Skip to main content

Ridge Bangla

পিঁপড়াকে ‘জম্বি’ বানায় যে ছত্রাক!

ঘন গ্রীষ্মমণ্ডলীয় বনের মাটির কাছাকাছি কোনো পাতার নিচে চোখ রাখলে কখনো কখনো অদ্ভুত একটি দৃশ্য দেখা যেতে পারে। একটি মৃত পিঁপড়া পাতার শিরা কামড়ে এমন শক্তভাবে আটকে আছে যে মৃত্যুর পরও তার চোয়াল খুলে যায়নি! মাথার পেছন থেকে বেরিয়ে এসেছে সরু, বাদামি রঙের একটি দণ্ডের মতো অংশ! দেখে মনে হতে পারে, কোনো ক্ষুদ্র গাছ যেন মৃত পিঁপড়ার শরীর ফুঁড়ে জন্ম নিয়েছে! বাস্তবে সেটি গাছ না, ছত্রাক! আর পিঁপড়াটিও ঘটনাচক্রে সেখানে মারা যায়নি। মৃত্যুর ঠিক আগে তাকে ওই জায়গায় পৌঁছাতে বাধ্য করেছিল তার নিজের শরীরের ভেতরে বেড়ে ওঠা পরজীবী ছত্রাক!

এই কারণেই ওফিওকর্ডিসেপস ইউনিল্যাটারালিস (Ophiocordyceps unilateralis) গোষ্ঠীর ছত্রাকগুলো পরিচিত ‘জম্বি অ্যান্ট ফাঙ্গাস’ নামে। নামের মধ্যে সাইফাই ভাইব থাকলেও ঘটনাটি পুরোপুরি বাস্তব। ছত্রাকটি কিছু কার্পেন্টার অ্যান্টকে সংক্রমিত করে, তাদের স্বাভাবিক আচরণ বদলে দেয় এবং শেষ পর্যন্ত মৃত পিঁপড়ার শরীরকেই নিজের বংশবিস্তারের মঞ্চে পরিণত করে।

শুরু হয় একটি ক্ষুদ্র স্পোর থেকে

একটি কর্মী পিঁপড়া খাবারের সন্ধানে কলোনি থেকে বেরিয়েছে। বনজুড়ে হাঁটার সময় তার শরীরে এসে পড়ে ওফিওকর্ডিসেপসের একটি স্পোর। সেখান থেকেই এই অদ্ভুত প্রক্রিয়ার শুরু।

স্পোরটি প্রথমে পিঁপড়ার দেহের শক্ত বহিঃআবরণে আটকে যায়। এরপর এনজাইম ও যান্ত্রিক চাপ ব্যবহার করে সেই আবরণ ভেদ করে শরীরের ভেতরে প্রবেশ করে। ধীরে ধীরে ছত্রাকের কোষ পিঁপড়ার শরীরের বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে পড়ে এবং তার পুষ্টি ব্যবহার করে বাড়তে থাকে। বাইরে থেকে তখনো হয়তো পিঁপড়াটিকে প্রায় স্বাভাবিকই দেখায়। কিন্তু সংক্রমণ একটি নির্দিষ্ট পর্যায়ে পৌঁছালে আচরণ বদলাতে শুরু করে।

Image courtesy: David Hughes, Penn State University
Image courtesy: David Hughes, Penn State University

সুস্থ পিঁপড়া সাধারণত রাসায়নিক সংকেত বা ফেরোমোনের পথ অনুসরণ করে অত্যন্ত সংগঠিতভাবে চলাফেরা করে। আক্রান্ত পিঁপড়া সেই নিয়ম থেকে সরে যায়। তার চলাফেরা অস্বাভাবিক হয়ে ওঠে, কখনো উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘোরাফেরা করে, কখনো গাছপালা বেয়ে ওপরে উঠতে শুরু করে। অবশেষে সে এমন একটি জায়গায় পৌঁছায়, যেখানে তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা ছত্রাকের বেড়ে ওঠার জন্য সুবিধাজনক। তারপর ঘটে সবচেয়ে বিখ্যাত ঘটনাটি। পিঁপড়াটি কোনো পাতা, ডাল বা উদ্ভিদের অংশ শক্ত করে কামড়ে ধরে। গবেষকেরা একে বলেন ‘ডেথ গ্রিপ’, অর্থাৎ মৃত্যুর আগের চূড়ান্ত কামড়। এরপর পিঁপড়াটি মারা যায়। কিন্তু ছত্রাকের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্ব তখনো বাকি।

মৃত পিঁপড়াই হয়ে ওঠে ছত্রাকের ‘লঞ্চিং প্যাড’

পিঁপড়া মারা যাওয়ার পর ছত্রাক তার শরীরের ভেতরে আরও বাড়তে থাকে। কয়েক দিনের মধ্যে মাথার পেছনের দিক দিয়ে বেরিয়ে আসে ছত্রাকের প্রজনন কাঠামো। সেখান থেকে নতুন স্পোর নিচে ছড়িয়ে পড়ে। মাটিতে সরাসরি মরে পড়ে থাকলে ছত্রাকের স্পোর কার্যকরভাবে ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ কমে যেত। কিন্তু কিছুটা উঁচু অবস্থানে ঝুলে থাকা মৃত পিঁপড়ার শরীর থেকে স্পোর নিচের এলাকায় ছড়িয়ে পড়তে পারে, যেখানে অন্য কর্মী পিঁপড়ার চলাচলের সম্ভাবনা থাকে। নতুন পিঁপড়া সংক্রমিত হলে আবার শুরু হয় একই চক্র।

জীববিজ্ঞানের ভাষায় এমন ঘটনাকে এক্সটেন্ডেড ফেনোটাইপের একটি নাটকীয় উদাহরণ হিসেবে দেখা হয়। সহজ করে বললে, পরজীবীর জিনের প্রভাব শুধু তার নিজের শরীরে সীমাবদ্ধ নেই, আক্রান্ত প্রাণীর আচরণেও যেন তার ছাপ দেখা যাচ্ছে।

কিন্তু ছত্রাক কি সত্যিই পিঁপড়ার মস্তিষ্ক দখল করে?

দীর্ঘদিন ‘জম্বি অ্যান্ট’ নিয়ে এমন ভাষায় লেখালেখি হয়েছে যেন ছত্রাক সরাসরি পিঁপড়ার মস্তিষ্কে ঢুকে তার স্নায়ুতন্ত্রের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়! কিন্তু পেন স্টেটের গবেষকেরা আক্রান্ত পিঁপড়ার শরীর অত্যন্ত হাই রেজল্যুশনে পরীক্ষা করে ভিন্ন এক চিত্র পান। তারা দেখেন, ছত্রাকের কোষ পিঁপড়ার মাথা, বুক, পেট ও পায়ের পেশিসহ প্রায় পুরো শরীরজুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে। এমনকি অনেক ছত্রাক কোষ একে অন্যের সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে একধরনের নেটওয়ার্ক তৈরি করেছে। অথচ পিঁপড়ার মস্তিষ্কের ভেতরে ছত্রাকের কোষ পাওয়া যায়নি। মস্তিষ্কের চারপাশ পর্যন্ত ছত্রাক পৌঁছালেও সেটিকে সরাসরি গ্রাস করেনি।

Image Courtesy: Wikimedia Commons
Image Courtesy: Wikimedia Commons

একটি সম্ভাবনা হলো, ছত্রাক পিঁপড়ার পেশিকে সরাসরি প্রভাবিত করার পাশাপাশি নানা রাসায়নিক পদার্থ নিঃসরণ করে স্নায়ুতন্ত্র ও আচরণে পরিবর্তন ঘটায়। আক্রান্ত পিঁপড়ার মস্তিষ্কে নিউরোমডুলেটরি রাসায়নিক, শক্তি ব্যবহারের ধরন এবং স্ট্রেস-সম্পর্কিত পরিবর্তনের প্রমাণও পাওয়া গেছে। কিন্তু ঠিক কোন রাসায়নিক সংকেত কোন আচরণ ঘটায়, সেই পুরো প্রক্রিয়া এখনো বিজ্ঞানীরা উন্মোচন করতে পারেননি।

ডেথ গ্রিপ এত শক্ত কেন?

জম্বি পিঁপড়ার সবচেয়ে অস্বাভাবিক বৈশিষ্ট্যের একটি হলো মৃত্যুর পরও পাতায় শক্তভাবে কামড়ে থাকা। গবেষণায় দেখা গেছে, আক্রান্ত পিঁপড়ার চোয়াল চালানো পেশিগুলোতে ছত্রাক ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। এসব পেশিতে অস্বাভাবিক সংকোচনের চিহ্ন পাওয়া গেছে। একই সঙ্গে মোটর নিউরন ও পেশি-স্নায়ুর সংযোগের গুরুত্বপূর্ণ অংশ কিছুটা অক্ষত থাকতে পারে। ফলে মৃত্যুর ঠিক আগে পিঁপড়াটি এমন শক্ত কামড় দিতে পারে যা পরে আর শিথিল হয় না।

এটি ছত্রাকের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মৃত পিঁপড়া যদি নিচে পড়ে যায়, তবে নির্দিষ্ট আর্দ্রতা বা অবস্থান হারিয়ে ছত্রাকের প্রজনন ব্যাহত হতে পারে। এই পুরো ব্যবস্থার সূক্ষ্মতা বোঝাতেই গবেষক ডেভিড হিউজ একে এমন এক ব্যবস্থার সঙ্গে তুলনা করেছেন, যেখানে পুতুলনাচের শিল্পী সুতা ধরে পুতুলের অঙ্গ নড়াচড়া করান। পার্থক্য হলো, এখানে কোনো মস্তিষ্কসম্পন্ন পরিচালক নেই। আছে এক ক্ষুদ্র ছত্রাক এবং লক্ষ লক্ষ বছরের বিবর্তনে তৈরি জৈব কৌশল।

এই অদ্ভুত লড়াই কিন্তু নতুন কিছু না

মানুষ ‘জম্বি অ্যান্ট’ নিয়ে সাম্প্রতিককালে ব্যাপক আগ্রহী হলেও প্রকৃতিতে ঘটনাটি বেশ পুরনো। পিঁপড়ার এই অস্বাভাবিক আচরণের বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণের ইতিহাস উনিশ শতক পর্যন্ত পাওয়া যায়। পেন স্টেটের তথ্যানুযায়ী, প্রকৃতিবিদ আলফ্রেড রাসেল ওয়ালেস ১৮৫৯ সালে এ ধরনের ঘটনা নথিবদ্ধ করেন। এমনকি জীবাশ্ম পাতায় পাওয়া বিশেষ ধরনের কামড়ের চিহ্ন থেকে বিজ্ঞানীরা ধারণা করেন, পিঁপড়া ও আচরণ-নিয়ন্ত্রণকারী ছত্রাকের এই বিবর্তনীয় সংঘাত অন্তত কয়েক কোটি বছর পুরনো হতে পারে।

O. unilateralis থেকে নিঃসৃত রাসায়নিক পদার্থের কারণে পিঁপড়ার আচরণ নিয়ন্ত্রণের প্রক্রিয়ার চিত্র; Image courtesy: Wikimedia Commons
O. unilateralis থেকে নিঃসৃত রাসায়নিক পদার্থের কারণে পিঁপড়ার আচরণ নিয়ন্ত্রণের প্রক্রিয়ার চিত্র; Image courtesy: Wikimedia Commons

বিভিন্ন প্রজাতির পিঁপড়ার জন্য বিশেষায়িত ভিন্ন ভিন্ন ছত্রাক রয়েছে। লাইব্রেরি অব কংগ্রেসের ২০২৪ সালের সংকলন অনুযায়ী, পিঁপড়ার আচরণ বদলাতে সক্ষম অন্তত ৩৫টি ওফিওকর্ডিসেপস প্রজাতি তখন পর্যন্ত পরিচিত ছিল, এবং প্রকৃত সংখ্যা আরও অনেক বেশি হতে পারে।

যে ছত্রাক পিঁপড়াকে পরজীবী হিসেবে ব্যবহার করে, সেই ছত্রাককেও আক্রমণ করতে পারে আরেক ধরনের পরজীবী ছত্রাক! এদের বলা হয় হাইপারপ্যারাসাইট, অর্থাৎ পরজীবীর পরজীবী। এসব ছত্রাক ওফিওকর্ডিসেপসের প্রজনন কাঠামো আক্রমণ করে তার স্পোর উৎপাদন বা ছড়িয়ে পড়ার ক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে।

মানুষেরও কি এমন ‘জম্বি’ হওয়ার ভয় আছে?

‘দ্য লাস্ট অব আস’-এর মতো জনপ্রিয় টিভি সিরিজ ও নানা সিনেমার কারণে এমন প্রশ্ন অনেকের মনেই আসতে পারে- বাস্তবের এই ছত্রাক কি একদিন মানুষকেও একইভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে? বর্তমান বৈজ্ঞানিক জ্ঞান অনুযায়ী, উত্তর নেতিবাচক।

ওফিওকর্ডিসেপসের এই আচরণ-নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কেবল নির্দিষ্ট পোকামাকড়ের সঙ্গে লক্ষ লক্ষ বছরের সহ-বিবর্তনের ফল। মানুষের শরীরের তাপমাত্রা, রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা, স্নায়ুতন্ত্র ও সামগ্রিক শারীরবৃত্ত পিঁপড়ার তুলনায় সম্পূর্ণ ভিন্ন। এমনকি ওফিওকর্ডিসেপসের অনেক প্রজাতি একধরনের পিঁপড়ার আচরণ নিয়ন্ত্রণ করতে পারলেও অন্য প্রজাতির পিঁপড়ার ক্ষেত্রে সেটি পারে না। তাই পিঁপড়া থেকে সরাসরি মানুষের ‘জম্বি সংক্রমণ’ বৈজ্ঞানিক বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না।

তারপরও বলতেই হবে যে জম্বি অ্যান্ট ফাঙ্গাসের মতো ক্ষুদ্র এই ছত্রাক দেখিয়ে দেয়, বিবর্তন একটি জীবকে অন্য জীবের আচরণ পর্যন্ত নিজের বেঁচে থাকার কৌশলের অংশ করে তুলতে পারে! এখানে আছে প্রজন্মান্তরে ন্যাচারাল সিলেকশনের মাধ্যমে তৈরি হওয়া এমন এক সম্পর্ক, যেখানে একটি পিঁপড়ার শেষ হাঁটা, শেষবার গাছে ওঠা, এমনকি শেষ কামড়টিও শুধু তার নিজের জীবনের ঘটনা থাকে না। মৃত পিঁপড়াটি পাতার নিচে ঝুলে থাকে। তার শরীর থেকে জন্ম নেয় নতুন ছত্রাক। স্পোর আবার নিচে নামে। আর বনের প্রাকৃতিক পরিবেশে মিলিয়ন মিলিয়ন বছরের সেই পুরনো খেলা আবার শুরু হয়।

ফিচার ইমেজ: Oliver Thompson-Holmes/Alamy

রেফারেন্স

This post was viewed: 8

আরো পড়ুন