যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান উত্তেজনা কমানোর প্রচেষ্টায় নতুন অগ্রগতির ইঙ্গিত মিলেছে। সমঝোতা স্মারক বাস্তবায়ন নিয়ে কাতারের রাজধানী দোহায় অনুষ্ঠিত পরোক্ষ কারিগরি পর্যায়ের বৈঠকের পর তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে একটি সরাসরি ‘যোগাযোগ চ্যানেল’ চালুর ঘোষণা দিয়েছে ইরান।
ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গারিবাবাদি জানিয়েছেন, সমঝোতা স্মারক লঙ্ঘনের অভিযোগ এবং সংশ্লিষ্ট বিষয় দ্রুত জানাতে এই যোগাযোগব্যবস্থা চালু করা হবে। তাঁর ভাষ্য, সাম্প্রতিক পাল্টাপাল্টি হামলার পর উত্তেজনা কমিয়ে আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
দোহায় অনুষ্ঠিত বৈঠকে কাতার ও পাকিস্তান মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করে। আলোচনায় মূল গুরুত্ব পায় হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক রাখা এবং গত মাসে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের আওতায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর রাখা। ওই সমঝোতায় ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি, হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু, যুদ্ধের স্থায়ী অবসান এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে চূড়ান্ত চুক্তির রূপরেখা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
তবে সমঝোতা স্মারকের ব্যাখ্যা নিয়ে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে মতপার্থক্য দেখা দিয়েছে। এর জেরে গত এক সপ্তাহে দুই পক্ষের মধ্যে পাল্টাপাল্টি সামরিক হামলাও হয়েছে। একই সময়ে হরমুজ প্রণালিতে আংশিকভাবে জাহাজ চলাচল পুনরায় শুরু হয়েছে।
বুধবার পৃথক বৈঠকের পর কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাজেদ আল-আনসারি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানান, সমঝোতা স্মারকসংক্রান্ত আলোচনায় ‘ইতিবাচক অগ্রগতি’ হয়েছে। তিনি বলেন, দুই পক্ষ আলোচনা অব্যাহত রাখতে সম্মত হয়েছে এবং ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া শেষে পরবর্তী বৈঠকের সময় নির্ধারণ করা হবে।
একই দিনে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও আলোচনার বিষয়ে আশাবাদ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, দোহার বৈঠক ‘ভালোভাবে এগোচ্ছে’ এবং শিগগিরই পারমাণবিক ইস্যু নিয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হতে পারে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, সমঝোতা স্মারকের সময়সীমা শেষ হওয়ার আগে যুক্তরাষ্ট্র আর সামরিক পদক্ষেপ নেবে না- এমন নিশ্চয়তা দেওয়া সম্ভব নয়। তাঁর ভাষায়, “আমি কোনো প্রতিশ্রুতি দিতে পারি না। কারণ, শেষ পর্যন্ত ইরান কী করবে, তার ওপর বিষয়টি নির্ভর করছে। তবে প্রেসিডেন্ট প্রয়োজন ছাড়া আবার সেনাবাহিনী পাঠাবেন না। স্পষ্ট উদ্দেশ্য থাকলেই তা করা হবে।”
এদিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি সতর্ক করে বলেছেন, ইসরায়েল নতুন হামলা চালালে ইরান ‘তাৎক্ষণিক ও শক্তিশালী জবাব’ দেবে। একই সঙ্গে তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের মিত্রকে নিয়ন্ত্রণে রাখার আহ্বান জানিয়েছেন।
আলোচনায় অর্থনৈতিক বিষয়ও গুরুত্ব পেয়েছে। কাজেম গারিবাবাদি জানান, জব্দ অবস্থায় থাকা ইরানের ৬০০ কোটি ডলারের সম্পদের একটি অংশ প্রয়োজনীয় পণ্য কেনার কাজে ব্যবহারের বিষয়টি কাতারের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। তাঁর মতে, ইরানের প্রয়োজন অনুযায়ী পণ্য কিনে তা দেশটিতে সরবরাহ করা হবে।
কূটনৈতিক তৎপরতার পাশাপাশি হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে সামরিক ও বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডও অব্যাহত রয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় অন্তত ৩৫টি বাণিজ্যিক জাহাজ প্রণালিটি অতিক্রম করেছে। একই সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে বৈঠক করেছে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড। অন্যদিকে তেহরানের অনুমোদিত রুট ব্যবহার না করায় একটি বিদেশি কনটেইনারবাহী জাহাজ আটকে যাওয়ার খবর দিয়েছে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম।
পরে কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হাম্মাদ আল সানি যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের সঙ্গে বৈঠক করেন। সেখানে কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতা অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করা হয়। একই দিনে ট্রাম্পও আলোচনার অগ্রগতিকে ইতিবাচক উল্লেখ করে বলেন, “খুব ভালো বৈঠক হয়েছে।” তিনি আরও বলেন, “ইরানের নিরস্ত্রীকরণ প্রক্রিয়া ভালোভাবেই এগোচ্ছে। আমরা তাদের খুব কঠোরভাবে আঘাত করেছি, কিন্তু এখন আমরা ভালোভাবে এগোচ্ছি।”
আলোচনায় অগ্রগতির প্রভাব আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও পড়েছে। সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ কমে যাওয়ায় বুধবার বিশ্ববাজারে তেলের দাম প্রায় ২ শতাংশ কমে ফেব্রুয়ারির পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে।