Ridge Bangla

রাতের আঁধারে হাজারো মানুষকে বাংলাদেশে পাঠানোর কথা উঠে এলো ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের প্রতিবেদনে

বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত দিয়ে রাতের অন্ধকারে হাজারো মানুষকে জোর করে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর অভিযোগ উঠেছে ভারতের বিরুদ্ধে। অভিযোগ করা হয়েছে, এভাবে পাঠানো ব্যক্তিদের বেশিরভাগই মুসলিম এবং এ প্রক্রিয়ায় কোনো আনুষ্ঠানিক প্রত্যাবাসন পদ্ধতি অনুসরণ করা হচ্ছে না। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস এক প্রতিবেদনে এ তথ্য প্রকাশ করেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সীমান্তে দায়িত্ব পালনরত বিজিবির সদস্যরা ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীকে মেগাফোনে অনুরোধ করছেন, যেন কাউকে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে ঠেলে না দেওয়া হয়। বিজিবির ল্যান্স করপোরাল মাহমুদ মাসুদ বলেন, “তারা (ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী-বিএসএফ) অন্ধকার হওয়ার অপেক্ষা করে। তারপর স্পটলাইট বন্ধ করে সুযোগ বুঝে কাজটা করে।”

ভারত ও বাংলাদেশের কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, গত মে মাসে পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনের পর থেকে সীমান্ত দিয়ে মানুষ পাঠানোর এ ধরনের ঘটনা বেড়েছে। যাদের পাঠানো হচ্ছে, তাদের অধিকাংশই বাঙালি মুসলিম বংশোদ্ভূত। অনেকেই কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশে থাকেননি, আবার কেউ কেউ কোনো সময়ই এখানে বসবাস করেননি।

বিজিবির মহাপরিচালক মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী বলেন, “তারা ভারতের সীমান্তের ফটক খুলে মানুষকে অন্ধকারের মধ্যে ঠেলে দেয়…সেখানে নারী আছে, শিশু আছে, আর এই অসহায় মানুষগুলো মাঝখানে আটকা পড়ে যায়।” তাঁর ভাষ্য, অনেক মানুষ দুই দেশের মধ্যবর্তী শূন্যরেখায় আটকে পড়ছেন।

মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া অঞ্চলের উপপ্রধান মীনাক্ষী গাঙ্গুলি অভিযোগ করেন, ভারতীয় কর্তৃপক্ষ “নিষ্ঠুরভাবে” মূলত মুসলিম পরিবারগুলোকে বাংলাদেশে ফেলে দিচ্ছে অথবা সীমান্তে আটকে রেখে যাচ্ছে। তিনি বলেন, “ভারত সরকারের উচিত ‘অবৈধভাবে মানুষ বহিষ্কার বন্ধ করা, প্রক্রিয়াগত সুরক্ষা নিশ্চিত করা, নাগরিকত্ব যাচাইয়ের জন্য বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করা এবং মুসলমানদের প্রতি এই হতাশাজনক বৈরিতা বন্ধ করা।’”

ভারতীয় কর্মকর্তাদের দাবি, ‘ডিটেক্ট, ডিলিট অ্যান্ড ডিপোর্ট’ নীতির আওতায় অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের বহিষ্কার করা হচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গের নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানিয়েছেন, দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রায় ১০ হাজার অবৈধ বাংলাদেশি অভিবাসীকে বহিষ্কার করা হয়েছে এবং আরও ১ হাজার ৮০০ জন বহিষ্কারের অপেক্ষায় রয়েছেন। আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মাও তথাকথিত অবৈধ বাংলাদেশি মুসলমানদের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছেন।

বাংলাদেশ সরকার এ নীতির বিরোধিতা করেছে। প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রনীতি উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির বলেন, “তারা এভাবে মানুষকে শুধু সীমান্তের ওপারে ঠেলে দিতে পারে না।” পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেন, এ ধরনের ‘পুশ ইন’ দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নের প্রচেষ্টাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল জানান, অবৈধ বিদেশিদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তাঁর ভাষ্য, বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষের কাছে ২ হাজার ৬৮০টির বেশি নাগরিকত্ব যাচাইয়ের আবেদন পাঠানো হলেও অনেক ক্ষেত্রেই সেই প্রক্রিয়া ৫ বছরের বেশি সময় ধরে ঝুলে আছে।

প্রতিবেদনে সীমান্ত এলাকার অপেল মিয়ার অভিজ্ঞতাও তুলে ধরা হয়েছে। তিনি দাবি করেন, পশ্চিমবঙ্গে দীর্ঘদিন বসবাসের পর ভারতীয় সীমান্তরক্ষীরা গভীর রাতে তাঁকে ও তাঁর পরিবারকে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে ঠেলে দেয়। তাঁর ভাষায়, “আমাদের কাছে কোনো কাগজপত্র ছিল না। আমাদের একটি মাদ্রাসা থেকে পিকআপ ট্রাকে তোলা হয়। তারা আলো বন্ধ করে দেয়, গেট খুলে ফাঁকা গুলি ছোড়ে এবং বলে, ‘এখন যাও, ভয় পাওয়ার কিছু নেই, তোমরা বাংলাদেশি। কিন্তু আমরা ভয় পেয়েছিলাম। অন্ধকারে পা রেখে কোথায় যাব, সেটাই বুঝতে পারছিলাম না।’”

This post was viewed: 5

আরো পড়ুন