Skip to main content

Ridge Bangla

বন্ধ ৪৪ রাষ্ট্রায়ত্ত কারখানায় বিনিয়োগ টানতে নতুন রোডম্যাপ, অনুমোদন মিলবে সর্বোচ্চ ৭৭ কার্যদিবসে

দীর্ঘদিন ধরে উৎপাদন বন্ধ থাকা ৪৪টি রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে বেসরকারি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে নতুন রোডম্যাপ চূড়ান্ত করছে সরকার। প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী, বিনিয়োগ প্রস্তাব জমা থেকে চূড়ান্ত অনুমোদন ও চুক্তি স্বাক্ষর পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়া সর্বোচ্চ ৭৭ কার্যদিবসের মধ্যে সম্পন্ন করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে মঙ্গলবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে উচ্চপর্যায়ের এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা এসব শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে নতুন বিনিয়োগের মাধ্যমে পুনরায় উৎপাদনে ফিরিয়ে আনা, অলস সম্পদের ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি করাই সরকারের মূল লক্ষ্য। এ উদ্দেশ্যে সরকারি শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের সম্পদে বেসরকারি বিনিয়োগ বা অংশীদারত্ব গ্রহণের জন্য সময়সীমাভিত্তিক একটি প্রক্রিয়াগত কাঠামো তৈরি করা হয়েছে।

নীতিনির্ধারকদের মতে, নতুন শিল্প স্থাপনের ক্ষেত্রে জমি অধিগ্রহণ, অবকাঠামো নির্মাণ এবং গ্যাস-বিদ্যুৎসহ বিভিন্ন সেবার সংযোগ পেতে দীর্ঘ সময় ও বিপুল ব্যয় প্রয়োজন হয়। কিন্তু বন্ধ রাষ্ট্রায়ত্ত কারখানাগুলোর ক্ষেত্রে এসব অবকাঠামোর বড় অংশ আগে থেকেই রয়েছে। ফলে বিদ্যমান সুবিধা কাজে লাগিয়ে দ্রুত শিল্পায়নের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বিনিয়োগের জন্য চিহ্নিত ৪৪টি প্রতিষ্ঠান পাঁচটি রাষ্ট্রায়ত্ত করপোরেশনের অধীন। এর মধ্যে বাংলাদেশ সুগার অ্যান্ড ফুড ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের ১৩টি, বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস করপোরেশনের ১২টি, বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের ১০টি, বাংলাদেশ জুট মিলস করপোরেশনের পাঁচটি এবং বাংলাদেশ স্টিল অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশনের চারটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে।

এসব প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশই বহু বছর ধরে বন্ধ রয়েছে। কোথাও উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ, আবার কোথাও সীমিত পরিসরে কার্যক্রম চলছে। প্রায় ১০ হাজার একর শিল্প জমির পাশাপাশি ভবন, গুদাম, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোগসহ বিদ্যমান অবকাঠামো নতুন শিল্পায়নে ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে।

বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) সূত্র জানায়, প্রথম ধাপে বিনিয়োগ প্রস্তাব জমা দেওয়ার সাত কার্যদিবসের মধ্যে প্রাথমিক যাচাই শেষ হবে। এরপর প্রস্তাব গ্রহণ, সংশোধনের জন্য ফেরত দেওয়া বা বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

দ্বিতীয় ধাপে সম্পদের মূল্যায়ন, দরকষাকষি, বিনিয়োগ কাঠামো নির্ধারণ এবং প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই সম্পন্ন হবে। এ পর্যায়ে আন্তঃসংস্থা সরকারি সম্পদ কমিটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। এ ধাপের জন্য ৫০ কার্যদিবস সময় নির্ধারণ করা হয়েছে।

তৃতীয় ধাপে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, অর্থ বিভাগ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটি বা উচ্চপর্যায়ের অনুমোদন নেওয়া হবে। এরপর চুক্তি স্বাক্ষর ও বিনিয়োগ কার্যক্রম শুরু হবে। এ ধাপের জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে আরও ২০ কার্যদিবস। সব মিলিয়ে পুরো প্রক্রিয়া শেষ করতে সর্বোচ্চ ৭৭ কার্যদিবস লাগবে।

পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ড. এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, বন্ধ রাষ্ট্রায়ত্ত কারখানাগুলোর জমি, অবকাঠামো এবং গ্যাস-বিদ্যুৎসহ প্রয়োজনীয় সুবিধার বড় অংশ আগে থেকেই বিদ্যমান। ফলে নতুন বিনিয়োগকারীরা দ্রুত উৎপাদনে যেতে পারবেন। একই সঙ্গে সরকারের অলস সম্পদও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হবে।

তিনি আরও বলেন, এসব শিল্প ইউনিটের আওতায় কয়েক হাজার একর জমি রয়েছে। অনেক স্থানে গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি, সড়ক যোগাযোগ এবং শিল্প অবকাঠামো প্রস্তুত থাকায় পুনর্বিনিয়োগের মাধ্যমে দ্রুত শিল্পায়নের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, শিল্প খাতে বিনিয়োগের বর্তমান ধীরগতির সময়ে এ উদ্যোগ ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বন্ধ কারখানাগুলো চালু হলে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কয়েক হাজার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। পাশাপাশি পাট, টেক্সটাইল, রাসায়নিক, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ ও প্রকৌশল খাতে নতুন বিনিয়োগ এলে আমদানি বিকল্প পণ্য উৎপাদন এবং রপ্তানিমুখী শিল্প সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হবে।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, শুধু বিনিয়োগ আহ্বান করলেই কাঙ্ক্ষিত ফল আসবে না। বিনিয়োগকারীদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত স্থিতিশীলতা, সহজ ঋণপ্রাপ্তি, গ্যাস-বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ এবং দ্রুত সেবা নিশ্চিত করাও জরুরি।

শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব আব্দুন নাসের খান বলেন, দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে অলস সম্পদ হিসেবে দেখতে চায় না সরকার। এসব প্রতিষ্ঠানের জমি, অবকাঠামো ও বিদ্যমান সুবিধা কাজে লাগিয়ে নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণে কারখানাগুলো পুনরায় চালু হলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, শিল্পায়ন ত্বরান্বিত হবে এবং জাতীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

তিনি জানান, সম্প্রতি পাস হওয়া ইনভেস্ট বাংলাদেশ আইন-২০২৬ দেশের বিনিয়োগ পরিবেশকে আরও গতিশীল করবে। নতুন আইনের আওতায় বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব কর্তৃপক্ষকে একীভূত করে ইনভেস্ট বাংলাদেশ গঠন করা হচ্ছে। এর ফলে বিনিয়োগ অনুমোদন, শিল্পাঞ্চল ব্যবস্থাপনা এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব কার্যক্রম একটি সমন্বিত কাঠামোর আওতায় আসবে, যা বন্ধ ৪৪টি রাষ্ট্রায়ত্ত কারখানায় দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে সহায়ক হবে।

বৈঠকসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বৈঠকে ৪৪টি প্রতিষ্ঠানের বর্তমান অবস্থা, বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ, অনুমোদন কাঠামো এবং বাস্তবায়ন সময়সূচি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি ইজারা, যৌথ উদ্যোগ, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব বা সরাসরি বিনিয়োগের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানগুলো পরিচালনার সম্ভাব্য মডেল নিয়েও নীতিগত সিদ্ধান্তের ভিত্তি তৈরি করা হচ্ছে।

ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদদের মতে, পরিকল্পনাটি সফল হলে দীর্ঘদিনের অলস রাষ্ট্রীয় সম্পদ নতুন করে উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও রপ্তানি বৃদ্ধির চালিকাশক্তিতে পরিণত হতে পারে। আর বাস্তবায়ন ব্যর্থ হলে রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প পুনরুজ্জীবনের আরেকটি বড় সুযোগ হাতছাড়া হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই সরকারের এ নতুন রোডম্যাপকে দেশের শিল্প খাতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

This post was viewed: 8

আরো পড়ুন