Skip to main content

Ridge Bangla

মতিঝিলের আইইডি উদ্ধারের ১ সপ্তাহ পরও অধরা জড়িতরা, তদন্তে বড় বাধা অকেজো সিসিটিভি

রাজধানীর মতিঝিলে উদ্ধার হওয়া শক্তিশালী ইম্প্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইসের (আইইডি) ঘটনার ১ সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও এর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে শনাক্ত করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তদন্তে দৃশ্যমান অগ্রগতি না হওয়ায় নগর নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। একই সঙ্গে পুলিশের বিশেষায়িত ইউনিট ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।

তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য, ঘটনার তদন্তে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়িয়েছে ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ক্যামেরাগুলো অকার্যকর থাকা। ফলে বিস্ফোরকটি কারা সেখানে রেখে গেছে, কোন পথ দিয়ে এসেছে কিংবা ঘটনার আগে ও পরে তাদের চলাচল কেমন ছিল, সে বিষয়ে কোনো ভিডিওচিত্র সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি। ঘটনাস্থল থেকে সন্দেহভাজনদের শনাক্তে সহায়ক এমন কোনো কার্যকর আলামতও মেলেনি।

ঢাকা মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের উল্টো রথযাত্রাকে লক্ষ্য করেই আইইডিটি রাখা হয়েছিল। শোভাযাত্রার নির্ধারিত পথের মধ্যে একটি ছাতার ভেতরে বিস্ফোরকটি লুকিয়ে রাখা হয়।

তিনি জানান, দায়িত্বে থাকা এক ট্রাফিক পুলিশ সদস্য ছাতার ভেতরে লাল আলো জ্বলতে দেখে সন্দেহ করেন এবং সঙ্গে সঙ্গে ডিএমপি নিয়ন্ত্রণকক্ষে বিষয়টি জানান। পরে সম্ভাব্য প্রাণহানি এড়াতে রথযাত্রার পথ পরিবর্তন করা হয় এবং শর্ট সার্কিটের কথা বলে এলাকাটি দ্রুত খালি করা হয়। পরে বোমা নিষ্ক্রিয়কারী দল নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণের মাধ্যমে আইইডিটি নিষ্ক্রিয় করে। তবে এ সময় এক পথচারী আহত হন।

সিটিটিসির বোমা বিশেষজ্ঞদের প্রাথমিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, আইইডিটির ভেতরে প্রায় ১ থেকে দেড় কেজি সালফার, বৈদ্যুতিক সার্কিট, ২টি ৯ ভোল্ট ব্যাটারি এবং জিআই পাইপের মধ্যে অসংখ্য লোহার বিয়ারিং বল ব্যবহার করা হয়েছিল। বিস্ফোরণে সর্বোচ্চ ক্ষয়ক্ষতি ঘটানোর উদ্দেশ্যেই এসব স্প্লিন্টার ব্যবহার করা হয়। ঘটনাস্থল থেকে খয়েরি রঙের ছাতার পোড়া কাপড়, ছাতার বাঁট, ব্যাটারির খণ্ডাংশ, ছাতার রড, জিআই পাইপের টুকরা এবং ১২টি বিয়ারিং বল উদ্ধার করা হয়েছে।

তদন্ত সূত্র জানায়, আইইডিটি এমনভাবে তৈরি করা হয়েছিল, যাতে কেউ ছাতাটি খুলতে গেলে বা হাতলের সুইচে চাপ দিলে তাৎক্ষণিক বিস্ফোরণ ঘটে। তদন্তকারীদের ধারণা, এটি ছিল অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে তৈরি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন বিস্ফোরক।

তবে ঘটনার ৮ দিন পরও তদন্তকারীরা নিশ্চিত হতে পারেননি, এটি কোনো সংগঠিত জঙ্গি গোষ্ঠীর পরিকল্পিত হামলার অংশ ছিল, নাকি অন্য কোনো নাশকতাকারী চক্রের কর্মকাণ্ড। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, সম্ভাব্য সব দিক বিবেচনায় রেখেই তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

ঘটনার পর মতিঝিল থানা-পুলিশের পাশাপাশি তদন্তে যুক্ত হয় ডিএমপির কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট।

ডিএমপির মতিঝিল বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার হারুন অর রশীদ বলেন, “তদন্ত চলছে। তবে এই মুহূর্তে নতুন করে জানানোর মতো কোনো তথ্য নেই। এখন পর্যন্ত কেউ ঘটনার দায় স্বীকার করেনি এবং কাউকে গ্রেপ্তারও করা সম্ভব হয়নি।”

সিটিটিসি প্রধান অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ শামসুল হক বলেন, “একাধিক টিম কাজ করছে। তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে না। এটি কোনো সংগঠিত জঙ্গি গোষ্ঠীর কাজ নাকি অন্য কোনো উদ্দেশ্যে করা হয়েছে, সে বিষয়ে এখনই মন্তব্য করা সমীচীন হবে না।”

নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, দেশে দীর্ঘদিন বড় ধরনের সন্ত্রাসী হামলা না ঘটলেও উগ্রবাদী তৎপরতার ঝুঁকি উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। কয়েক মাস আগে পুলিশ সদর দপ্তরও গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় স্থাপনায় সম্ভাব্য সন্ত্রাসী হামলার আশঙ্কা জানিয়ে বিশেষ সতর্কতা জারি করেছিল। এর পর থেকে কয়েকটি ঘটনার পর সর্বশেষ মতিঝিলে শক্তিশালী আইইডি উদ্ধারের ঘটনা নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, কেরানীগঞ্জের হাসনাবাদ এলাকার একটি মাদ্রাসায় বিস্ফোরণ, পরবর্তীতে ১৭ জনকে গ্রেপ্তার, তদন্তে আন্তর্জাতিক জঙ্গি নেটওয়ার্কের সঙ্গে সম্ভাব্য অনলাইন যোগাযোগের তথ্য, পাকিস্তানভিত্তিক নিষিদ্ধ সংগঠন তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান সংশ্লিষ্ট ডিজিটাল লিংক যাচাই এবং নতুন উগ্রবাদী সেল হিসেবে আলোচনায় আসা ফাতাহ কমব্যাট গ্রুপের কার্যক্রমের মতো ঘটনাগুলোও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক কর্মকর্তা জানান, জঙ্গি নেটওয়ার্ক শনাক্ত, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ এবং প্রতিরোধমূলক অভিযান পরিচালনা ছিল পুলিশের বিশেষায়িত ইউনিটগুলোর মূল দায়িত্ব। তবে বর্তমানে নিয়মিত অপরাধ দমন, মাদক উদ্ধার, ছিনতাই প্রতিরোধ ও বিভিন্ন মামলার তদন্তে ব্যস্ত থাকায় সেই দায়িত্বে পূর্ণ মনোযোগ দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।

তাদের মতে, দক্ষ ও অভিজ্ঞ জনবলের সংকটও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অতীতে সন্ত্রাসবাদ দমনে অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের অগ্রাধিকার দিয়ে সিটিটিসিতে পদায়ন করা হলেও সম্প্রতি সেই ধারাবাহিকতা বজায় রাখা হয়নি। দীর্ঘদিন এ খাতে কাজ করা অনেক কর্মকর্তাকে অন্য ইউনিটে বদলি করায় সন্ত্রাসবাদবিরোধী কার্যক্রমে প্রভাব পড়েছে। ফলে কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম এবং অ্যান্টি টেরোরিজম ইউনিটের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।

সম্প্রতি ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সিটিটিসি প্রধান মোহাম্মদ শামসুল হক জানান, সিটিটিসির অধীনে শুধু কাউন্টার টেরোরিজম নয়, আরও কয়েকটি বিভাগ রয়েছে এবং সব বিভাগই সমান গুরুত্ব দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে।

This post was viewed: 9

আরো পড়ুন