মরুভূমির শুকনো মাটির ওপর একটি পাথর পড়ে আছে। অস্বাভাবিক কিছু না ব্যাপারটা। কিন্তু পাথরটির পেছনে তাকালেই চমকে যেতে হবে আপনাকে। মাটির বুক চিরে চলে গেছে লম্বা একটি দাগ- কোনোটি একেবারে সোজা, কোনোটি আবার ঘুরে গেছে এদিক-ওদিক! দেখে মনে হয়, পাথরটি যেন নিজেই কয়েকশ মিটার পথ হেঁটে এসে সেখানে থেমেছে! আরও অদ্ভুত ব্যাপার হলো, আশপাশে মানুষের পায়ের ছাপ নেই। নেই কোনো প্রাণীর টেনে নেওয়ার চিহ্নও।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার ডেথ ভ্যালি ন্যাশনাল পার্কের দুর্গম রেসট্র্যাক প্লায়া বহু দশক ধরে এমন দৃশ্যের জন্যই বিখ্যাত। শুকনো এই হ্রদের তলে ছড়িয়ে থাকা পাথরগুলো বিশ্বজুড়ে পরিচিত ‘সেইলিং স্টোনস’ বা ‘চলন্ত পাথর’ নামে। কোনো কোনো পাথরের ওজন প্রায় ৩২০ কিলোগ্রাম, অথচ এদের পেছনে পাওয়া গেছে কয়েকশ মিটার দীর্ঘ পথচলার দাগ! প্রশ্ন হলো- এত ভারী পাথর সরাচ্ছে কে? কেন? কীভাবে?
মাটিতে পড়ে থাকা এক পুরনো ধাঁধা
রেসট্র্যাক প্লায়া আসলে পাহাড়ঘেরা প্রায় সমতল একটি শুকনো হ্রদতল। আশপাশের পাহাড় থেকে ক্ষয়ের ফলে ডলোমাইট ও অন্যান্য শিলা নিচে এসে পড়ে। সাধারণ অবস্থায় জায়গাটি এতটাই শুষ্ক যে এসব পাথরের নড়াচড়া করার কোনো কারণ চোখে পড়ে না। অথচ সময়ের ব্যবধানে তাদের অবস্থান বদলে যায় এবং নরম মাটিতে সেই চলাচলের স্পষ্ট চিহ্ন থেকে যায়।

বিজ্ঞানীরা অন্তত ১৯৪০-এর দশক থেকে এই রহস্যের পেছনে ছুটেছেন। কখনো প্রবল বাতাসকে দায়ী করা হয়েছে, কখনো ভেজা ও পিচ্ছিল মাটি, আবার কখনো বরফের কথা এসেছে। রহস্যপ্রেমীরা চৌম্বক শক্তি থেকে শুরু করে অজানা প্রাকৃতিক শক্তির কথাও বলেছে। সমস্যা হলো- পাথর যে সত্যিই নড়ে, তার প্রমাণ মাটিতে দেখা গেলেও কিন্তু নড়ার মুহূর্তটি কেউ সরাসরি ধরতে পারছিল না!
এর একটা বড় কারণ পাথরগুলোর ‘অলসতা’। তারা নিয়মিত চলাচল করে না। কোনো পাথর বছরের পর বছর, এমনকি এক দশকের বেশি সময় একই জায়গায় পড়ে থাকতে পারে। ফলে কয়েক দিন ক্যামেরা বসিয়ে অপেক্ষা করলেই রহস্যের জট খুলে যাবে- ব্যাপারটা এমন ছিল না।
তারপর এলো ২০১৩ সালের সেই শীত
২০১১ সালে রিচার্ড নরিস, জেমস নরিস ও তাদের সহযোগীরা নতুনভাবে অনুসন্ধান শুরু করেন। রেসট্র্যাক প্লায়ায় বসানো হয় অত্যন্ত সংবেদনশীল আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ যন্ত্র ও টাইমল্যাপস ক্যামেরা। পার্কের আসল পাথর পরিবর্তন করার অনুমতি না থাকায় বাইরে থেকে আনা ১৫টি পাথরের সঙ্গে লাগানো হয় চলাচল শনাক্ত করতে সক্ষম জিপিএস ডিভাইস। গবেষকেরা ভেবেছিলেন, ফল পেতে হয়তো পাঁচ থেকে দশ বছর অপেক্ষা করতে হবে।
কিন্তু অপেক্ষা অতটা দীর্ঘ হয়নি। ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে রিচার্ড ও জেমস নরিস রেসট্র্যাকে গিয়ে দেখেন, বৃষ্টির পানি জমে শুকনো হ্রদতলের ওপর তৈরি হয়েছে অগভীর একটি জলাশয়। রাতের প্রচণ্ড ঠান্ডায় তার ওপর পাতলা বরফ জমল। পরদিন সূর্যের তাপে বরফ গলতে শুরু করলে সেটি ভেঙে বড় বড় পাতলা খণ্ডে পরিণত হয়।

এরপর হালকা বাতাস বইতেই বরফের সেই ভাসমান পাতগুলো ধীরে ধীরে এগিয়ে যেতে থাকে। সামনে থাকা পাথরের গায়ে চাপ দিয়ে সেগুলোকেও ঠেলে নেয় সঙ্গে। নিচে তখন পিচ্ছিল কাদা। ফলে যে পাথরকে শুকনো অবস্থায় প্রায় অচল মনে হয়, সেটিই ধীরে ধীরে মাটির ওপর সরে যেতে পারে। পেছনে তৈরি হয় পরিচিত সেই দীর্ঘ দাগ!
২০১৪ সালে প্রকাশিত পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, প্রায় ৩-৬ মিলিমিটার পুরু বরফের পাত এবং ঘণ্টায় আনুমানিক ১৪-১৮ কি.মি. গতির হালকা বাতাসই যথেষ্ট পাথর সরানোর জন্য। পর্যবেক্ষণে থাকা পাথরগুলো সাধারণত মিনিটে কয়েক মিটার করে এগিয়েছে! ২০১৪ সালের ৯ জানুয়ারি গবেষকেরা এমনকি চোখের সামনে একটি পাথরকে প্রায় ১৮ সেকেন্ড ধরে সরতেও দেখেন। বহু দশকের অনুসন্ধানে প্রথমবারের মতো রহস্যের মূল ঘটনাটি সরাসরি পর্যবেক্ষণ ও নথিবদ্ধ হলো এরপর।
যে মরুভূমিতে বরফই পাথর চালায়
সেইলিং স্টোনস রহস্যের সবচেয়ে চমৎকার ব্যাপারটি এখানেই যে ডেথ ভ্যালির মতো প্রচণ্ড গরম ও শুষ্ক এলাকার সবচেয়ে বিখ্যাত রহস্যগুলোর একটির পেছনে শেষ পর্যন্ত পাওয়া গেল শীতের পানি ও বরফকে। আজকের দিনে রেসট্র্যাক প্লায়ার পাথরগুলো আর মানুষকে অতিপ্রাকৃত কোনো শক্তির ভয় দেখায় না। বরং এগুলো আমাদের দেখিয়েছে- প্রকৃতির বিস্ময় তৈরি করতে সব সময় কোনো বিশাল শক্তির প্রয়োজন হয় না। কখনো কয়েক মিলিমিটার বরফ, সামান্য পানি আর হালকা বাতাসই কয়েকশ কিলোগ্রামের পাথরের পেছনে এমন এক পথ এঁকে দিতে পারে, যা মানুষকে শতাব্দীর পর শতাব্দী ভাবনার জগতে ডুবিয়ে রাখতে সক্ষম!
ফিচার ইমেজ: Mark Newman/Getty Images
রেফারেন্স
- Mystery Solved: Mysterious “Sailing Stones” of Death Valley Seen in Action for the First Time – August 27, 2014 – U.S. National Park Service
- Solved: Mystery of Moving Stones in Death Valley – August 28, 2014 – TIME
- Researchers Solve the Mystery of Death Valley’s Sailing Rocks – August 28, 2014 – Smithsonian Magazine
- Racetrack Playa: The Home of Death Valley’s Mysterious ‘Sailing Stones’ – August 23, 2024 – Live Science