্ঞা ও উচ্চাকাঙ্ক্ষায় অনন্য এক নারী

প্রাচীন ইতিহাসবিদ প্লুটার্কসহ অনেকেই ক্লিওপেট্রার মেধার প্রশংসা করেছেন। তিনি গণিত, দর্শন, ও বিতর্কে পারদর্শী ছিলেন। ভাষাগত দক্ষতাও ছিল বিস্ময়কর। তাঁর মাতৃভাষা কোইনে গ্রিক হলেও তিনি অন্তত নয়টি ভাষায় পারদর্শিতা অর্জন করেছিলেন, যার মধ্যে ছিল আরবি ও হিব্রু।

টলেমাইক বংশের মধ্যে ক্লিওপেট্রাই ছিলেন একমাত্র শাসক যিনি মিশরীয় ভাষা শিখেছিলেন। এর ফলে, তিনি তাঁর সৈন্য ও প্রজাদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলতে পারতেন। একজন প্রকৃত নেত্রী হিসেবে যে ক্ষমতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

অধিবর্ষের সূচনা

জুলিয়াস সিজারের সঙ্গে সম্পর্কের সময় ক্লিওপেট্রা তাঁকে আলেকজান্দ্রিয়ার বিখ্যাত জ্ঞানকেন্দ্রে নিয়ে যান, যেখানে তিনি পরিচয় করিয়ে দেন জ্যোতির্বিদ সোসিজিনিসের সঙ্গে। সোসিজিনিস তখন প্রস্তাব করেন একটি সৌরভিত্তিক বর্ষপঞ্জির, যা চন্দ্রচক্রের পরিবর্তে সূর্যচক্র অনুযায়ী সময় নির্ধারণ করবে। এতে প্রতি চার বছর পর পর এক দিন যুক্ত হবে, যাতে সময়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য বজায় থাকে। সিজার সেই প্রস্তাব গ্রহণ করেন এবং খ্রিষ্টপূর্ব ৪৫ সালে রোমে এই নতুন বর্ষপঞ্জি চালু করেন, এক বছর পর মিশরেও তা গৃহীত হয়।

ক্লিওপেট্রা ও আইসিসের মেলবন্ধন

প্রাচীন মিশরে রাজা ছিলেন দেবতা হোরাসের অবতার, আর রানি ছিলেন আইসিসের প্রতিচ্ছবি। অনেক নারী ফারাও পুরুষবেশে হোরাসেরূপে রাজত্ব করলেও ক্লিওপেট্রা নিজেকে খোলাখুলিভাবে আইসিস দেবীর রূপে উপস্থাপন করতেন। ধর্মীয় অনুষ্ঠানে তিনি আইসিসের বেশ ধারণ করতেন, ভবিষ্যদ্বাণীর আশ্রয় নিয়ে নিজের কার্যকলাপকে ধর্মীয় পরিপ্রেক্ষিতে বৈধতা দিতেন। এমনকি তাঁর প্রেমিক মার্ক অ্যান্টনি নিজেকে গ্রিক দেবতা ডায়োনিসাসের সঙ্গে তুলনা করতেন, আর শত্রু অক্টাভিয়ান নিজেকে উপস্থাপন করতেন দেবতা অ্যাপোলোর বেশে। ক্লিওপেট্রার সৌন্দর্য নিয়ে যুগে যুগে নানা রূপকথা রচিত হয়েছে। তবে ইতিহাসবিদরা একমত নন, তিনি আদতে দেখতে কেমন। তাঁর মূর্তির সংখ্যা অল্প এবং অখণ্ড রয়েছে কেবল একটি। প্রাচীন মুদ্রায় দেখা যায় তাঁর এক প্রবল ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মুখচ্ছবি।

রোমান প্রেম ও রাজনৈতিক আঁতাত

ক্লিওপেট্রা ও জুলিয়াস সিজারের সম্পর্ক এক কূটনৈতিক ও প্রেমঘটিত বন্ধনে পরিণত হয়। ৪৮ খ্রিষ্টপূর্বে আলেকজান্দ্রিয়ায় সিজার ক্লিওপেট্রাকে সমর্থন দিলে শুরু হয় তাদের সম্পর্ক। এই সম্পর্ক থেকে জন্ম নেয় তাঁদের সন্তান পঞ্চদশ টলেমি, যিনি কেসারিও নামে পরিচিত। সিজারের হত্যার পরে, ক্লিওপেট্রার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠে আরেক রোমান নেতা মার্ক অ্যান্টনির। ৪১ খ্রিষ্টপূর্বে তাঁদের প্রথম সাক্ষাৎ ঘটে এবং শীঘ্রই তাঁরা প্রেম ও রাজনীতিতে একত্রিত হন।

পালানোর ব্যর্থ প্রয়াস

অ্যাক্টিয়ামের যুদ্ধে পরাজয়ের পরে, ক্লিওপেট্রা এক গোপন সমুদ্রপথে ভারত অভিমুখে পালাতে চেষ্টা করেন। কিন্তু পথটি তখন দস্যুদের দখলে চলে গেলে তাঁরা স্যুয়েজ অঞ্চলের বিকল্প পথ ধরেন। দুর্ভাগ্যবশত, সেখানকার নাবাতিয়ানরা অক্টাভিয়ানের পক্ষে কাজ করত। ফলে, ক্লিওপেট্রার পালানোর পথ রুদ্ধ হয়ে যায়। বাধ্য হয়ে তিনি ফিরে আসেন মিশরে।

আত্মহত্যা নাকি হত্যা?

ক্লিওপেট্রার মৃত্যু আজও এক রহস্য। জনশ্রুতি অনুসারে, তিনি একটি সাপের দংশনে আত্মহত্যা করেন। অন্য ইতিহাসবিদেরা মনে করেন, তিনি বিষাক্ত সুঁই বা কেশপিন দিয়ে নিজের ভিতর বিষ প্রয়োগ করেন। আধুনিক গবেষণা অনুসারে, তিনি আত্মহত্যা করেননি; বরং অক্টাভিয়ান ইচ্ছাকৃতভাবে তাঁকে আত্মহত্যা করতে দিয়েছেন।

অজানা কবর

ক্লিওপেট্রা ও মার্ক অ্যান্টনির সমাধিস্থল আজও অজানা। বহু অনুসন্ধান সত্ত্বেও তাঁদের কবর আবিষ্কার করা যায়নি। আলেকজান্দ্রিয়া ও আশপাশের অঞ্চলজুড়ে বহু সম্ভাব্য স্থান খুঁজে দেখা হলেও, চূড়ান্ত প্রমাণ মেলেনি।

বিশ্ব ইতিহাসের এক ধনী নারী

আধুনিক হিসাব অনুযায়ী, ক্লিওপেট্রার সম্পদের পরিমাণ বর্তমান মুদ্রায় প্রায় ৯৫.৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা তাঁকে ইতিহাসের অন্যতম ধনী নারী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। মিশরের শস্য ছিল রোমের রুটি-সরবরাহের মূল উৎস, আর ক্লিওপেট্রার হাতে ছিল এই বিপুল ভাণ্ডারের নিয়ন্ত্রণ। তাঁর কোষাগার ছিল সোনা ও বহুজাতিক বাণিজ্যের লাভে পূর্ণ। তিনি জুলিয়াস সিজারের রাজনৈতিক কর্মসূচিকে অর্থায়ন করেছিলেন, অর্থ দিয়েছিলেন মার্ক অ্যান্টনির পার্থিয়া যুদ্ধেও।

তাঁর শাসনামলে খরা, দুর্ভিক্ষ ও আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত মিশরকে নাকাল করেছিল। তিনি রাজকোষ খুলে খাদ্য বিতরণ করেন, ধ্বংসপ্রাপ্ত অর্থনীতিকে রক্ষা করতে চালু করেন নতুন মুদ্রানীতি। তিনিই প্রথম ফারাও, যিনি মুদ্রায় তার মান ছাপিয়েছিলেন। পূর্ববর্তী ফারাওদের মতো সোনা-নির্ভর অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে তিনি কেবল রৌপ্যমুদ্রাই প্রচলনে রাখেন।

ক্লিওপেট্রা ছিলেন কেবল একজন নারী শাসক নন, এক কৌশলী রণনায়ক, সংস্কারক, প্রেমিকা এবং দেবীমূর্তির রূপকথার নায়িকা। তাঁর জীবন ইতিহাস, রাজনীতি, ধর্ম ও সাহিত্যের এক মেলবন্ধন, যা আজও বিস্ময় জাগায়, অনুপ্রেরণা দেয় এবং প্রশ্ন তোলে। তাঁর নাম ইতিহাসে অমর, আর তাঁর গল্প বিশ্বসভ্যতার এক অনবদ্য অধ্যায়।

তথ্যসূত্র

১। Who was Cleopatra?

২। Cleopatra: Biography of the last pharaoh of ancient Egypt

৩। Cleopatra Life, Rule & Death – Ancient Egypt

৪। Cleopatra Facts: Her Life, Loves & Children, Plus 6 Little- …

৫। History – Cleopatra

This post was viewed: 39

আরো পড়ুন