মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংঘাতের পর যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে ইরানের সঙ্গে ৪০ দিনের সংঘাতের পর মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র ও অন্যান্য সমরাস্ত্রের মজুত কতটা কমেছে এবং ভবিষ্যতে চীন বা রাশিয়ার মতো প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তির সঙ্গে সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র কতটা প্রস্তুত থাকবে, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নানা প্রশ্ন উঠছে।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়া ডিফেন্স অ্যান্ড ইনোভেশন সামিটে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দেশটির প্রতিরক্ষা শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর প্রধান নির্বাহীদের দ্রুত অস্ত্র উৎপাদন বাড়ানোর আহ্বান জানান। প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথকে পাশে নিয়ে তিনি সামরিক শিল্পখাতকে আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের বিরুদ্ধে পরিচালিত ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ চলাকালে বিপুল পরিমাণ আধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র ও উচ্চপ্রযুক্তির অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভাণ্ডারের ওপর উল্লেখযোগ্য চাপ সৃষ্টি হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছরের ওই সামরিক অভিযানে যুক্তরাষ্ট্র প্রায় ১৩ হাজার লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায় এবং প্রায় এক হাজার ৭০০ ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করে। পুরো অভিযানে পেন্টাগনের ব্যয় হয় প্রায় ৩ হাজার ৭৫০ কোটি ডলার, যার বড় অংশই ক্ষেপণাস্ত্র ও গোলাবারুদ ব্যবহারে ব্যয় হয়েছে।
নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, নতুন করে সংঘাত বিস্তৃত না করার পরামর্শ পাওয়ার পর যুদ্ধবিরতির পথে এগোয় যুক্তরাষ্ট্র। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে দেশটির অস্ত্রভাণ্ডারের ওপর আরও বড় চাপ সৃষ্টি হতে পারত।
তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে অস্ত্রের ঘাটতির দাবি নাকচ করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি অস্ত্র রয়েছে।
অন্যদিকে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ সিনেটের অর্থ বরাদ্দ কমিটির কাছে অস্ত্র ও সামরিক সক্ষমতার ঘাটতি পূরণে অতিরিক্ত ৮ হাজার ৭০০ কোটি ডলারের তহবিল চেয়েছেন। বিষয়টিকে অনেক বিশ্লেষক বিদ্যমান সামরিক মজুত পুনর্গঠনের প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে দেখছেন।
ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা মার্ক কানসিয়ানের মতে, একটি টমাহক বা প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনে এক থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। ফলে এখনই উৎপাদন বাড়ানো হলেও বিদ্যমান ঘাটতি দ্রুত পূরণ করা সম্ভব হবে না।
বিশ্লেষকদের দাবি, ইরানের সঙ্গে সংঘাতে বিপুলসংখ্যক টমাহক, প্যাট্রিয়ট ও থাড প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ-পূর্ব মজুত পুনরুদ্ধার করতে ২০৩১ সাল পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
এ পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে সামরিক বিশ্লেষকেরা তথাকথিত ‘ডেভিডসন উইন্ডো’র কথাও উল্লেখ করছেন। তাঁদের আশঙ্কা, ২০২৭ সালের মধ্যে তাইওয়ানকে ঘিরে চীনের সামরিক তৎপরতা বাড়তে পারে। সে ধরনের পরিস্থিতিতে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সংঘাত সৃষ্টি হলে যুক্তরাষ্ট্রকে অস্ত্রের পর্যাপ্ত মজুত নিশ্চিত রাখার চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হতে পারে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে ইরানও বড় ধরনের সামরিক ক্ষতির মুখে পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় দেশটির ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন উৎপাদন অবকাঠামোর উল্লেখযোগ্য অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। ফলে স্বল্প সময়ে সেই সক্ষমতা পুনর্গঠন ইরানের জন্যও কঠিন হবে।
সব মিলিয়ে, যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান হলো বর্তমান অস্ত্রভাণ্ডার দিয়ে বৈশ্বিক নিরাপত্তা কৌশল বজায় রাখা সম্ভব এবং প্রতিরক্ষা শিল্পের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর মাধ্যমে ভবিষ্যতের সম্ভাব্য ঘাটতি পূরণ করা যাবে বলে তারা আশা করছে।