Ridge Bangla

এডিআর কার্যকর হলে এক বছরে বিচারাধীন মামলা ২০ লাখে নামানো সম্ভব: আইনমন্ত্রী

বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (এডিআর) কার্যক্রম কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে আগামী এক বছরের মধ্যে দেশের বিচারাধীন মামলার সংখ্যা প্রায় ২০ লাখে নামিয়ে আনা সম্ভব বলে জানিয়েছেন আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। তিনি দ্রুত ও সহজলভ্য বিচার নিশ্চিত করতে বাধ্যতামূলক মামলা-পূর্ব মধ্যস্থতা কার্যক্রম আরও বিস্তৃত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।

মঙ্গলবার সচিবালয়ে আইন মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে বাংলাদেশ আইনগত সহায়তা প্রদান আইন, ২০২৬-এর ধারা ২১ অনুযায়ী বাধ্যতামূলক মামলা-পূর্ব মধ্যস্থতা কার্যক্রমের উদ্বোধনী সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

আইনমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে দেশে বিচারকের স্বল্পতার বিপরীতে প্রায় ৪৫ লাখ মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এই বিপুল মামলার চাপ সুপ্রিম কোর্ট থেকে শুরু করে জেলা ও অধস্তন আদালত পর্যন্ত পুরো বিচারব্যবস্থার ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করেছে। তাই প্রচলিত বিচারব্যবস্থার পাশাপাশি বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।

তিনি জানান, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত পরিচালিত পাইলট কার্যক্রমে ইতিবাচক ফল পাওয়া গেছে।

আইনমন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, পারিবারিক আদালত আইনে ২০২৫ সালের একই সময়ে যেখানে ৩ হাজার ৫৫৯টি মামলা হয়েছিল, ২০২৬ সালের একই সময়ে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৭৪৪টিতে, যা প্রায় ৫১ শতাংশ হ্রাস।

একই সময়ে বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইনের মামলা ২৪টি থেকে ১৮টিতে এবং সিভিল জজ আদালতের এখতিয়ারভুক্ত বণ্টনসংক্রান্ত মামলা ২ হাজার ১টি থেকে ৬৬১টিতে নেমে এসেছে, যা প্রায় ৬৭ শতাংশ কমেছে।

স্টেট অ্যাকুইজিশন অ্যান্ড টেন্যান্সি আইনের প্রি-এম্পশনসংক্রান্ত মামলা ১৭টি থেকে কমে ২টিতে নেমেছে, যা ৮৮ দশমিক ২৪ শতাংশ হ্রাস। এছাড়া নন-অ্যাগ্রিকালচারাল টেন্যান্সি আইনের মামলাও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে এবং পিতামাতার ভরণপোষণ আইনের মামলায় প্রায় ১৯ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।

যৌতুক নিরোধ আইনের মামলার প্রসঙ্গ তুলে আইনমন্ত্রী বলেন, ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত সময়ে যেখানে ৫ হাজার ৬০৫টি মামলা হয়েছিল, ২০২৬ সালের একই সময়ে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৮১০টিতে। অর্থাৎ এ ধরনের মামলা ৬৭ দশমিক ৭১ শতাংশ কমেছে, যা বাধ্যতামূলক মামলা-পূর্ব মধ্যস্থতা কার্যক্রমের কার্যকারিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।

তিনি বলেন, বিভিন্ন আইনে গড়ে ৬২ দশমিক ২ শতাংশ মামলা কমেছে। এই ধারা অব্যাহত থাকলে এবং আরও বিস্তৃতভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে প্রতিদিন নতুন করে আদালতে জমা হওয়া বিপুলসংখ্যক মামলা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হবে।

মো. আসাদুজ্জামান বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি, মামলা দায়েরের আগেই বিরোধ নিষ্পত্তির পাশাপাশি বিচারাধীন মামলাগুলোর মধ্যেও কার্যকর মধ্যস্থতা চালানো গেলে আগামী এক বছরের মধ্যে বর্তমানে বিচারাধীন প্রায় সাড়ে ৪৫ লাখ মামলা ২০ লাখে নামিয়ে আনা সম্ভব হবে।’

তিনি আরও বলেন, দীর্ঘদিন মামলা পরিচালনার কারণে সাধারণ মানুষ মানসিক ও আর্থিক- উভয় দিক থেকেই ক্ষতির মুখে পড়ছেন। তাই দ্রুত বিরোধ নিষ্পত্তির মাধ্যমে মানুষের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অন্যতম দায়িত্ব।

বিচারকদের উদ্দেশে আইনমন্ত্রী বলেন, যেসব মামলায় আপস-মীমাংসার সুযোগ রয়েছে, সেগুলো প্রাথমিক পর্যায়েই জেলা লিগ্যাল এইড অফিস বা অনুমোদিত মধ্যস্থতাকারীদের কাছে পাঠানোর উদ্যোগ নিতে হবে। আদালতে মামলা দায়েরের পরও সমঝোতার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তি হলে বিচারপ্রার্থীদের সময়, অর্থ ও ভোগান্তি অনেকাংশে কমবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

সাংবাদিকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশ আইনগত সহায়তা প্রদান অধিদপ্তরের মাধ্যমে পরিচালিত মধ্যস্থতা কার্যক্রম সম্পর্কে জনগণের মধ্যে আরও বেশি সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত এই সেবা সম্পর্কে মানুষ যত বেশি জানবে, তত বেশি মানুষ আদালতের বাইরে আইনসম্মতভাবে বিরোধ নিষ্পত্তির সুযোগ গ্রহণ করবে।

আইনমন্ত্রী বলেন, ‘সরকার শুধু মামলাই কমাতে চায় না; সরকার অসহায়, দরিদ্র ও বিচারপ্রার্থী মানুষের পাশেও দাঁড়াতে চায়। তাদের ন্যায়বিচারের অধিকার নিশ্চিত করাই আমাদের লক্ষ্য।’

তিনি কক্সবাজার জেলার উদাহরণ তুলে ধরে জানান, সেখানে বর্তমানে এক লাখের বেশি মামলা বিচারাধীন রয়েছে, যা উদ্বেগজনক। এ সময় সংশ্লিষ্ট জেলা জজ, চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট, লিগ্যাল এইড কর্মকর্তা ও বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের আগামী সেপ্টেম্বরের মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মামলা মধ্যস্থতার মাধ্যমে নিষ্পত্তি করে দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখানোর আহ্বান জানান।

অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ আইনগত সহায়তা প্রদান অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. মনজুরুল হোসেন সভাপতির বক্তব্যে বলেন, বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় দ্রুত ও কম খরচে ন্যায়বিচার পৌঁছে দেওয়ার একটি কার্যকর মাধ্যম।

সেমিনারে জানানো হয়, বগুড়া, ঠাকুরগাঁও, পটুয়াখালী, ভোলা, নড়াইল, যশোর, ফরিদপুর, কক্সবাজার, পঞ্চগড় ও টাঙ্গাইল- এই ১০ জেলায় আনুষ্ঠানিকভাবে বাধ্যতামূলক মামলা-পূর্ব মধ্যস্থতা কার্যক্রম শুরু হয়েছে।

This post was viewed: 5

আরো পড়ুন