Skip to main content

Ridge Bangla

রূপপুর প্রকল্পের ব্যয় ও অর্থছাড় নিয়ে বিভ্রান্তিকর ব্যাখ্যা দেওয়া হচ্ছে, দাবি এনপিসিবিএলের

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণ ব্যয়, সরঞ্জামের মূল্য এবং অর্থছাড়ের প্রক্রিয়া নিয়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত অনিয়ম ও অতিরিক্ত ব্যয়ের খবরকে চুক্তিগত ও কারিগরি কাঠামোর ভুল ব্যাখ্যা বলে দাবি করেছে নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড। সংস্থাটি বলেছে, প্রকল্পের বিশেষ চুক্তি ও জটিল অর্থায়ন কাঠামো সম্পর্কে পূর্ণ ধারণা ছাড়াই বিচ্ছিন্ন তথ্যের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করায় এ ধরনের বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

শুক্রবার (২৪ জুলাই) এ বিষয়ে দেওয়া লিখিত ব্যাখ্যায় এনপিসিবিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. জাহেদুল হাসান বলেন, বাংলাদেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বর্তমানে পরিচালনার প্রস্তুতির শেষ পর্যায়ে রয়েছে। তিনি জানান, পরিকল্পনা, নকশা, অর্থায়ন, নির্মাণ, পরীক্ষা ও কমিশনিংসহ প্রকল্পের প্রতিটি ধাপ প্রচলিত অবকাঠামো প্রকল্পের তুলনায় সম্পূর্ণ ভিন্ন।

তিনি জানান, বাংলাদেশ ও রাশিয়ান ফেডারেশনের মধ্যে স্বাক্ষরিত আন্তঃসরকারি চুক্তির আওতায় রূপপুর প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এ চুক্তির ভিত্তিতে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন ও জেএসসি অ্যাটমস্ট্রয়এক্সপোর্টের মধ্যে ইঞ্জিনিয়ারিং, প্রকিউরমেন্ট, কনস্ট্রাকশন অ্যান্ড কমিশনিং চুক্তি এবং প্রকল্পের অর্থায়নের জন্য পৃথক আন্তঃসরকারি ঋণচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে।

ড. জাহেদুল হাসান বলেন, ইঞ্জিনিয়ারিং, প্রকিউরমেন্ট, কনস্ট্রাকশন অ্যান্ড কমিশনিং চুক্তি কোনো নির্দিষ্ট যন্ত্রপাতি ক্রয় বা সরবরাহের চুক্তি নয়। এটি একটি পূর্ণাঙ্গ পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নকশা, নির্মাণ, পরীক্ষা, কমিশনিং এবং নিরাপদভাবে পরিচালনার উপযোগী অবস্থায় হস্তান্তরের চুক্তি। এর আওতায় প্রকৌশল নকশা, নিরাপত্তা বিশ্লেষণ, যন্ত্রপাতি উৎপাদন, স্থাপন, সিস্টেম সমন্বয়, কমিশনিং, প্রযুক্তিগত নথিপত্র প্রস্তুত এবং অপারেটরদের প্রশিক্ষণসহ সব কার্যক্রম অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, এ কারণে এ চুক্তিতে কোনো যন্ত্রপাতি, ভবন, পাইপলাইন, নির্মাণকাজ, স্থাপন, কমিশনিং বা অন্য কোনো পৃথক উপাদানের জন্য আলাদা মূল্য নির্ধারণ করা হয়নি। পুরো বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য একটি সমন্বিত চুক্তিমূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে এবং সেই অনুযায়ী বিভিন্ন ধাপে অর্থপ্রদানের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। ফলে কোনো ধাপভিত্তিক অর্থপ্রদানকে নির্দিষ্ট যন্ত্রপাতি, নির্মাণকাজ, সরবরাহ বা কমিশনিংয়ের মূল্য হিসেবে উপস্থাপন করা প্রকল্পের প্রকৃত চুক্তিগত কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

অর্থায়ন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, প্রকল্পের মোট ব্যয়ের ১০ শতাংশ বহন করছে বাংলাদেশ সরকার এবং বাকি ৯০ শতাংশ রাশিয়ান সরকারের রাষ্ট্রীয় ঋণ থেকে অর্থায়ন করা হচ্ছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ইঞ্জিনিয়ারিং, প্রকিউরমেন্ট, কনস্ট্রাকশন অ্যান্ড কমিশনিং চুক্তি প্রকল্পের প্রযুক্তিগত বাস্তবায়ন নির্ধারণ করে, আর আন্তঃসরকারি ঋণচুক্তি অর্থছাড় ও ঋণ ব্যবস্থাপনা পরিচালনা করে। দুটি চুক্তির উদ্দেশ্য আলাদা হলেও উভয়ই একই প্রকল্পের অংশ।

অর্থছাড়ের প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করে ড. জাহেদুল হাসান বলেন, কোনো ধাপের কাজ সম্পন্ন হলেই বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের ঠিকাদারকে অর্থ পরিশোধের ক্ষমতা বা অধিকার থাকে না। প্রথমে সংশ্লিষ্ট কাজ চুক্তি অনুযায়ী যাচাই করে গ্রহণযোগ্যতার নথিতে স্বাক্ষর করা হয়। এরপর ঋণচুক্তির আওতায় সেটি অর্থছাড়ের উপযুক্ত হিসেবে বিবেচিত হয়। পরে রাশিয়ান ফেডারেশনের অর্থ মন্ত্রণালয় নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রীয় ঋণের অর্থ ছাড় করে। ফলে কোনো ধাপ সম্পন্ন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অর্থ পরিশোধ করা হয় না এবং বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন নিজ উদ্যোগে অর্থ ছাড় করতে পারে না।

তিনি আরও বলেন, ধাপভিত্তিক অর্থপ্রদান কোনো নির্দিষ্ট কাজ, যন্ত্রপাতি, সরবরাহ, স্থাপন বা কমিশনিংয়ের মূল্য নয়। এটি পুরো পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ, স্থাপন, পরীক্ষা ও কমিশনিংয়ের অগ্রগতির একটি নির্ধারিত ধাপ সফলভাবে সম্পন্ন হওয়ার বিপরীতে চুক্তিতে নির্ধারিত অর্থপ্রদানের ব্যবস্থা। তাই একে নির্দিষ্ট কোনো কাজ বা যন্ত্রপাতির মূল্য হিসেবে বিবেচনা করা সঠিক নয়।

ড. জাহেদুল হাসান বলেন, সমন্বিত চুক্তিমূল্যভিত্তিক এই চুক্তিতে কোনো পৃথক নির্মাণকাজ, যন্ত্রপাতি, সরবরাহ, স্থাপন বা কমিশনিংয়ের জন্য আলাদা মূল্য নির্ধারণ করা হয়নি। কিন্তু বিভিন্ন আলোচনায় ধাপভিত্তিক অর্থপ্রদানকে নির্দিষ্ট কাজ বা যন্ত্রপাতির মূল্য হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে, যা প্রকৃত চুক্তিগত কাঠামোর ভুল ব্যাখ্যা।

তিনি জানান, রূপপুর প্রকল্পে ব্যবহৃত ভিভিইআর-১২০০ জেনারেশন থ্রি প্লাস প্রযুক্তি একটি সমন্বিত ও মালিকানাধীন পারমাণবিক প্রযুক্তি। এর নিরাপত্তা, নির্ভরযোগ্যতা ও লাইসেন্সিং নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইঞ্জিনিয়ারিং, প্রকিউরমেন্ট, কনস্ট্রাকশন অ্যান্ড কমিশনিং পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশি অপারেটরদের প্রশিক্ষণ এবং প্রযুক্তি হস্তান্তরও প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

সরকারি ক্রয় আইন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, প্রতিযোগিতামূলক ক্রয় সাধারণ নীতি হলেও প্রযুক্তিগত এককত্ব, মেধাস্বত্ব, নিরাপত্তাজনিত প্রয়োজন এবং আন্তঃসরকারি চুক্তির ক্ষেত্রে একক উৎস থেকে ক্রয়ের আইনগত ভিত্তি রয়েছে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পও এমন বিশেষ প্রকৃতির আন্তর্জাতিক প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত।

ড. জাহেদুল হাসান আরও বলেন, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প দেশের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা, উচ্চপ্রযুক্তি সক্ষমতা ও টেকসই উন্নয়নের জন্য একটি কৌশলগত বিনিয়োগ। তাই প্রকল্পটি নিয়ে আলোচনা ও মূল্যায়নের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পারমাণবিক প্রকল্প বাস্তবায়নের নীতি, চুক্তিগত বাস্তবতা এবং অর্থায়ন কাঠামো সমন্বিতভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। তার মতে, তথ্যভিত্তিক ও দায়িত্বশীল আলোচনা জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং সঠিক তথ্য প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

This post was viewed: 4

আরো পড়ুন