নাটোরে এক চিকিৎসকের বিরুদ্ধে ভুল অস্ত্রোপচারের অভিযোগ তুলে তাঁর বিচার ও ক্ষতিপূরণ দাবি করেছেন ভুক্তভোগীদের স্বজনরা। অভিযোগ অনুযায়ী, কাঁধের টিউমার অপসারণ করতে গিয়ে এক কৃষকের মৃত্যু হয়েছে। একই চিকিৎসকের অস্ত্রোপচারের পর আরও ৩ জন গুরুতর জটিলতায় ভুগছেন এবং তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ পঙ্গুত্বের ঝুঁকিতে রয়েছেন।
শনিবার গুরুদাসপুর উপজেলার সিধুলি গ্রামে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেন ভুক্তভোগীদের স্বজনরা।
অভিযোগের মুখে থাকা চিকিৎসক জাহিদুল ইসলাম গুরুদাসপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের হাড়ের রোগ বিশেষজ্ঞ। বড়াইগ্রামের বনপাড়ায় তাঁর ব্যক্তিগত জাহেদা ক্লিনিকে এসব অস্ত্রোপচার করা হয়েছিল।
অস্ত্রোপচারের পর পা থেকে বের হচ্ছে পুঁজ
গুরুদাসপুর পৌর শহরের চাঁচকৈড় মধ্যমপাড়া এলাকার বাসিন্দা নাজিমুদ্দিন (৫২) মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ডান হাঁটুতে আঘাত পান। পরে ৬০ হাজার টাকায় জাহেদা ক্লিনিকে তাঁর অস্ত্রোপচার করেন চিকিৎসক জাহিদুল।
নাজিমুদ্দিন জানান, অস্ত্রোপচারের ৫ দিন পর থেকেই ক্ষতস্থান থেকে পুঁজ বের হতে শুরু করে। শনিবার তাঁর বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, ব্যান্ডেজ বাঁধা পা নিয়ে তিনি ব্যথায় কাতরাচ্ছেন।
তিনি বলেন, অস্ত্রোপচারের প্রায় এক সপ্তাহ পর ক্ষতস্থানে পচন শুরু হয়। এরপর প্রায় ৮ মাস ওই চিকিৎসকের কাছে ড্রেসিং করাতে প্রায় আড়াই লাখ টাকা ব্যয় করলেও অবস্থার উন্নতি হয়নি। বর্তমানে তিনি অর্থোপেডিক বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক বি কে দামের অধীনে চিকিৎসা নিচ্ছেন।
অধ্যাপক বি কে দাম জানিয়েছেন, নাজিমুদ্দিনের অস্ত্রোপচার সফল হয়নি। পচন নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে তাঁর পা কেটে ফেলতে হতে পারে।
অস্ত্রোপচারের পর অচল জহুরার হাত
বড়াইগ্রাম উপজেলার ভবানীপুর-আটঘরিয়া গ্রামের জহুরা বেগম (৬০) বাঁ হাতের অস্ত্রোপচার করান চিকিৎসক জাহিদুল ইসলামের কাছে।
তিনি জানান, পড়ে গিয়ে তাঁর বাঁ কবজির হাড় ভেঙে যায়। অস্ত্রোপচারের পর হাতে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে, যা প্রায় ৭ মাস স্থায়ী হয়। ৩০ হাজার টাকা দিয়ে অস্ত্রোপচার করানোর পর সংক্রমণের চিকিৎসায় প্রায় ৮ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। বর্তমানে তিনি ওই হাত দিয়ে কোনো কাজ করতে পারেন না এবং কবজিও আর ভাঁজ করতে পারেন না।
টিউমার অপসারণে কৃষকের মৃত্যু
জুনের শুরুতে ঘাড়ের ছোট একটি টিউমার অপসারণের জন্য লালপুর উপজেলার দুয়ারিয়া ইউনিয়নের ডাঙ্গাপাড়া গ্রামের কৃষক ওসমান গণিকে (৬৫) জাহেদা ক্লিনিকে ভর্তি করা হয়।
স্বজনদের অভিযোগ, সন্ধ্যার পর চিকিৎসক জাহিদুল ইসলাম অস্ত্রোপচার শুরু করেন। প্রায় আধঘণ্টা পর তিনি অস্ত্রোপচার কক্ষ থেকে বেরিয়ে চলে যান। এরপর রোগীর আর কোনো সাড়া মেলেনি। পরে তাঁকে বড়াইগ্রাম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে চিকিৎসকেরা জানান, তিনি আগেই মারা গেছেন।
নিহত ওসমান গণি ছিলেন ডাঙ্গাপাড়া গ্রামের লেদু মালিথার ছেলে।
পায়ের হাড়ে ড্রিলের ফলা রেখেই সেলাইয়ের অভিযোগ
গুরুদাসপুর উপজেলার সিধুলি গ্রামের আনোয়ারা বেগমের বাঁ পায়ের গোড়ালির কাছে হাড় ভেঙে গেলে ৩ জুন তাঁকে গুরুদাসপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। পরে চিকিৎসক জাহিদুল ইসলাম তাঁকে ব্যক্তিগত জাহেদা ক্লিনিকে অস্ত্রোপচারের পরামর্শ দেন।
৬০ হাজার টাকায় অস্ত্রোপচার করা হয়। তবে তাঁর স্বামী লালচান মোহাম্মদ অভিযোগ করেন, অস্ত্রোপচারের ৩ থেকে ৪ দিন পর থেকেই ক্ষতস্থান থেকে পুঁজ বের হতে শুরু করে। প্রায় ২৫ দিন গুরুদাসপুর হাসপাতালে ড্রেসিং করানোর পরও অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় তাঁকে ঢাকায় নিয়ে যেতে হয়।
এ বিষয়ে চিকিৎসক জাহিদুল ইসলাম অস্ত্রোপচারের সময় ড্রিল মেশিনের একটি ফলা ভেঙে রোগীর হাড়ের ভেতরে ঢুকে যাওয়ার ঘটনা স্বীকার করেছেন। তবে তিনি দাবি করেন, তিনি কাউকে ভুল চিকিৎসা দেননি।