Ridge Bangla

কম খরচের চীনা এআই মডেলের চাপে মার্কিন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) শীর্ষ প্রযুক্তি উন্নয়নে বিপুল অর্থ ও গবেষণা বিনিয়োগ করেও বাড়তি চাপের মুখে পড়েছে যুক্তরাষ্ট্রের বড় এআই প্রতিষ্ঠানগুলো। কারণ, চীনের বিভিন্ন প্রযুক্তি কোম্পানি উন্নতমানের এআই মডেল কম খরচে, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে বিনামূল্যেই উন্মুক্ত করে দিচ্ছে, যা বৈশ্বিক বাজারে দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।

অ্যানথ্রপিক ও ওপেনএআইয়ের মতো মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলো যেখানে প্রতিটি নতুন প্রজন্মের ফ্রন্টিয়ার মডেল তৈরি করতে বিপুল সম্পদ ব্যয় করছে, সেখানে চীনের কয়েকটি গবেষণাগার একই ধরনের সক্ষমতার মডেল উন্মুক্ত ব্যবহারের জন্য প্রকাশ করছে। ফলে প্রযুক্তিগত ব্যবধান দ্রুত কমে আসছে।

গত ১৬ জুলাই চীনা স্টার্টআপ মুনশট এআই তাদের নতুন মডেল ‘কিমি কে৩’ প্রকাশ করে। কোম্পানিটির দাবি, এটি অ্যানথ্রপিকের ‘ফেবল’ এবং ওপেনএআইয়ের ‘সল’ মডেলের কাছাকাছি সক্ষমতার। চলতি মাসের শেষ দিকে মডেলটির ‘ওয়েটস’ বা প্যারামিটার সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে, যাতে যে কেউ শক্তিশালী সার্ভারে এটি চালাতে পারেন।

এর কয়েক দিনের মধ্যেই আলিবাবা তাদের ‘কিউয়েন’ মডেলের নতুন সংস্করণ প্রকাশ করে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, সক্ষমতার দিক থেকে এটি ‘ফেবল’-এর পরেই অবস্থান করছে।

গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইপক এআইয়ের বিশ্লেষণ বলছে, বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী ওপেন-ওয়েট এআই মডেলগুলোর বেশিরভাগই এখন চীন থেকে আসছে। এগুলো প্রযুক্তিগতভাবে শীর্ষ মডেলগুলোর তুলনায় মাত্র কয়েক মাস পিছিয়ে রয়েছে।

এআই মডেল ব্যবহারের প্রবণতাও দ্রুত বদলাচ্ছে। জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্ম ওপেনরাউটারের তথ্য অনুযায়ী, গত মে মাসে ব্যবহারকারীরা মার্কিন ও চীনা শীর্ষ মডেল প্রায় সমান হারে ব্যবহার করেছেন। তবে জুনে মার্কিন মডেলের ব্যবহার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ বাড়লেও একই সময়ে চীনা মডেলের ব্যবহার তিন গুণ বৃদ্ধি পায়।

এই পরিবর্তন শুধু প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকেই নয়, যুক্তরাষ্ট্র সরকারকেও উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। ওয়াশিংটনের আশঙ্কা, এআই প্রযুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের নেতৃত্ব দুর্বল হয়ে পড়তে পারে এবং একই সঙ্গে নতুন ধরনের সাইবার নিরাপত্তা ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।

এ কারণে ট্রাম্প প্রশাসনের কিছু কর্মকর্তা চীনা এআই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। সম্ভাব্য পদক্ষেপের মধ্যে রয়েছে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনা কিংবা মার্কিন কোম্পানিগুলোকে এসব মডেল ব্যবহারে নিরুৎসাহিত করা। একই সঙ্গে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো মার্কিন মডেল ব্যবহার করে নিজেদের মডেল উন্নত করছে, যা ‘ডিস্টিলেশন’ নামে পরিচিত, এমন অভিযোগও উঠেছে।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, উন্নত মার্কিন মডেলের ব্যবহারে বিধিনিষেধ আরোপ করলে উল্টো চীনের ওপেন-ওয়েট বিকল্পগুলোর চাহিদা আরও বাড়তে পারে।

চীনের আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানও ইতোমধ্যে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখিয়েছে। গত জুনে জেড.এআই তাদের ‘জিএলএম-৫.২’ মডেল উন্মোচন করে, যা সফটওয়্যার উন্নয়নের মতো জটিল এজেন্টভিত্তিক কাজে গুগলের বর্তমান মডেলগুলোর চেয়েও ভালো ফল দিয়েছে বলে দাবি করা হয়। এছাড়া ডিপসিক ও মিনিম্যাক্সের মডেলও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দ্রুত জনপ্রিয়তা পাচ্ছে।

ফায়ারফক্স নির্মাতা প্রতিষ্ঠান মজিলার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জটিল যুক্তিনির্ভর কাজে ওপেন-ওয়েট মডেলগুলো এখনো শীর্ষ ফ্রন্টিয়ার মডেলের চেয়ে কিছুটা পিছিয়ে থাকলেও অধিকাংশ সাধারণ ব্যবহারের জন্য এগুলো যথেষ্ট কার্যকর।

বিশ্লেষকদের মতে, এসব মডেলের সবচেয়ে বড় শক্তি তাদের কম পরিচালন ব্যয়। গবেষণা প্রতিষ্ঠান আর্টিফিশিয়াল অ্যানালাইসিসের তথ্য অনুযায়ী, ডিপসিকের সবচেয়ে শক্তিশালী মডেলে একটি কাজ সম্পন্ন করতে গড়ে খরচ হয় ০.০৪ ডলার। কিমি কে৩ মডেলে একই খরচ প্রায় ০.৯৫ ডলার। অন্যদিকে অ্যানথ্রপিকের ‘ফেবল’ মডেল ব্যবহার করতে গড়ে ব্যয় হয় ২.৭৫ ডলার।

এই ব্যয়ের পার্থক্যের অন্যতম কারণ হলো, ওপেন-ওয়েট মডেল যেকোনো ক্লাউড সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান নিজেদের মাধ্যমে সরবরাহ করতে পারে। ফলে প্রতিযোগিতা বাড়ে এবং ব্যবহারকারীর খরচ কমে যায়।

এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের চিপ রপ্তানি নিষেধাজ্ঞার কারণে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো সীমিত কম্পিউটিং সক্ষমতা নিয়েই দক্ষ ও সাশ্রয়ী মডেল তৈরির দিকে বেশি মনোযোগ দিয়েছে। বিশেষ করে ‘মিক্সচার অব এক্সপার্টস’ প্রযুক্তি ব্যবহার করে তারা প্রয়োজন অনুযায়ী মডেলের নির্দিষ্ট অংশ সক্রিয় করার মাধ্যমে কম কম্পিউটিং শক্তিতে ভালো ফল অর্জন করছে। ডিপসিক ও আলিবাবা এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ওপেন-ওয়েট মডেলের আরেকটি বড় সুবিধা হলো এগুলো নির্দিষ্ট কোনো প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীলতা কমায়। সম্প্রতি মার্কিন সরকারের এক সিদ্ধান্তের কারণে ‘ফেবল’ মডেল তিন সপ্তাহের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে ব্যবহার করা সম্ভব হয়নি। এই ঘটনা অনেক প্রতিষ্ঠানকে বিকল্প হিসেবে ওপেন-ওয়েট মডেল ব্যবহারের দিকে আরও আগ্রহী করে তুলেছে।

মজিলার প্রধান প্রযুক্তিবিদ রাফি ক্রিকোরিয়ান এই ঘটনাকে প্রযুক্তি শিল্পের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কসংকেত হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

তবে বিশ্লেষকদের ধারণা, চীনের ওপেন-ওয়েট মডেলও দীর্ঘমেয়াদে একইভাবে উন্মুক্ত থাকবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। কারণ, বিদেশে এসব প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে নতুন বিধিনিষেধ আরোপের বিষয়টি চীনা সরকার বিবেচনা করছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। যদি এমন সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়, তাহলে বৈশ্বিক এআই প্রতিযোগিতার বর্তমান চিত্র আবারও বদলে যেতে পারে।

This post was viewed: 7

আরো পড়ুন