ভারতের নিট পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা জেন জি আন্দোলন দেশটির সীমানা ছাড়িয়ে প্রতিবেশী দেশগুলোতেও আলোচনার জন্ম দিয়েছে। টানা আন্দোলনের মুখে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকারকে নতি স্বীকার করতে হয় এবং শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করেন। এই আন্দোলনের প্রতি শ্রীলঙ্কা, নেপাল ও পাকিস্তানের বহু তরুণ প্রকাশ্যে সমর্থন জানিয়েছেন।
এতদিন ভারতের নতুন প্রজন্মকে এমন একটি গোষ্ঠী হিসেবে দেখা হতো, যারা সারাদিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সময় কাটায়, মনোযোগ কম এবং সবকিছুকে হাসি-ঠাট্টার বিষয় বানায়। তবে গত এক মাসের আন্দোলন সেই ধারণা বদলে দিয়েছে।
আন্দোলনে প্রচলিত রাজনৈতিক ইশতেহারের বদলে মিম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ছোট ভিডিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ইনস্টাগ্রামের স্বল্পদৈর্ঘ্যের ভিডিও কর্মী সংগঠনের মাধ্যম হয়ে ওঠে, আর বিভিন্ন ভিডিও ক্লিপ পুলিশি পদক্ষেপের প্রমাণ হিসেবে ছড়িয়ে পড়ে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসিকে দেওয়া প্রতিক্রিয়ায় এক পাকিস্তানি তরুণী বলেন, ‘‘কহিন পেয়ার না হো যায়ে…ইতনা আছা করোগে তো আমি নফরাত কইসে করেঙ্গে।’’ অর্থাৎ, ‘‘তোমরা যদি এত দারুণ কাজ করো, তাহলে আমি তোমাদের ঘৃণা করব কীভাবে?’’ সীমান্তের বিভাজন থাকলেও নতুন প্রজন্মের এই আন্দোলন মানুষকে একসূত্রে বেঁধেছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
শ্রীলঙ্কা ও নেপাল থেকেও আন্দোলনের প্রতি ব্যাপক সমর্থন এসেছে। ২০২২ সালের অর্থনৈতিক সংকটের সময় রাজাপাকসে সরকারবিরোধী আন্দোলনের স্মৃতি এখনও শ্রীলঙ্কার তরুণদের মধ্যে রয়েছে। সেই অভিজ্ঞতার প্রতিফলন দেখা গেছে দেশটির রাজনৈতিক কার্টুন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন পোস্টে।
শ্রীলঙ্কার কার্টুনিস্ট অবান্থা আরটিগালা এক কার্টুনে দেখিয়েছেন, কীভাবে ‘ককরোচ’ বা তেলাপোকাসম আন্দোলনকারীদের সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে ভারতের সরকার।
আন্দোলনের অন্যতম প্রতীক হয়ে উঠেছে মুম্বাইয়ের তরুণী রিও আহিরের একটি স্থিরচিত্র। ছবিতে দেখা যায়, পুলিশের প্রিজন ভ্যানের গতি থামাতে তিনি এক হাত গাড়ির ওপর রেখে দাঁড়িয়ে আছেন। অনেকেই এই দৃশ্যের সঙ্গে ১৯৮৯ সালের চীনের তিয়েনআনমেন স্কয়ারের ঐতিহাসিক ‘ট্যাংক ম্যান’-এর ছবির তুলনা করেছেন।
নেপালের কনটেন্ট নির্মাতা অবিনাশ মিশ্র বলেন, আন্দোলনকারীদের ক্ষোভ ও অনুভূতি পুরোপুরি যৌক্তিক। ২০২৫ সালে নেপালের জেন জি আন্দোলনের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, তোমরা যা অনুভব করছ তা সঠিক, লড়াইয়ের লক্ষ্য যেন কখনো হারিয়ে না যায়।
সবচেয়ে আলোচিত প্রতিক্রিয়া এসেছে পাকিস্তান থেকে। দুই দেশের রাজনৈতিক সম্পর্কের টানাপোড়েনের মধ্যেও অনেক পাকিস্তানি তরুণ ভারতের আন্দোলনকারীদের প্রকাশ্যে প্রশংসা করেছেন।
এক পাকিস্তানি তরুণ বলেন, ‘‘সুযোগ পেলে আমাদেরও এভাবে রাস্তায় নামা উচিত। ককরোচ জনতা পার্টি সত্যিই দারুণ। তারা খুব বেশি ভাবগাম্ভীর্য দেখায়নি, তাদের এই ব্যাপারটা আমার দারুণ লেগেছে।’’
আরেক তরুণ বলেন, মুম্বাইয়ে এক পথচারী পুলিশের ভ্যানের ছিটকিনি খুলে আটকে থাকা শিক্ষার্থীদের পালানোর সুযোগ করে দেওয়ার ঘটনা তাকে মুগ্ধ করেছে। তিনি বলেন, ভারতের আন্দোলনের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল ঐক্য। হিন্দু-মুসলিম বা জাতিগত বিভেদ ভুলে তারা এক হয়েছিল। কিন্তু পাকিস্তানে পাঞ্জাবি, পশতুন, সুন্নি ও শিয়া বিভাজনের কারণে এমন ঐক্য গড়ে তোলা কঠিন।
আন্দোলনে পাকিস্তানি অর্থায়নের অভিযোগ নিয়ে ব্যঙ্গ করে দেশটির কনটেন্ট নির্মাতা বিলাল হাসান বলেন, মানুষ বলছে পাকিস্তান নাকি এতে অর্থায়ন করেছে। অথচ নিজেদের দেশ চালানোরই টাকা নেই, তারা আবার অন্যকে অর্থ দেবে কীভাবে?
তিনি বলেন, ভারতে শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশ লাঠিচার্জ করছে, আর আমাদের দেশে মানুষকেই গায়েব করে দেওয়া হয়। যদি আপনি বেলুচ হন, তাহলে মানুষটি বেঁচে আছে না মরে গেছে তাও জানা যাবে না। আমাদের এখানে মানুষ এক প্লেট বিরিয়ানির জন্য বিক্রি হয়ে যায়।
দুই দেশের মানুষের সম্পর্কের প্রসঙ্গে বিলাল হাসান বলেন, দিনশেষে আমরা একে অপরকে বুঝি। কারণ আমরা তো একই বিচ্ছেদের (দেশভাগ) সন্তান।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দিল্লিতে সিজেপির আন্দোলন যখন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছিল, তখন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের তরুণেরা এই বিক্ষোভকে শুধু ভিডিও, মিম বা স্লোগান হিসেবে দেখেননি; বরং সম্মান ও আগ্রহ নিয়ে তা অনুসরণ করেছেন।