প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের জন্য ডিজিটাল পরিচয় ব্যবস্থা চালুর লক্ষ্যে নেওয়া ১৬৪ কোটি টাকার প্রকল্পে ৪২ কোটির বেশি টাকা ব্যয় হলেও একটি ইউনিক আইডেন্টিফিকেশন কার্ডও বিতরণ করা সম্ভব হয়নি। মূল লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ হওয়ায় প্রকল্পটি সমাপ্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
২০১৯ সালে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় দেশের ২ কোটি ৮৭ লাখ শিক্ষার্থীর তথ্যভাণ্ডার তৈরি এবং তাদের ইউনিক আইডেন্টিফিকেশন নম্বর ও কার্ড প্রদানের উদ্দেশ্যে প্রকল্পটি গ্রহণ করে।
বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের মূল্যায়ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুর্বল পরিকল্পনা, তথ্য যাচাইয়ে সমন্বয়হীনতা, নেতৃত্বের ঘন ঘন পরিবর্তন এবং তথ্য সংশোধনের কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় প্রকল্পটি নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি। এ কারণে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে প্রকল্পটি সমাপ্ত করার প্রস্তাব দিয়েছে।
বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, অনুমোদিত ১৬৪ কোটি টাকার মধ্যে প্রায় ৪২ কোটি টাকা ব্যয় করা হলেও একটি ইউআইডি কার্ডও তৈরি বা বিতরণ করা যায়নি। ২ কোটি ৮৭ লাখ শিক্ষার্থীর তথ্য সংরক্ষণের লক্ষ্য থাকলেও ডাটাবেজে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে মাত্র ১ কোটি ৩ লাখ ২০ হাজার শিক্ষার্থীর তথ্য। এর মধ্যে ৫৪ লাখ ৪০ হাজার শিক্ষার্থীর তথ্য কার্ড মুদ্রণের উপযোগী করা হলেও তথ্যগত অসংগতির কারণে ছাপানোর কাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি।
মাঠপর্যায়ের মূল্যায়নে দেখা গেছে, জন্মনিবন্ধনের তথ্যের ভুল ও অসংগতি প্রকল্প বাস্তবায়নের সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। শিক্ষার্থী ও অভিভাবকের নামের অমিল, বাংলা ও ইংরেজি বানানের ভিন্নতা, অসম্পূর্ণ তথ্য, ভুল জন্মনিবন্ধন নম্বর এবং বিভিন্ন তথ্যঘর ফাঁকা থাকায় তথ্য যাচাই শেষ করা যায়নি।
২০২২ সালের অক্টোবরে জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন কার্যালয়ের রেজিস্ট্রার জেনারেলের দপ্তরের সঙ্গে অ্যাপ্লিকেশন প্রোগ্রামিং ইন্টারফেসের মাধ্যমে তথ্য যাচাইয়ের চুক্তি হলেও ভুল তথ্য সংশোধনের কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। ফলে সমস্যা শনাক্ত হলেও তা সমাধান করা সম্ভব হয়নি।
প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় দায়িত্ব পালন করেন ৭ জন প্রকল্প পরিচালক। বিভিন্ন সময়ে পদটি শূন্য ছিল এবং শেষ পর্যায়ে অধিকাংশ পরিচালক অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে প্রকল্পটি পরিচালনা করেন। বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, নেতৃত্বের ধারাবাহিকতার অভাব প্রকল্প বাস্তবায়নে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে এবং জবাবদিহি দুর্বল করেছে।
প্রতিবেদনে সফটওয়্যার রক্ষণাবেক্ষণ, তথ্য সুরক্ষা, সাইবার নিরাপত্তা এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয়ের ক্ষেত্রেও গুরুতর দুর্বলতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের তথ্য সংগ্রহ ও যাচাইয়ের জন্য কার্যকর ব্যবস্থা রাখা হয়নি। যদিও তারাও প্রকল্পের আওতায় ছিল। একই সঙ্গে এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের বিষয়টিও উপেক্ষিত ছিল।
প্রথম ধাপে ডাটাবেজে থাকা ভুল, অসম্পূর্ণ ও অসংগতিপূর্ণ তথ্য সংশোধনে সমন্বিত তথ্য পরিশোধন কার্যক্রম পরিচালনার সুপারিশ করেছে বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের তথ্য নিয়মিত হালনাগাদ, সফটওয়্যার রক্ষণাবেক্ষণ, তথ্য সুরক্ষা এবং ইউআইডি কার্ড মুদ্রণ ও বিতরণের জন্য একটি স্থায়ী প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তোলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
সংস্থাটি আরও বলেছে, প্রকল্পের অসমাপ্ত কাজগুলো প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের নিয়মিত কার্যক্রমের আওতায় সম্পন্ন করা যেতে পারে অথবা সরকারের অনুমোদন সাপেক্ষে নতুন অনুসরণমূলক প্রকল্পের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি, নির্ভুল তথ্যভাণ্ডার এবং কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত না করে বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিলে সরকারি অর্থ ব্যয়ের কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া যায় না। এই প্রকল্প সেই বাস্তবতার একটি উদাহরণ।