Skip to main content

Ridge Bangla

লালদিয়া টার্মিনালের নকশা উন্মোচন, ৫৫০ মিলিয়ন ডলারের প্রকল্পের নির্মাণকাজ শুরু হবে ডিসেম্বরে

চট্টগ্রামের লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনালের প্রস্তাবিত নকশা ও পরিচালনা পরিকল্পনা প্রকাশ করেছে নেদারল্যান্ডসভিত্তিক বন্দর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান এপিএম টার্মিনালস। একই সঙ্গে সংস্থাটি জানিয়েছে, প্রয়োজনীয় অনুমোদন মিললে ২০২৬ সালের শেষ দিকে ৫৫০ মিলিয়ন ডলারের এই প্রকল্পের নির্মাণকাজ শুরু করার লক্ষ্য রয়েছে।

নির্মাণ শেষ হলে এটি হবে বাংলাদেশের প্রথম শতভাগ বিদেশি বিনিয়োগে নির্মিত কনটেইনার টার্মিনাল। বছরে ৮ লাখ টিইইউ-এর বেশি কনটেইনার পরিচালনার সক্ষমতা নিয়ে টার্মিনালটি চট্টগ্রাম বন্দরের কনটেইনার হ্যান্ডলিং ক্ষমতা প্রায় ২৩ শতাংশ বাড়াবে বলে আশা করা হচ্ছে। এর ফলে বন্দরের জট কমবে, কার্যক্রমের গতি বাড়বে এবং ব্যবসায়িক ব্যয় কমাতে সহায়তা করবে।

সম্প্রতি নিজেদের ওয়েবসাইটে প্রকল্পটির নকশা ও প্রযুক্তিগত বৈশিষ্ট্য প্রকাশ করেছে এপিএম টার্মিনালস। সেখানে বলা হয়েছে, নতুন এই টার্মিনাল বড় আকারের জাহাজ ভেড়ানোর সুযোগ সৃষ্টি করবে এবং চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্রম আধুনিকায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

গত বছরের ১৭ নভেম্বর সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব মডেলের আওতায় টার্মিনালটির নকশা প্রণয়ন, অর্থায়ন, নির্মাণ ও পরিচালনার জন্য চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ৩০ বছর মেয়াদি চুক্তি সই করে এপিএম টার্মিনালস বিভি। সেই চুক্তির কয়েক মাস পর প্রকল্পের বিস্তারিত পরিকল্পনা প্রকাশ করা হলো।

এপিএম টার্মিনালস লালদিয়ার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রমেশ ডেভিড গণমাধ্যমকে বলেন, “লালদিয়া টার্মিনালের প্রাথমিক নকশা ও ধারণা পরিকল্পনা পর্যায়েই প্রস্তুত করা হয়েছিল। প্রথমত, বিনিয়োগের খসড়া তৈরির জন্য এবং দ্বিতীয়ত, এই বিনিয়োগের মাধ্যমে আমরা ঠিক কী অর্জন করতে চাই তার একটি পরিষ্কার রূপরেখা পেতে এটি গুরুত্বপূর্ণ।”

তিনি আরও বলেন, “আমাদের টিম এখন নকশা চূড়ান্ত করতে কাজ করছে। পুরো প্রক্রিয়াজুড়ে যথোপযুক্ত সমন্বয় নিশ্চিত করতে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সরকারি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আমরা নিবিড়ভাবে কাজ চালিয়ে যাব।”

নির্মাণকাজ শুরুর বিষয়ে রমেশ ডেভিড বলেন, “আমরা সম্ভাব্য দ্রুততম সময়ের মধ্যে কাজ শুরু করার পরিকল্পনা করছি। তবে এই প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে বেশ কয়েকটি রেগুলেটরি অনুমোদন ও ছাড়পত্র নিতে হয়। এসব অনুমোদন ও ছাড়পত্র মিললে ২০২৬ সালের শেষের দিকে নির্মাণকাজ শুরু করতে পারব বলে আশা করছি।”

ঠিকাদার নির্বাচন সম্পর্কে তিনি জানান, এপিএম টার্মিনালসের বৈশ্বিক প্রকিউরমেন্ট টিমের তত্ত্বাবধানে আন্তর্জাতিক, প্রত্যক্ষ ও প্রতিযোগিতামূলক সংগ্রহ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ঠিকাদার নিয়োগ দেওয়া হবে।

প্রকল্পটিকে স্বাগত জানিয়ে চট্টগ্রাম চেম্বার অভ কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি আমিরুল হক বলেন, “চট্টগ্রামে এই নতুন প্রকল্পে বিনিয়োগের বিষয়টি বিবেচনা করায় এবং শহরটিকে আঞ্চলিক লজিস্টিকস হাবে পরিণত করার ভিশনের জন্য শীর্ষস্থানীয় অপারেটর এপিএম টার্মিনালসের কাছে আমরা কৃতজ্ঞ।”

তিনি বলেন, “এপিএম টার্মিনাল আমাদের হ্যান্ডলিং সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াবে। আশা করি প্রতিষ্ঠানটি আন্তর্জাতিক মানের বন্দর পরিচালনা ব্যবস্থা ও দক্ষতা নিয়ে আসবে, যা আমাদের অন্যান্য টার্মিনালগুলোর সেবার মান উন্নত করতেও সাহায্য করবে।” তার মতে, আরও বেশি বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি অপরিহার্য।

প্রকাশিত নকশা অনুযায়ী, টার্মিনালটি ৬ হাজার টিইইউ পর্যন্ত ধারণক্ষমতার কনটেইনার জাহাজ পরিচালনার উপযোগী করে তৈরি করা হবে, যা বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরে ভেড়া জাহাজগুলোর সক্ষমতার দ্বিগুণেরও বেশি। এতে ১০.৫ মিটার ড্রাফটের ৬১৩ মিটার দীর্ঘ জেটি, ৭টি শিপ-টু-শোর ক্রেন, ৩২টি বিদ্যুৎচালিত রাবার টায়ারযুক্ত গ্যান্ট্রি ক্রেন এবং ৪১টি বিদ্যুৎচালিত টার্মিনাল ট্রাক্টর থাকবে।

প্রতিষ্ঠানটির পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে টার্মিনালটি পুরোপুরি চালু হবে। তখন বড় আকারের কনটেইনার জাহাজ সরাসরি চট্টগ্রাম বন্দরে ভিড়তে পারবে, যা কার্গো পরিচালনার দক্ষতা ও শিপিং সেবার নির্ভরযোগ্যতা বাড়ানোর পাশাপাশি বন্দরের চাপ কমাতে ভূমিকা রাখবে।

এপিএম টার্মিনালসের মতে, প্রকল্পটি আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক বাজারের সঙ্গে বাংলাদেশের সংযোগ আরও শক্তিশালী করবে এবং দ্রুত সম্প্রসারিত বাণিজ্য কার্যক্রমকে সহায়তা করবে।

সংস্থাটি জানিয়েছে, বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দর সাধারণত ২ হাজার ৭০০ টিইইউ ধারণক্ষমতার জাহাজ গ্রহণ করতে পারে। ফলে অধিকাংশ কনটেইনার পণ্য ছোট ফিডার জাহাজে পরিবহন করতে হয়। এসব জাহাজকে ইউরোপ বা উত্তর আমেরিকায় পৌঁছানোর আগে কলম্বো ও সিঙ্গাপুরের মতো আঞ্চলিক হাব বন্দরে ট্রান্সশিপমেন্ট করতে হয়, যার কারণে সরবরাহ ব্যবস্থায় অতিরিক্ত ৭ থেকে ১৪ দিন সময় যোগ হয়।

এপিএম টার্মিনালসের ভাষ্য, ছোট ফিডার জাহাজের ওপর নির্ভরশীলতার কারণে পণ্য দুই দফা ওঠানো-নামানোর প্রয়োজন হয়, যা লজিস্টিকস ব্যয় বাড়ায় এবং আমদানিকারক ও রপ্তানিকারকদের জন্য অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করে।

নতুন টার্মিনাল চালু হলে ৬ হাজার টিইইউ পর্যন্ত ধারণক্ষমতার জাহাজ সরাসরি চট্টগ্রামে আসতে পারবে। এর ফলে এশিয়া, ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার সঙ্গে বড় আকারের মেইনলাইন কনটেইনার জাহাজের সরাসরি সংযোগ স্থাপন সম্ভব হবে। এতে বিশ্বের প্রধান শিপিং জোটগুলো শুধু ছোট ফিডার সার্ভিসের ওপর নির্ভর না করে সরাসরি চট্টগ্রাম বন্দরে চলাচলের সুযোগ পাবে। এর মাধ্যমে ট্রানজিট সময় ও সামগ্রিক লজিস্টিকস ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে বলে প্রতিষ্ঠানটি মনে করছে।

সংস্থাটির মতে, এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বেশি সুফল পাবে বাংলাদেশের রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক শিল্প। কারণ আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে ক্রয়াদেশ থেকে পণ্য সরবরাহ পর্যন্ত সময় কমিয়ে আনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে লজিস্টিকস-সংক্রান্ত প্রতিবন্ধকতা দূর হয়ে সরবরাহ ব্যবস্থার দক্ষতা বাড়লে ওষুধ, চামড়া ও পাদুকা শিল্পের মতো বিকাশমান খাতও উপকৃত হবে।

বর্তমানে এপিএম টার্মিনালস বিশ্বের ৬০টিরও বেশি বন্দর ও টার্মিনাল পরিচালনা করছে।

This post was viewed: 5

আরো পড়ুন