গাজা যুদ্ধ শেষ পর্যন্ত ইরান পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে বলে আশঙ্কা করেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। তার প্রশাসনের কয়েকজন সাবেক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে প্রকাশিত দ্য নিউ ইয়র্কারের এক প্রতিবেদনে এমন দাবি করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাইডেন প্রশাসনের কর্মকর্তারা মনে করতেন, ইসরায়েল গাজায় চলমান যুদ্ধকে কাজে লাগিয়ে ইরান ও লেবাননে হামলার সুযোগ নিতে পারে।
সাবেক কর্মকর্তাদের দাবি, গাজা যুদ্ধের বিস্তার এবং পরবর্তী সময়ে ইরানের সঙ্গে সংঘাতের জন্য বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দায়ী।
তাদের ভাষ্য, গাজা যুদ্ধের সময় ইসরায়েলকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো চাপ উল্টো ইরানের বড় ধরনের প্রতিক্রিয়া ডেকে আনতে পারত। সে ক্ষেত্রে শেষ পর্যন্ত ওয়াশিংটনকে ইসরায়েলের পাশে দাঁড়াতে হতো, যা পুরো মধ্যপ্রাচ্যে বৃহত্তর যুদ্ধের ঝুঁকি তৈরি করতে পারত।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাইডেন প্রশাসনের সময়ও ইরানের সঙ্গে উত্তেজনার মধ্যে ইসরায়েল দেশটির বিভিন্ন অবকাঠামো এবং ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে অভিযান চালায়। এসব গোষ্ঠীর মধ্যে লেবাননের হিজবুল্লাহও ছিল।
দ্য নিউ ইয়র্কারের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, বাইডেন প্রশাসন একাধিকবার নেতানিয়াহু সরকারকে ইরান ও ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোকে উসকানি না দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিল। তবে সাবেক মার্কিন কর্মকর্তাদের অভিযোগ, অনেক ক্ষেত্রেই ইসরায়েল আগাম কোনো সতর্কতা ছাড়াই অভিযান পরিচালনা করেছে।
এর উদাহরণ হিসেবে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে হিজবুল্লাহ সদস্যদের লক্ষ্য করে চালানো পেজার হামলার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, ওই অভিযানের বিষয়ে বাইডেন প্রশাসন আগে থেকে অবগত ছিল না।
এ ছাড়া হিজবুল্লাহর সাবেক প্রধান হাসান নাসরাল্লাহকে হত্যার ঘটনাকেও বাইডেন প্রশাসনের জন্য বড় ধাক্কা হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। হোয়াইট হাউসের এক সাবেক কর্মকর্তা ঘটনাটিকে বাইডেনের জন্য “অপমানজনক” বলে মন্তব্য করেছেন।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র প্রকাশ্যে ইসরায়েলের এসব পদক্ষেপের সমালোচনা না করলেও, অনেক ক্ষেত্রেই দেশটিকে রক্ষা করতে সামরিকভাবে সম্পৃক্ত হতে হয়েছে।
বিশেষ করে ২০২৪ সালের এপ্রিল ও অক্টোবরে ইরানের হামলা থেকে ইসরায়েলকে রক্ষায় যুক্তরাষ্ট্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। মার্কিন সহায়তায় ওই হামলাগুলোতে ইসরায়েলের ক্ষয়ক্ষতি সীমিত ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সাবেক কর্মকর্তাদের দাবি, নেতানিয়াহু ইরানের বিরুদ্ধে আরও হামলা চালাতে আগ্রহী ছিলেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের অনিচ্ছা সত্ত্বেও সে অবস্থান থেকে সরে আসতে চাননি।
সাবেক মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ফিলিপ গর্ডনের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে সতর্ক করলেও তারা জানত, শেষ পর্যন্ত ওয়াশিংটন তাদের রক্ষায় এগিয়ে আসবে।
দ্য নিউ ইয়র্কারের দাবি, ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার আগে বাইডেন প্রশাসনের কর্মকর্তারা নতুন প্রশাসনকে সতর্ক করে বলেছিলেন, “ইসরায়েল এই সুযোগ হাতছাড়া করবে না।”
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের শুরুতেই যুক্তরাষ্ট্র দুই দফায় ইরানের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে।
সর্বশেষ সংঘাতের সময় মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও দাবি করেন, ইসরায়েল ইরানে হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। ওই হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত মার্কিন সেনাদের ওপরও হামলার আশঙ্কা ছিল। এ কারণেই যুক্তরাষ্ট্র আগাম পদক্ষেপ নেয় বলে তিনি জানান।
প্রতিবেদনে সাবেক বাইডেন প্রশাসনের কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে আরও বলা হয়েছে, ইসরায়েলের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের দৃঢ় সমর্থন দেশটির সরকারকে আরও কঠোর পদক্ষেপ নিতে উৎসাহিত করেছে।
ফিলিপ গর্ডন বলেন, ইসরায়েলের প্রতি অবিচল সমর্থনের কারণে যুক্তরাষ্ট্র একটি “নৈতিক ঝুঁকির” মধ্যে পড়েছে।
কয়েকজন সাবেক কর্মকর্তা মনে করেন, ইরানের সঙ্গে সংঘাতকে অনেক দিক থেকেই ইসরায়েল-হামাস যুদ্ধের ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখা যেতে পারে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মূল্যায়ন ছিল, ইরান সরাসরি যুদ্ধে না গিয়ে হামাস, হিজবুল্লাহ ও হুতিদের মতো মিত্র গোষ্ঠীগুলোর মাধ্যমে সংঘাত চালিয়ে যাবে।
তবে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর প্রস্তুত করা কিছু গোয়েন্দা প্রতিবেদনে ইঙ্গিত পাওয়া যায়, ইরানের একটি অংশ মনে করেছিল, এটিই ইসরায়েলকে ধ্বংস করার সুযোগ।
বর্তমানে সম্ভাব্য নতুন সংঘাতের আশঙ্কায় ইসরায়েল সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। একই সময়ে বাইডেন প্রশাসনের সাবেক কর্মকর্তারা অভিযোগ করছেন, গাজা যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়া, ইরান পর্যন্ত সংঘাত ছড়িয়ে পড়া এবং আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতার পেছনে ট্রাম্প প্রশাসনের ভূমিকা রয়েছে।