উত্তর আফ্রিকা ও হর্ন অব আফ্রিকাজুড়ে তীব্র তাপপ্রবাহের প্রভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে উট। ‘মরুভূমির জাহাজ’ নামে পরিচিত এই প্রাণী ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা সহজেই সহ্য করতে পারলেও সাহারার অনেক এলাকায় তাপমাত্রা ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম করায় উটের মৃত্যুহার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
ইথিওপিয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চলের আফার অঞ্চল, যা বিশ্বের অন্যতম উষ্ণ এলাকা হিসেবে পরিচিত, সেখানে উট পালনকারীরা পরিস্থিতিকে ভয়াবহ বলে বর্ণনা করছেন। সেমেরা এলাকার বাসিন্দা ও প্রায় ৫০০ উটের মালিক আলী উমর বিবিসিকে বলেন, “আমি আমার উটগুলোকে চরম যন্ত্রণায় ভুগতে দেখছি।”
৪০ বছর বয়সী এই খামারি জানান, অতিরিক্ত গরমে উটগুলোর পায়ে ফোসকা পড়ছে, চোখ দিয়ে পানি ঝরছে। উত্তপ্ত বালুর ওপর বসতে গিয়ে তাদের চামড়া পুড়ে যাচ্ছে এবং লোম ঝরে পড়ছে। গত এক মাসেই তীব্র দাবদাহে তার ৮টি উটের বাচ্চা মারা গেছে।
শুধু ইথিওপিয়াই নয়, সোমালিয়া ও কেনিয়াতেও একই ধরনের পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে। কেনিয়ার মারসাবিট কাউন্টির পশুচিকিৎসক হাসান নুয়া গুইয়ো জানিয়েছেন, গত ২ বছরে ওই এলাকায় গরমজনিত কারণে উটের মৃত্যু ১৫ শতাংশ বেড়েছে। অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে উটগুলো হাইপারথার্মিয়াসহ বিভিন্ন সংক্রমণে আক্রান্ত হচ্ছে।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার বিজ্ঞানী ড. মোহাম্মদ বেঙ্গুমি বলেন, সাহারার অনেক অঞ্চলে এখন প্রায়ই তাপমাত্রা ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি উঠছে। এতে উটের স্বাভাবিক শারীরিক কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
আলজেরিয়ার ঘারদাইয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবদেলমাজিদ চেহমা বলেন, তাদের গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘ সময় ধরে ৪১ থেকে ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রায় থাকলে উটের কোষ সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে শ্বেত রক্তকণিকার ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ে এবং কোষগুলো নিজেকে পুনর্গঠন করতে না পেরে ধ্বংস হতে শুরু করে। ফলস্বরূপ বিপাকক্রিয়া ধীর হয়ে প্রাণীগুলো চরম অবসাদে ভোগে।
চরম তাপপ্রবাহের কারণে ইথিওপিয়ার অনেক খামারি দক্ষিণাঞ্চলের অপেক্ষাকৃত শীতল এলাকায় সরে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। তবে আলী উমর আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, এখন তিনি বড় উটগুলোকেও হারানোর ভয় করছেন।
অধ্যাপক চেহমার ভাষায়, উট মরুভূমির মানুষের টিকে থাকার অন্যতম প্রধান অবলম্বন। কিন্তু বর্তমান তীব্র তাপপ্রবাহ তাদের স্বাভাবিক শারীরিক সক্ষমতাকে যেভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে, তাতে এই প্রাণী এখন জলবায়ু পরিবর্তনের প্রত্যক্ষ শিকার হয়ে উঠেছে।