চোখে আলো নেই, কিন্তু জীবনের প্রতি অদম্য ইচ্ছাশক্তিই তাকে এগিয়ে নিয়ে চলেছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জের ভোলাহাট উপজেলার তেলিপাড়া গ্রামের ৫৬ বছর বয়সী দৃষ্টি প্রতিবন্ধী মুখলেসুর রহমান গত ৫০ বছর ধরে কঠোর পরিশ্রম করে বৃদ্ধা মায়ের ভরণপোষণের দায়িত্ব পালন করে চলেছেন।
জন্মের সময় সুস্থ থাকলেও মাত্র ছয় বছর বয়সে অসুস্থ হয়ে ধীরে ধীরে দৃষ্টিশক্তি হারান মুখলেসুর। এরপর থেকেই শুরু হয় জীবনের কঠিন সংগ্রাম। বর্তমানে ৭০ বছর বয়সী মা রলি বেগমকে নিয়ে তার ছোট সংসার। দুজনের খাবার ও ন্যূনতম প্রয়োজন মেটাতে প্রতিদিন বাড়ি থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার হেঁটে একটি কাঠকাটা মিলে যান তিনি।
কোনো সহায়তা ছাড়াই শুধুমাত্র স্পর্শ আর দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার ওপর ভর করে প্রতিদিন একই পথে যাতায়াত করেন মুখলেসুর। মিলে পৌঁছে ইট দিয়ে আঘাত করে গাছের শক্ত ছাল ছাড়ানোর কাজ করেন। দিনশেষে সেই কাঠ বস্তায় ভরে মাথায় করে বাড়িতে নিয়ে আসেন।
বৃদ্ধা মা রলি বেগম কাঠগুলো রোদে শুকিয়ে বাজারে বিক্রি করেন। সেই সামান্য আয়ে কোনো রকমে চলে মা-ছেলের সংসার এবং চিকিৎসার খরচ।
স্থানীয়দের ভাষ্য, মুখলেসুর চাইলে মানুষের কাছে সাহায্য চাইতে পারতেন। কিন্তু তিনি কখনো ভিক্ষা বা দানের ওপর নির্ভর না করে নিজের শ্রমে জীবনযাপনকেই বেছে নিয়েছেন। তাদের মতে, মায়ের প্রতি তার দায়িত্ববোধ ও সততা সমাজের জন্য অনুকরণীয় উদাহরণ।
পরিবারের আর্থিক সংকটের মধ্যে এক ভাই থাকলেও দারিদ্র্যের কারণে তিনিও তেমন সহায়তা করতে পারেন না। ফলে কষ্টই যেন মা-ছেলের নিত্যসঙ্গী হয়ে উঠেছে।
স্থানীয় এক মিল ব্যবসায়ী জানান, মুখলেসুর প্রতিদিন প্রায় দুই থেকে আড়াই মণ খড়ি সংগ্রহ করেন। সেগুলো বিক্রি করে যে অর্থ আসে, তা দিয়েই সংসারের খরচ ও মায়ের চিকিৎসা চালানোর চেষ্টা করেন।
ভোলাহাট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পিয়ার জাহান বলেন, মুখলেসুর প্রতিবন্ধী ভাতা পান এবং তার মা বিধবা ও বয়স্ক ভাতার আওতায় রয়েছেন। এছাড়া ঈদের সময়ও তাদের সহায়তা দেওয়া হয়। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে এ সহায়তা তাদের প্রয়োজনের তুলনায় যথেষ্ট নয়।
মা-ছেলের এই সংগ্রামী জীবনের কথা বিবেচনায় নিয়ে সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি ও বিভিন্ন সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের প্রতি তাদের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও এলাকাবাসী।