Skip to main content

Ridge Bangla

আটলান্টিকের ভূতুড়ে জাহাজ মেরি সেলেস্ট রহস্য: জাহাজটি ফিরেছিল, মানুষগুলো আর ফেরেনি!

১৮৭২ সালের ৪ ডিসেম্বর। আটলান্টিক মহাসাগরে আজোরেস দ্বীপপুঞ্জের পূর্বে এগিয়ে চলেছে কানাডীয় ব্রিগ্যান্টাইন দেই গ্রাটিয়া। একসময় দূরে আরেকটি জাহাজ নজরে এলো। অস্বাভাবিকভাবে চলছে সেটি। কখনো বাতাসের দিকে মুখ ঘুরছে, আবার পথ হারিয়ে সরে যাচ্ছে। কোনো সংকেত নেই, ডেকে কোনো মানুষও দেখা যাচ্ছে না।

ক্যাপ্টেন ডেভিড মোরহাউস কাছাকাছি গিয়ে জাহাজটিকে চিনতে পারলেন। সেটি মেরি সেলেস্ট। নিউইয়র্ক থেকে ইতালির জেনোয়ার উদ্দেশে রওনা হয়েছিল তার জাহাজের কয়েক দিন আগেই। মোরহাউসের লোকেরা ছোট নৌকায় চেপে জাহাজটিতে উঠলেন। তারপর যে দৃশ্য দেখলেন, তা পরবর্তী দেড় শতাব্দীর সবচেয়ে বিখ্যাত সামুদ্রিক রহস্যগুলোর একটির জন্ম দেয়।

জাহাজটি ডুবে যায়নি। মালামালের বড় অংশ ঠিক আছে। খাবার ও পানি আছে। ক্রুদের পোশাক ও ব্যক্তিগত জিনিসপত্রও পড়ে আছে। অথচ ক্যাপ্টেন, তাঁর স্ত্রী ও দুই বছরের শিশুকন্যাসহ জাহাজে থাকা ১০ জন মানুষের একজনও নেই! জাহাজের ছোট নৌকাটিও উধাও।

তাদের আর কখনো খুঁজে পাওয়া যায়নি…

যে জাহাজের নাম একসময় ছিল অ্যামাজন

মেরি সেলেস্ট তৈরি হয়েছিল ১৮৬১ সালে, কানাডার নোভা স্কশিয়ার স্পেনসার্স আইল্যান্ডে। তখন তার নাম ছিল অ্যামাজন। পরে মালিকানা বদল, দুর্ঘটনা ও মেরামতের পর ১৮৬৮ সালে জাহাজটি যুক্তরাষ্ট্রে নিবন্ধিত হয় এবং নতুন নাম পায় মেরি সেলেস্ট।

১৮৭২ সালে বড় ধরনের সংস্কারের পর এর দৈর্ঘ্য দাঁড়ায় প্রায় ১০৩ ফুট এবং ধারণক্ষমতা প্রায় ২৮২ গ্রস টন। একই বছর জাহাজটির অংশীদার এবং ক্যাপ্টেন হন অভিজ্ঞ নাবিক বেঞ্জামিন স্পুনার ব্রিগস।

৭ নভেম্বর ১৮৭২; নিউইয়র্ক থেকে জেনোয়ার উদ্দেশে রওনা হয় মেরি সেলেস্ট। কার্গো ছিল ১,৭০১ ব্যারেল অ্যালকোহল, যা ইতালিতে নেওয়া হচ্ছিল। ক্যাপ্টেন ব্রিগসের সঙ্গে ছিলেন তাঁর স্ত্রী সারাহ এবং দুই বছরের মেয়ে সোফিয়া। জাহাজ পরিচালনায় ছিলেন সাতজন ক্রু। সব মিলিয়ে ১০ জন মানুষ।

Image source: Keystone / Stringer / Getty Images

রয়্যাল মিউজিয়ামস গ্রিনিচের রেকর্ড অনুযায়ী- ক্রুদের মধ্যে ছিলেন ফার্স্ট মেট অ্যালবার্ট রিচার্ডসন, সেকেন্ড মেট অ্যান্ড্রু গিলিং, স্টুয়ার্ড উইলিয়াম হেড এবং আরও চার নাবিক। ক্যাপ্টেন ব্রিগসকে সমসাময়িক বর্ণনায় অভিজ্ঞ ও দায়িত্বশীল নাবিক হিসেবেই পাওয়া যায়।

প্রথমদিকে যাত্রায় অস্বাভাবিক কিছু ঘটেছে বলে জানা যায় না। কিন্তু আটলান্টিক পাড়ি দেওয়ার সময় জাহাজটি খারাপ আবহাওয়ার মুখে পড়ে। মেরি সেলেস্টের শেষ পরিচিত লগ এন্ট্রি লেখা হয় ২৫ নভেম্বর সকালে। তখন জাহাজটি আজোরেসের সান্তা মারিয়া দ্বীপের কাছাকাছি ছিল।

এরপর লগ বুকে আর কিছু লেখা হয়নি।

মেরি সেলেস্টে আসলে কী পাওয়া গিয়েছিল?

মেরি সেলেস্টকে নিয়ে প্রায়ই বলা হয়, জাহাজটি যেন কয়েক মিনিট আগপর্যন্তও জীবনযাপনের স্বাভাবিক ছন্দে ছিল! টেবিলে নাকি গরম খাবার পড়ে ছিল, চায়ের কাপ রাখা ছিল, অথচ মানুষগুলো হঠাৎ কর্পূরের মতো মিলিয়ে যায়!

সমসাময়িক তদন্তে অবশ্য এমন কোনো ঘটনার প্রমাণ পাওয়া যায় না।

Benjamin Briggs
মেরি সেলেস্টের ক্যাপ্টেন বেঞ্জামিন ব্রিগস; Image source: Wikimedia Commons

দেই গ্রাটিয়ার অলিভার ডেভো ও অন্যরা জাহাজে উঠে দেখেছিলেন, কিছু পাল তখনও খোলা থাকলেও পাল ও রিগিংয়ের কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত অবস্থায় আছে। কার্গো হ্যাচের কয়েকটি খোলা ছিল। জাহাজের দুটি পাম্পের একটিকে আংশিকভাবে খুলে রাখা হয়েছিল। পাশে পাওয়া যায় ‘সাউন্ডিং রড’, যা জাহাজের ভেতরে জমে থাকা পানির গভীরতা মাপতে ব্যবহৃত হয়। হোলে প্রায় সাড়ে তিন ফুট পানি ছিল বলে পরবর্তী বিবরণে উঠে আসে।

তবু জাহাজটি চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েনি। সেটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। দেই গ্রাটিয়ার মাত্র তিনজন নাবিক পরে মেরি সেলেস্ট চালিয়ে কয়েকশ নটিক্যাল মাইল দূরের জিব্রাল্টার পর্যন্ত নিয়ে যান।

ক্রুদের অধিকাংশ ব্যক্তিগত জিনিসও জাহাজে ছিল। কিন্তু ক্যাপ্টেনের নেভিগেশন যন্ত্রপাতি ও জাহাজের গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র পাওয়া যায়নি। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অনুপস্থিত বস্তুটি হলো জাহাজের ছোট নৌকা। অর্থাৎ মানুষগুলো সম্ভবত জাহাজ থেকে নিজেরাই নেমেছিল। প্রশ্ন হলো, কেন?

খুন, বিদ্রোহ নাকি লুটপাট?

১৩ ডিসেম্বর মেরি সেলেস্ট জিব্রাল্টারে পৌঁছানোর পর উদ্ধার-অধিকার নিয়ে বিচারিক প্রক্রিয়া শুরু হয়। ১৭ ডিসেম্বর শুরু হওয়া শুনানি চলে পরের বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন জিব্রাল্টারের অ্যাটর্নি জেনারেল ফ্রেডেরিক সলি-ফ্লাড।

তাঁর সন্দেহ ছিল, জাহাজে অপরাধ ঘটে থাকতে পারে। ক্রুদের বিদ্রোহ, হত্যাকাণ্ড, এমনকি দেই গ্রাটিয়ার লোকজনের সংশ্লিষ্টতার সম্ভাবনাও পরীক্ষা করা হয়।

কিন্তু কোনো মৃতদেহ পাওয়া যায়নি। নিশ্চিত রক্তের দাগ বা লড়াইয়ের বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণও পাওয়া যায়নি। মূল্যবান কার্গো লুট হয়নি। ক্যাপ্টেনের পরিবারসহ সবাইকে হত্যা করে লাভবান হওয়ার মতো পরিষ্কার কোনো উদ্দেশ্যও খুঁজে পাওয়া যায়নি।

শেষ পর্যন্ত অপরাধের তত্ত্ব প্রমাণিত হয়নি। আদালত দেই গ্রাটিয়ার উদ্ধারকারী পক্ষকে অর্থ দেয়, যদিও প্রত্যাশার তুলনায় পরিমাণ কম ছিল।

তাহলে কি অ্যালকোহলের ব্যারেলই রহস্যের চাবি?

পরবর্তীতে মেরি সেলেস্টের কার্গো জেনোয়ায় খালাস করার সময় দেখা যায়- ১,৭০১ ব্যারেলের মধ্যে নয়টি খালি।

একটি বহুল আলোচিত ব্যাখ্যা হলো, কয়েকটি ব্যারেল থেকে অ্যালকোহল চুইয়ে বাষ্প তৈরি হয়েছিল। এতে ক্যাপ্টেন ব্রিগস হয়তো বিস্ফোরণের আশঙ্কা করেছিলেন। এমন পরিস্থিতিতে সতর্কতামূলকভাবে সবাইকে ছোট নৌকায় নামিয়ে মেরি সেলেস্ট থেকে কিছুটা দূরে অবস্থান করার সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব।

তবে এ তত্ত্বেরও বড় সমস্যা আছে। উদ্ধারকারী নাবিকেরা বিস্ফোরণ বা আগুনের চিহ্ন পাননি। মূল হ্যাচও এমনভাবে উড়ে যায়নি যা বড় বিস্ফোরণের ইঙ্গিত দেয়। নয়টি ব্যারেল খালি থাকলেও তা ভয়াবহ দুর্ঘটনার প্রমাণ নয়। কিছু গবেষণায় ব্যারেলের কাঠের প্রকৃতির কারণে তরল চুইয়ে বেরিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

আরও বাস্তবসম্মত একটি ব্যাখ্যা সামনে আসে জাহাজের পাম্পের অবস্থা থেকে।

২০০০-এর দশকে ডকুমেন্টারি নির্মাতা অ্যান ম্যাকগ্রেগর এবং উডস হোল ওশানোগ্রাফিক ইনস্টিটিউশনের সমুদ্রবিজ্ঞানী ফিল রিচার্ডসন ঐতিহাসিক আবহাওয়া ও নৌপথের তথ্য ব্যবহার করে ঘটনাটি পুনর্বিবেচনা করেন। তাঁদের বিশ্লেষণে উঠে আসে, আগের যাত্রার কয়লার ধুলা ও জাহাজ সংস্কারের আবর্জনা পাম্পের কার্যকারিতা ব্যাহত করে থাকতে পারে। একটি পাম্প খুলে রাখা পাওয়াও এই ধারণার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

ব্রিগস যদি নির্ভরযোগ্যভাবে বুঝতে না পারেন জাহাজের ভেতরে ঠিক কতটা পানি ঢুকছে, তার সঙ্গে কয়েক দিনের খারাপ আবহাওয়া ও কার্গো নিয়ে উদ্বেগ যোগ হলে পরিস্থিতিকে বাস্তবের চেয়ে বিপজ্জনক মনে হতে পারে।

শেষ লগ এন্ট্রির সময় তারা সান্তা মারিয়া দ্বীপের কাছাকাছি ছিল। ফলে স্থলভাগ চোখে পড়ার মতো দূরত্বে থাকলে সাময়িকভাবে জাহাজ ছাড়ার সিদ্ধান্ত তাঁর কাছে যুক্তিসঙ্গত মনে হয়ে থাকতে পারে।

সমস্যা হলো, জাহাজ ছাড়ার পর কিছু একটা ভুল হয়ে যায়।

ছোট নৌকাটি হয়তো মেরি সেলেস্টের সঙ্গে দড়িতে বাঁধা ছিল। উত্তাল সমুদ্রে সেই দড়ি ছিঁড়ে গেলে অথবা আবহাওয়া দ্রুত খারাপ হলে খোলা আটলান্টিকে একটি ছোট নৌকায় থাকা ১০ জন মানুষের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা দ্রুত কমে যেত। আর মানুষবিহীন মেরি সেলেস্ট বাতাসে ভেসে আবার দূরে চলে যেতে পারত।

এই ব্যাখ্যা বর্তমানে তুলনামূলকভাবে বিশ্বাসযোগ্য মনে করা হলেও এটাও প্রমাণিত সত্য নয়। কোনো প্রত্যক্ষদর্শী বেঁচে ছিলেন না। লাইফবোটও কখনো পাওয়া যায়নি।

যেভাবে সত্যের জায়গা দখল করল কিংবদন্তি

মেরি সেলেস্টের রহস্য আরও বড় হওয়ার পেছনে সমুদ্র যতটা দায়ী, সাহিত্যও কম নয়। ১৮৮৪ সালে তরুণ আর্থার কোনান ডয়েল The Cornhill Magazine-এ প্রকাশ করেন ছোটগল্প J. Habakuk Jephson’s Statement। বাস্তব মেরি সেলেস্টকে ভিত্তি করলেও গল্পে তিনি বহু তথ্য বদলে দেন। এমনকি জাহাজের নামও লিখেছিলেন Marie Celeste

গল্পটি এত বিশ্বাসযোগ্য ভঙ্গিতে লেখা হয়েছিল যে অনেক পাঠক এর কাল্পনিক ঘটনাকেও বাস্তব বলে ধরে নেন। পরবর্তী সংবাদপত্র, বই, সিনেমা ও জনপ্রিয় সংস্কৃতি সেই বিভ্রান্তিকে আরও বাড়িয়েছে।

জাহাজটির শেষ পরিণতি

মজার ব্যাপার হলো, ১৮৭২ সালের ঘটনার পরও মেরি সেলেস্ট আরও এক যুগ সমুদ্রে চলেছিল। শেষ পর্যন্ত ১৮৮৫ সালে ক্যাপ্টেন গিলম্যান পার্কার হাইতির কাছে জাহাজটিকে ইচ্ছাকৃতভাবে প্রবালপ্রাচীরে তুলে দেন। উদ্দেশ্য ছিল অতিমূল্যায়িত কার্গোর বিপরীতে বিমার অর্থ আদায় করা। ষড়যন্ত্রটি ধরা পড়ে এবং সেখানেই মেরি সেলেস্টের কার্যত সমুদ্রযাত্রার সমাপ্তি ঘটে।

কিন্তু ১৮৭২ সালের ১০ জন মানুষের ভাগ্যে কী ঘটেছিল, সেই রহস্য আজও উন্মোচিত হয়নি।

ফিচার ইমেজ: Vocal Media

তথ্যসূত্র

This post was viewed: 44

আরো পড়ুন