সৌদি আরবের পর এবার কুয়েতও পাকিস্তানের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদার করেছে। এ পদক্ষেপের পর মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা কাঠামোয় ইসলামাবাদের ক্রমবর্ধমান ভূমিকা নতুন করে আলোচনায় এসেছে। বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনা ও আঞ্চলিক অনিশ্চয়তার মধ্যে উপসাগরীয় দেশগুলো নিরাপত্তা সহযোগিতার নতুন অংশীদার খুঁজছে, আর সেই প্রেক্ষাপটে পাকিস্তানের গুরুত্ব বাড়ছে।
সংবাদমাধ্যম টিআরটি ওয়ার্ল্ডে বুধবার (২৯ জুলাই) প্রকাশিত এক নিবন্ধে বলা হয়েছে, কুয়েত ও পাকিস্তানের নতুন প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তিতে সামরিক জোট গঠন বা সেনা মোতায়েনের বাধ্যবাধকতা না থাকলেও এর সময় ও প্রেক্ষাপটকে তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
তাদের মতে, উপসাগরীয় দেশগুলো এখন নিরাপত্তা সহযোগিতায় বৈচিত্র্য আনতে চাইছে। ফলে পাকিস্তানকে একটি গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
২০২৩ সালে পাকিস্তানের সঙ্গে স্বাক্ষরিত এই চুক্তি চলতি মাসে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদন দেয় কুয়েত। পাঁচ বছর মেয়াদি এ চুক্তিতে সামরিক প্রশিক্ষণ, যৌথ মহড়া, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, রসদ ব্যবস্থাপনা, প্রতিরক্ষা শিল্পে সহযোগিতা এবং সামরিক কর্মকর্তা বিনিময়ের বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য একটি যৌথ সামরিক কমিটি গঠন করা হবে। তবে কোনো একটি দেশ আক্রান্ত হলে অন্য দেশকে সামরিকভাবে সহায়তা করার বাধ্যবাধকতা এতে রাখা হয়নি।
চুক্তি অনুমোদনের পর কুয়েতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ জাররাহ জাবের আল আহমাদ আল সাবাহ দুই দিনের সফরে পাকিস্তান যান। পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ওই সফরে দুই দেশ প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং নিয়মিত উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ অব্যাহত রাখার বিষয়ে একমত হয়।
এর আগে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে পাকিস্তান ও সৌদি আরবও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরও জোরদার করে। দীর্ঘদিন ধরেই পাকিস্তান সৌদি আরবকে সামরিক প্রশিক্ষণ ও সামরিক উপদেষ্টা দিয়ে সহায়তা করে আসছে। অন্যদিকে অর্থনৈতিক সংকটের সময় সৌদি আরবও একাধিকবার পাকিস্তানকে আর্থিক সহায়তা দিয়েছে।
২০২৫ সালের কৌশলগত প্রতিরক্ষা চুক্তিতে উল্লেখ করা হয়, এক দেশের ওপর হামলাকে উভয় দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। পাশাপাশি প্রয়োজন হলে দুই দেশ নিজেদের পূর্ণ সামরিক সক্ষমতা ব্যবহারের মাধ্যমে একটি প্রতিরোধমূলক নিরাপত্তা বলয় গড়ে তুলবে।
কুয়েত বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক নৌরাহ শুয়াইবি বলেন, আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে এটি সাধারণ প্রতিরক্ষা চুক্তি হলেও বর্তমান আঞ্চলিক পরিস্থিতিতে এর গুরুত্ব অনেক বেশি।
তার মতে, ইরান যুদ্ধ শুরুর পর কুয়েত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার হুমকির মুখে পড়েছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘদিনের প্রতিরক্ষা সম্পর্ক বজায় রেখেও দেশটি নতুন নিরাপত্তা অংশীদার খুঁজছে।
শুয়াইবি বলেন, “উপসাগরীয় দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রকে বাদ দিচ্ছে না। তবে তারা এখন একক কোনও দেশের ওপর নির্ভরশীল না থেকে একাধিক অংশীদারের সঙ্গে নিরাপত্তা সম্পর্ক গড়ে তুলতে চাইছে।”
বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন ধরেই পাকিস্তানের সঙ্গে উপসাগরীয় দেশগুলোর প্রতিরক্ষা সম্পর্ক রয়েছে। বহু পাকিস্তানি সামরিক কর্মকর্তা ওই অঞ্চলে প্রশিক্ষক ও উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
শুয়াইবির ভাষ্য, পাকিস্তানের অভিজ্ঞ সশস্ত্র বাহিনী, সম্প্রসারিত প্রতিরক্ষা শিল্প, সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানের অভিজ্ঞতা এবং সমুদ্র নিরাপত্তায় সক্ষমতা দেশটিকে উপসাগরীয় দেশগুলোর কাছে আকর্ষণীয় করে তুলেছে।
চলতি বছরের শুরুতে পাকিস্তান নৌবাহিনী বহুজাতিক কম্বাইন্ড টাস্ক ফোর্স-১৫০-এর নেতৃত্বও গ্রহণ করে। এর ফলে আন্তর্জাতিক সমুদ্র নিরাপত্তা কার্যক্রমে দেশটির অভিজ্ঞতা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।
গত এক বছরে পাকিস্তান ও বিভিন্ন উপসাগরীয় দেশের মধ্যে নতুন প্রতিরক্ষা চুক্তির আলোচনা আরও জোরালো হয়েছে। নিজস্ব যুদ্ধবিমান উৎপাদন সক্ষমতা এবং বড় সামরিক বাহিনী থাকায় যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি পাকিস্তানকেও বিকল্প নিরাপত্তা অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করছে কয়েকটি উপসাগরীয় দেশ।
তুরস্ক, পাকিস্তান ও সৌদি আরব একটি পৃথক পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তির খসড়া নিয়েও কাজ করছে। একই ধরনের চুক্তিতে আগ্রহ দেখিয়েছে বাহরাইন। পাশাপাশি পাকিস্তানের সঙ্গে অস্ত্র ও সামরিক প্রশিক্ষণ সহযোগিতা বাড়ানোর আগ্রহ প্রকাশ করেছে জর্ডান।
বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তান কুয়েতের প্রধান নিরাপত্তা রক্ষাকারী শক্তি হয়ে উঠবে না। বরং সামরিক প্রশিক্ষণ, কারিগরি সহায়তা, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় এবং প্রতিরক্ষা শিল্পে সহযোগিতার মাধ্যমে বিদ্যমান সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করবে।
শুয়াইবির মতে, এই চুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হবে নিয়মিত যৌথ মহড়া, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, ড্রোন প্রতিরোধে সহযোগিতা, সমুদ্র নিরাপত্তা এবং প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিতে যৌথ কাজ।
ইসলামাবাদের সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের গবেষণা পরিচালক ইয়াসির হুসেইন বলেন, এই চুক্তি উপসাগরীয় দেশগুলোর কাছে পাকিস্তানের কৌশলগত গুরুত্ব বৃদ্ধিরই ইঙ্গিত দেয়।
তার ভাষায়, “উপসাগরীয় দেশগুলোর কাছে পাকিস্তান যে এখন আরও বেশি নির্ভরযোগ্য নিরাপত্তা অংশীদার হয়ে উঠছে, এই চুক্তি সেটাই দেখাচ্ছে।”
তিনি বলেন, এই চুক্তিকে ইরানবিরোধী কোনো জোট হিসেবে দেখা উচিত নয়। বরং সৌদি আরব, ইরান এবং অন্যান্য উপসাগরীয় দেশের সঙ্গে পাকিস্তানের সুসম্পর্ক আঞ্চলিক উত্তেজনার সময়ে দেশটিকে কার্যকর মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালনে সহায়তা করছে।
তার দাবি, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রকে আলোচনার টেবিলে আনতেও পাকিস্তান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
অন্যদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইরানে পাকিস্তানের সাবেক রাষ্ট্রদূত আসিফ দুররানি মনে করেন, কুয়েতের সঙ্গে এই চুক্তিকে অতিরঞ্জিত করার সুযোগ নেই।
তার ভাষায়, “পাকিস্তানের সঙ্গে উপসাগরীয় সব দেশেরই বহুদিনের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা রয়েছে। এটা নতুন কোনও বিষয় না।”
তিনি বলেন, কোনো চুক্তি অনুমোদনের ক্ষেত্রে অনেক সময় দীর্ঘ প্রশাসনিক প্রক্রিয়া লাগে। তাই তিন বছর পর অনুমোদন পাওয়ার পেছনে সেটিও একটি কারণ হতে পারে। তবে বর্তমান আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি এ প্রক্রিয়াকে দ্রুততর করেছে কি না, সে বিষয়ে তিনি বলেন, “উপসাগরীয় অঞ্চলে যা চলছে, তাতে এমনটা বলা যেতেই পারে।”
দুররানির মতে, উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়লেও এতে ইরানের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। কারণ এটি সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সার্বভৌম সিদ্ধান্ত।
তিনি বলেন, “যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার উত্তেজনার সময় পাকিস্তান ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পেরেছে, কারণ দুই পক্ষই পাকিস্তানের ওপর আস্থা রেখেছিল।”