বাংলাদেশ ও চীনের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করতে উৎপাদনভিত্তিক বিনিয়োগ, শিল্পায়ন এবং রপ্তানি বহুমুখীকরণের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। তিনি বলেন, বাংলাদেশ শুধু বিনিয়োগ নয়, এমন বিনিয়োগ চায় যা উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করবে।
রোববার রাজধানীতে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির সাউথ এশিয়ান ইনস্টিটিউট অব পলিসি অ্যান্ড গভর্ন্যান্স আয়োজিত ‘বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক: বর্ধিত আস্থা ও নতুন দিক-নির্দেশনা’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
ড. তিতুমীর বলেন, বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনার ক্ষেত্র শিল্পায়ন। চীনের প্রযুক্তি, অভিজ্ঞতা ও সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ বৈশ্বিক উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থায় আরও শক্ত অবস্থান গড়ে তুলতে চায়।
তিনি জানান, ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত করাই সরকারের লক্ষ্য। এ উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে অর্থনীতির পুনরুদ্ধার, পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও পুনর্গঠনের পাশাপাশি উৎপাদনমুখী বিনিয়োগ, শিল্পায়ন, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং রপ্তানি সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
দুই দেশের বাণিজ্য সম্পর্কে ভারসাম্যহীনতার বিষয়টি তুলে ধরে তিনি বলেন, বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ২৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছালেও চীনে বাংলাদেশের রপ্তানি এখনো ১ বিলিয়ন ডলারের কম। এ ব্যবধান কমাতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।
চীনের শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত বাজার সুবিধা কাজে লাগিয়ে তৈরি পোশাকের পাশাপাশি পাট ও পাটজাত পণ্য, চামড়াজাত পণ্য, ওষুধ এবং কৃষিপণ্যের মতো মূল্য সংযোজন পণ্যের রপ্তানি বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
বাংলাদেশি পেয়ারা ও কাঁঠালের জন্য চীনের বাজার উন্মুক্ত হওয়ার উদ্যোগকে ইতিবাচক উল্লেখ করে ড. তিতুমীর বলেন, ভবিষ্যতে আরও সম্ভাবনাময় বাংলাদেশি পণ্যের জন্য চীনের বাজারে প্রবেশাধিকার বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, চীনা বিনিয়োগকে একটি অর্থনৈতিক অঞ্চলে সীমাবদ্ধ না রেখে দেশের অন্যান্য বেসরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং বিভিন্ন শিল্পখাতে সম্প্রসারণ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে শিল্প স্থানান্তর ও বৈশ্বিক মূল্য শৃঙ্খলে যুক্ত হওয়ার নতুন সুযোগ কাজে লাগাতে হবে।
যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, চট্টগ্রামকে আঞ্চলিক সরবরাহ ও পরিবহন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য রয়েছে। এ জন্য পূর্ব এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন অঞ্চলের সঙ্গে সংযোগ জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তিনি মোংলা বন্দরের আধুনিকায়ন, রেল যোগাযোগ উন্নয়ন এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম দ্রুতগতির রেলপথ নির্মাণের প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করেন।
কুনমিং-চট্টগ্রাম বহুমুখী পরিবহন করিডোর এবং বাংলাদেশ-চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডোর নিয়েও ইতিবাচক অবস্থানের কথা জানান তিনি।
জ্বালানি ও পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনায় চীনের সঙ্গে সহযোগিতা বৃদ্ধির আহ্বান জানিয়ে ড. তিতুমীর বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বিদ্যুৎ উৎপাদন, জ্বালানি দক্ষতা এবং ব্যবস্থাপনা প্রযুক্তিতে দুই দেশের যৌথভাবে কাজ করার সুযোগ রয়েছে।
তিনি তিস্তা নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পে চীনের কারিগরি ও আর্থিক সহযোগিতা প্রত্যাশা করেন। একই সঙ্গে বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নদীশাসন, ড্রেজিং প্রযুক্তি এবং পানি ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতা আরও বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন।
রোহিঙ্গা সংকট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, রাখাইন থেকে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও টেকসই প্রত্যাবাসনে চীনের গঠনমূলক ভূমিকার প্রশংসা করে বাংলাদেশ। এ বিষয়ে বেইজিংয়ের সক্রিয় সহযোগিতা ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক চীন সফরের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে ড. তিতুমীর বলেন, এ সফরের মাধ্যমে বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক সর্বোচ্চ কৌশলগত পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে। এখন সেই সম্পর্কের সুফল জনগণের কাছে পৌঁছে দিতে অর্থনৈতিক সহযোগিতা আরও সম্প্রসারণ করতে হবে।
তিনি বলেন, বর্তমান বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার সময়ে সরবরাহ শৃঙ্খল শক্তিশালী করতে উৎপাদনভিত্তিক বিনিয়োগের বিকল্প নেই। ভবিষ্যতে ঢাকা-বেইজিং সম্পর্কের কেন্দ্রবিন্দু হবে শিল্পায়ন, বিনিয়োগ এবং মানবসম্পদ উন্নয়ন।
সেমিনারে নীতিনির্ধারক, কূটনীতিক, গবেষক, চীনা বিশেষজ্ঞ, গণমাধ্যমকর্মী, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা অংশ নেন।