Skip to main content

Ridge Bangla

হারিয়ে যাওয়া আটলান্টিস: ২,৪০০ বছর ধরে যে শহরকে খুঁজছে মানুষ

এই লেখার শুরুতেই চলুন কল্পনার রাজ্য থেকে ঘুরে আসা যাক।

সমুদ্রের ওপারে আছে এক বিপুল সমৃদ্ধ দ্বীপরাজ্য। শহরের কেন্দ্র ঘিরে রয়েছে একের পর এক বৃত্তাকার জলপথ ও ভূমির বলয়। মন্দিরে সোনা, রুপা ও হাতির দাঁতের অলংকরণ, বিস্তৃত বন্দর, শক্তিশালী নৌবহর, উর্বর কৃষিজমি, অসীম সম্পদ। এত শক্তিশালী সেই রাষ্ট্র যে একসময় ইউরোপ ও উত্তর আফ্রিকার বড় অংশও দখল করতে উদ্যত হয়।

তারপর আসে বিপর্যয়। ভয়ংকর ভূমিকম্প ও বন্যায় মাত্র এক দিনে পুরো দ্বীপটি সমুদ্রের নিচে চলে যায়।

এই হলো আটলান্টিসের গল্প। প্রায় ২,৪০০ বছর ধরে যার অবস্থান খুঁজতে মানুষ আটলান্টিক মহাসাগর থেকে ভূমধ্যসাগর, স্পেনের উপকূল থেকে সান্তোরিনি, এমনকি অ্যান্টার্কটিকা পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। সমস্যা একটাই। এত অনুসন্ধানের পরও আটলান্টিস নামে কোনো হারানো সভ্যতার গ্রহণযোগ্য প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

আরও বড় সমস্যা হলো, এই বিস্ময়কর রাজ্যের কথা যে প্রাচীন লেখক আমাদের জানিয়েছেন, তিনি কোনো ইতিহাসবিদ না। তিনি গ্রিক দার্শনিক প্লেটো।

আদৌ কি আটলান্টিস নামে কিছু ছিল এই পৃথিবীতে?

রহস্যের শুরু প্লেটোর হাত ধরে

আটলান্টিসের পরিচিত গল্পের উৎস প্লেটোর দুটি সংলাপ, ‘টাইমিয়াস’ এবং ‘ক্রিটিয়াস’। এগুলো লেখা হয়েছিল খ্রিষ্টপূর্ব চতুর্থ শতকে, সাধারণভাবে ৩৬০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দের কাছাকাছি সময়ের রচনা হিসেবে ধরা হয়। এর আগে কোনো টিকে থাকা প্রাচীন উৎসে আটলান্টিসের বিস্তারিত ইতিহাস পাওয়া যায় না। আধুনিক গবেষণাতেও এটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংকেত।

আথানাসিয়াস কির্শারের আটলান্টিসের মানচিত্র, যেখানে তিনি আটলান্টিসকে আটলান্টিক মহাসাগরের মাঝখানে দেখিয়েছেন। মানচিত্রটি ১৬৬৯ সালে আমস্টারডামে প্রকাশিত তাঁর Mundus Subterraneus গ্রন্থ থেকে নেওয়া। এখানে মানচিত্রটি এমনভাবে আঁকা হয়েছে, যেখানে দক্ষিণ দিক ওপরে রাখা হয়েছে; Image source: Wikimedia Commons
আথানাসিয়াস কির্শারের আটলান্টিসের মানচিত্র, যেখানে তিনি আটলান্টিসকে আটলান্টিক মহাসাগরের মাঝখানে দেখিয়েছেন। মানচিত্রটি ১৬৬৯ সালে আমস্টারডামে প্রকাশিত তাঁর Mundus Subterraneus গ্রন্থ থেকে নেওয়া। এখানে মানচিত্রটি এমনভাবে আঁকা হয়েছে, যেখানে দক্ষিণ দিক ওপরে রাখা হয়েছে; Image source: Wikimedia Commons

প্লেটো অবশ্য গল্পটি নিজের বানানো বলে সরাসরি উপস্থাপন করেননি। ‘টাইমিয়াস’-এ চরিত্র ক্রিটিয়াস জানান, গল্পটি তিনি ছোটবেলায় বয়োজ্যেষ্ঠ ক্রিটিয়াসের কাছ থেকে শুনেছিলেন। পারিবারিক সূত্রে সেটি এসেছিল বিখ্যাত এথেনীয় আইনপ্রণেতা সোলনের কাছ থেকে।

প্লেটোর বর্ণনা অনুযায়ী, সোলন মিসরের সাইস শহরে গিয়ে সেখানকার পুরোহিতদের কাছ থেকে এই প্রাচীন ঘটনার কথা জানতে পারেন। অর্থাৎ গল্পটির বর্ণিত যাত্রাপথ দাঁড়ায় মিসরীয় পুরোহিত থেকে সোলন, সোলন থেকে ড্রপিডিসের পরিবার, সেখান থেকে ক্রিটিয়াস এবং অবশেষে প্লেটোর সংলাপ।

সেই মিসরীয় বর্ণনা অনুসারে, এথেন্সের সঙ্গে আটলান্টিসের যুদ্ধ হয় সোলনের সময়ের প্রায় ৯ হাজার বছর আগে। সোলন খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকের মানুষ। সংখ্যাটিকে আক্ষরিকভাবে নিলে ঘটনাটি চলে যায় প্রায় খ্রিষ্টপূর্ব দশম সহস্রাব্দে।

আটলান্টিসের অবস্থান নিয়েও প্লেটো একটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র দেন। দ্বীপটি ছিল ‘হেরাক্লিসের স্তম্ভ’-এর বাইরে। প্রাচীন গ্রিক ভূগোলে এই নাম সাধারণত বর্তমান জিব্রাল্টার প্রণালির সঙ্গে যুক্ত। প্লেটো আরও বলেন, দ্বীপটি “লিবিয়া ও এশিয়া একত্রে যত বড়”, তার চেয়েও বড় ছিল। তবে এখানে আধুনিক আফ্রিকা ও এশিয়া মহাদেশের বর্তমান আয়তন ধরে নেওয়া ভুল হবে। প্রাচীন গ্রিকদের ভৌগোলিক ধারণায় ‘লিবিয়া’ ও ‘এশিয়া’ শব্দগুলোর অর্থ অনেক সীমিত ছিল।

কেমন ছিল প্লেটোর আটলান্টিস?

‘ক্রিটিয়াস’-এ আটলান্টিসের বর্ণনা আরও বিস্তৃত হয়। সমুদ্রদেবতা পোসাইডন দ্বীপটির অধিকার পান এবং ক্লেইটো নামে এক মানব নারীর সঙ্গে তাঁর পাঁচ জোড়া যমজ পুত্র জন্ম নেয়। দশ ছেলের মধ্যে দ্বীপ ভাগ করে দেওয়া হয়। জ্যেষ্ঠ পুত্র অ্যাটলাসের নাম থেকেই দ্বীপের নাম আটলান্টিস বলে গল্পে ব্যাখ্যা করা হয়।

রাজধানীর বিন্যাস বেশ নাটকীয় ছিল। কেন্দ্রে রাজপ্রাসাদ ও পোসাইডনের মন্দির, তার চারপাশে পর্যায়ক্রমে ভূমি ও পানির বৃত্তাকার বলয়। খাল দিয়ে এগুলো সমুদ্রের সঙ্গে যুক্ত ছিল। পোসাইডনের বিশাল মন্দিরের বাইরের অংশ রুপায় মোড়ানো, চূড়া সোনায় আবৃত এবং ভেতরে সোনা, রুপা, হাতির দাঁত ও ‘ওরিচ্যালকাম’ নামে রহস্যময় এক ধাতব উপাদানের ব্যবহারের কথা লিখেছেন প্লেটো।

ইগনেশিয়াস এল. ডনেলির ১৮৮২ সালে প্রকাশিত Atlantis: The Antediluvian World গ্রন্থে আটলান্টিস সাম্রাজ্যের কথিত বিস্তৃতি দেখানো একটি মানচিত্র; Image source: Wikimedia Commons
ইগনেশিয়াস এল. ডনেলির ১৮৮২ সালে প্রকাশিত Atlantis: The Antediluvian World গ্রন্থে আটলান্টিস সাম্রাজ্যের কথিত বিস্তৃতি দেখানো একটি মানচিত্র; Image source: Wikimedia Commons

কিন্তু এই গল্পে সম্পদই আসল বিষয় নয়।

প্লেটোর আটলান্টিস প্রথমে সুশৃঙ্খল ও সংযমী ছিল। ক্রমে মানুষের অংশ তাদের দেবতাসুলভ চরিত্রকে ছাপিয়ে যায়। সম্পদের লোভ, ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষা ও সাম্রাজ্য বিস্তারের প্রবণতা বাড়তে থাকে। একসময় আটলান্টিস ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল দখল করতে অভিযান শুরু করে। বিপরীতে প্লেটোর আদর্শীকৃত প্রাচীন এথেন্স তাদের প্রতিরোধ করে।

এরপরই আসে পতন।

‘টাইমিয়াস’-এ বলা হয়, ভূমিকম্প ও বন্যার পর এক দিন ও রাতের মধ্যেই আটলান্টিস সমুদ্রে তলিয়ে যায়। কিন্তু ‘ক্রিটিয়াস’-এর সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশটি আর কখনো লেখা হয়নি, অথবা অন্তত আমাদের কাছে পৌঁছায়নি। দেবরাজ জিউস আটলান্টিসের নৈতিক অবক্ষয় দেখে দেবতাদের সমবেত করেন এবং শাস্তির সিদ্ধান্ত জানাতে যাচ্ছেন, ঠিক সেখানেই টিকে থাকা গ্রন্থটি হঠাৎ শেষ হয়ে যায়।

এই অসমাপ্ত সমাপ্তিই সম্ভবত আটলান্টিসকে আরও আলোচিত রহস্যে পরিণত করেছে।

ইতিহাস, নাকি রাজনৈতিক দর্শন?

প্লেটো কি সত্যিই কোনো হারানো সভ্যতার ইতিহাস লিখছিলেন?

আধুনিক ক্লাসিক্যাল স্টাডিজে প্রধান ব্যাখ্যাটি ভিন্ন। স্ট্যানফোর্ড এনসাইক্লোপিডিয়া অব ফিলোসফি আটলান্টিসকে প্লেটোর নিজস্ব নির্মিত মিথগুলোর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করেছে। প্লেটো তাঁর দার্শনিক রচনায় যুক্তি ব্যাখ্যা করতে প্রায়ই গল্প ও মিথ তৈরি বা রূপান্তর করতেন।

এই দৃষ্টিতে আটলান্টিস কোনো প্রাচীন প্রযুক্তিগত সুপারপাওয়ারের গোপন ইতিহাস নয়। বরং এটি ক্ষমতা, নৈতিক অবক্ষয় ও আদর্শ রাষ্ট্র নিয়ে একটি রাজনৈতিক এবং দার্শনিক পরীক্ষা।

স্যার জেরাল্ড হারগ্রিভসের আঁকা একটি চিত্রে পৌরাণিক আটলান্টিসের একটি উপসাগরে আদর্শ ও সমৃদ্ধ জীবনের দৃশ্য দেখানো হয়েছে। অনেক গবেষকের মতে, প্লেটো তাঁর দার্শনিক তত্ত্ব তুলে ধরার মাধ্যম হিসেবেই আটলান্টিসের গল্পটি তৈরি করেছিলেন।ছবি: Mary Evans Picture Library/Everett Collection
স্যার জেরাল্ড হারগ্রিভসের আঁকা একটি চিত্রে পৌরাণিক আটলান্টিসের একটি উপসাগরে আদর্শ ও সমৃদ্ধ জীবনের দৃশ্য দেখানো হয়েছে। অনেক গবেষকের মতে, প্লেটো তাঁর দার্শনিক তত্ত্ব তুলে ধরার মাধ্যম হিসেবেই আটলান্টিসের গল্পটি তৈরি করেছিলেন।
ছবি: Mary Evans Picture Library/Everett Collection

আটলান্টিস অসীম সম্পদ পেয়েছিল, তারপর ক্ষমতার নেশায় দুর্নীতিগ্রস্ত হয়েছিল। তার বিপরীতে দাঁড়ানো প্রাচীন এথেন্সকে দেখানো হয় শৃঙ্খলাবদ্ধ ও নৈতিক শক্তি হিসেবে। ফলে গল্পটি পড়লে প্লেটোর পরিচিত রাজনৈতিক চিন্তার সঙ্গে এর মিল সহজেই ধরা পড়ে।

আরেকটি সমস্যা হলো- প্লেটোর বাইরে আটলান্টিস সম্পর্কে সমসাময়িক কোনো স্বাধীন প্রাচীন ডকুমেন্ট নেই। এত বড় সাম্রাজ্য, এত বিশাল যুদ্ধ এবং এত বিপর্যয় সত্যিই ঘটে থাকলে অন্য কোনো সভ্যতার লেখায় তার স্পষ্ট চিহ্ন থাকার প্রত্যাশা অস্বাভাবিক নয়। এখন পর্যন্ত তেমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের সাম্প্রতিক পর্যালোচনাতেও প্রত্নতাত্ত্বিকদের মূল অবস্থান একই, আটলান্টিসকে বাস্তব হারানো মহাদেশ হিসেবে দেখার পক্ষে গ্রহণযোগ্য প্রমাণ নেই।

তাহলে সান্তোরিনি?

আটলান্টিসকে বাস্তব কোনো ঘটনার সঙ্গে যুক্ত করার সবচেয়ে আলোচিত প্রচেষ্টাগুলোর একটি হলো গ্রিসের সান্তোরিনি, প্রাচীন থেরা।

ব্রোঞ্জ যুগে এখানে ভয়াবহ অগ্ন্যুৎপাত ঘটে। বর্তমান গবেষণায় ঘটনাটি আনুমানিক খ্রিষ্টপূর্ব ১৭তম শতকের শেষভাগ থেকে ১৬তম শতকের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে ধরা হয়, যদিও নির্দিষ্ট সাল নিয়ে দীর্ঘদিন বিতর্ক রয়েছে। স্মিথসোনিয়ান ইনস্টিটিউশনের গ্লোবাল ভলকানিজম প্রোগ্রাম ঘটনাটিকে প্রায় ১৬০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দের বিশাল ক্যালডেরা-গঠনকারী অগ্ন্যুৎপাত হিসেবে উল্লেখ করে। এর ভলকানিক এক্সপ্লোসিভিটি ইনডেক্স বা ভিইআই ছিল ৭।

উল্লেখ্য, ভলকানিক এক্সপ্লোসিভিটি ইনডেক্স (VEI) হলো আগ্নেয়গিরির বিস্ফোরণ কতটা শক্তিশালী তা মাপার একটি স্কেল। সাধারণত ০-৮ পর্যন্ত স্কেলে বিস্ফোরণের তীব্রতা, ছাই ও উদ্গীরিত পদার্থের পরিমাণ বিবেচনা করা হয়।

সান্তোরিনির আক্রোতিরিতে পাওয়া ব্রোঞ্জ যুগের নগরবসতি আগ্নেয় ছাই ও ধ্বংসাবশেষের নিচে অসাধারণভাবে সংরক্ষিত হয়েছে। বিস্ফোরণ, ভূমিকম্প, সুনামি এবং একটি উন্নত সামুদ্রিক সংস্কৃতি, এসব কারণে মিনোয়ান পৃথিবীর সঙ্গে আটলান্টিসের তুলনা করা হয়।

কিন্তু মিলের পাশাপাশি অমিল আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

প্লেটোর আটলান্টিস হেরাক্লিসের স্তম্ভের বাইরে ছিল। সান্তোরিনি তার থেকে বহু দূরে, এজিয়ান সাগরের ভেতরে। প্লেটোর কালপঞ্জি অনুসারে আটলান্টিসের পতন সান্তোরিনি অগ্ন্যুৎপাতের প্রায় আট হাজার বছর আগের ঘটনা। আর মিনোয়ান সভ্যতাও সান্তোরিনি বিস্ফোরণের দিনেই নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়নি। ক্রিটে মিনোয়ান সংস্কৃতি এরপরও টিকে ছিল। অগ্ন্যুৎপাত তাদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় কতটা প্রভাব ফেলেছিল, তা নিয়ে গবেষণা ও বিতর্ক এখনও আছে।

আটলান্টিস কীভাবে আধুনিক রহস্য হয়ে উঠল?

প্লেটোর পর শতাব্দীর পর শতাব্দী আটলান্টিস নিয়ে আলোচনা হলেও আধুনিক আটলান্টিস-উন্মাদনায় সবচেয়ে প্রভাবশালী নামগুলোর একটি ইগনেশিয়াস ডনেলি। ১৮৮২ সালে প্রকাশিত তাঁর বই ‘Atlantis: The Antediluvian World’-এ তিনি দাবি করেন, আটলান্টিস বাস্তব একটি হারানো মহাদেশ ছিল। মিসর থেকে মধ্য আমেরিকা পর্যন্ত বহু প্রাচীন সভ্যতার সাংস্কৃতিক উৎস ছিল সেটি।

আধুনিক প্রত্নতত্ত্ব এসব ধারণাকে সমর্থন করে না। কিন্তু ডনেলির বই জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে আটলান্টিসের চেহারা বদলে দেয়। প্লেটোর নৈতিক উপকথার দ্বীপ ধীরে ধীরে হয়ে ওঠে অতি উন্নত প্রযুক্তির হারানো সুপার-কালচার। পরবর্তীতে এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ক্রিস্টাল পাওয়ার, প্রাচীন বিমান, এলিয়েন, রহস্যময় শক্তির উৎস এবং নানা সিউডোয়ার্কিওলজিক্যাল দাবি।

Image Source: History Defined
Image Source: History Defined

সমস্যা হলো, এগুলোর প্রায় কোনোটিই প্লেটোর মূল আটলান্টিসের অংশ না।

আজ পৃথিবীর মানচিত্রে এমন এলাকা খুঁজে পাওয়া কঠিন যাকে কোনো না কোনো সময়ে কেউ আটলান্টিস বলে দাবি করেননি। আজোরেস, স্পেনের দক্ষিণাঞ্চল, সাহারা, বাহামাস, ক্রিট, সান্তোরিনি, এমনকি অ্যান্টার্কটিকাও এই তালিকায় এসেছে। কিন্তু কোনো সম্ভাব্য স্থানই এমন প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ দিতে পারেনি যা প্লেটোর বর্ণিত আটলান্টিসের অস্তিত্ব প্রতিষ্ঠা করে।

এরপরও কেন আটলান্টিস নিয়ে এত মাতামাতি?

সম্ভবত এর কারণ, আটলান্টিস শুধু হারানো এক শহরের গল্প না। এর পেছনে মানুষের কয়েকটি গভীর আকর্ষণ একসঙ্গে কাজ করে।

হারিয়ে যাওয়া জগতের প্রতি কৌতূহল, সমুদ্রের নিচে অজানা ধ্বংসাবশেষ পাওয়ার সম্ভাবনা, অতীতের মানুষ আমাদের ধারণার চেয়ে বেশি উন্নত ছিল কি না সেই প্রশ্ন এবং সবচেয়ে বড় কথা, একটি শক্তিশালী সভ্যতা নিজের অহংকারের কারণে ধ্বংস হয়ে যাওয়ার ভয়।

বাস্তব ইতিহাসে অবশ্য বিভিন্ন শহর সত্যিই ডুবে গেছে, আগ্নেয়গিরিতে জনপদ চাপা পড়েছে, ভূমিকম্পে সভ্যতার কেন্দ্র ধ্বংস হয়েছে। আক্রোতিরি কিংবা রোমান পম্পেই দেখিয়েছে, একসময় মানুষের স্বাভাবিক জীবন চলছিল এমন পুরো একটি শহর প্রকৃতির আঘাতে হঠাৎ থেমে যেতে পারে। ফলে আটলান্টিসের মূল ধারণা অসম্ভব না, তবে নির্দিষ্ট আটলান্টিসের অস্তিত্ব নিয়েই যত দ্বিধা।

২,৪০০ বছর ধরে মানুষ সমুদ্রের তলায় প্লেটোর শহর খুঁজছে। কিন্তু সম্ভবত আটলান্টিসকে বোঝার জন্য সমুদ্রের তলায় যাওয়ার প্রয়োজনই নেই! তাকে পাওয়া যায় প্লেটোর প্রশ্নের মধ্যে: সম্পদ ও ক্ষমতা পেলে একটা রাষ্ট্র কত দূর পর্যন্ত নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে?

সেই অর্থে আটলান্টিস হারিয়ে যায়নি। সমুদ্রের নিচে কোনো শহর হিসেবে তার অস্তিত্ব এখনও প্রমাণিত নয়, কিন্তু সভ্যতার অহংকার, উত্থান এবং আত্মবিনাশের গল্প হিসেবে আটলান্টিস আজও ঠিক সেই জায়গাতেই আছে, যেখানে প্লেটো তাকে রেখে গিয়েছিলেন।

ফিচার ইমেজ: History.com

তথ্যসূত্র

This post was viewed: 10

আরো পড়ুন