চলতি বছর এখন পর্যন্ত প্রায় ছয় হাজার শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে নতুন প্রকাশিত পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, তাদের প্রায় সবাই দক্ষিণ আফ্রিকার নাগরিক। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের জনসংখ্যা, শরণার্থী ও অভিবাসন বিষয়ক ব্যুরোর তথ্য থেকে বিষয়টি জানা গেছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এ বছর এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয় পেয়েছেন পাঁচ হাজার ৯৪৮ জন শরণার্থী। তাদের অধিকাংশই দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে আসা।
গত ৩০ সেপ্টেম্বর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জারি করা একটি প্রেসিডেন্সিয়াল মেমোর পর এই পরিবর্তন দেখা যায়। ওই নির্দেশনায় তিনি যুক্তরাষ্ট্রে বছরে শরণার্থী গ্রহণের সংখ্যা কমিয়ে সাত হাজার ৫০০ জনে নামিয়ে আনার এবং দক্ষিণ আফ্রিকার শ্বেতাঙ্গ জনগোষ্ঠীকে অগ্রাধিকার দেওয়ার পরিকল্পনার কথা জানান।
পররাষ্ট্র, স্বরাষ্ট্র এবং স্বাস্থ্য ও মানবসেবা বিভাগের সেক্রেটারিদের পাঠানো ওই মেমোতে বলা হয়, ‘এক্সিকিউটিভ অর্ডার ১৪২০৪ অনুযায়ী, শরণার্থী কোটা প্রধানত দক্ষিণ আফ্রিকার আফ্রিকানারদের [দক্ষিণ আফ্রিকায় বসবাসরত ডাচ বংশোদ্ভূত শ্বেতাঙ্গ জনগোষ্ঠী] জন্য বরাদ্দ করা হবে। এছাড়া নিজ নিজ দেশে অবৈধ বা অন্যায্য বৈষম্যের শিকার হওয়া অন্যান্য ভুক্তভোগীদেরও অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।’
এর আগে জো বাইডেনের মেয়াদের শেষ বছর ২০২৪ সালে এক লাখ ৬০ জন শরণার্থী গ্রহণ করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। ওই সময় সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করা ছিল এক লাখ ২৫ হাজার জন।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে যুক্তরাষ্ট্রে মোট ছয় হাজার ৬৬৮ জন শরণার্থী আশ্রয় পেয়েছেন। এর মধ্যে তিনজন ছাড়া বাকিরা সবাই দক্ষিণ আফ্রিকার নাগরিক।
গত নভেম্বরে কলোরাডো অঙ্গরাজ্যে তিনজন আফগান শরণার্থীকে আশ্রয় দেওয়া হয়েছিল। এই কয়েকজন ছাড়া শরণার্থী তালিকায় দক্ষিণ আফ্রিকার শ্বেতাঙ্গদের সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি।
ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি, ইউরোপীয় বসতি স্থাপনকারীদের বংশধর দক্ষিণ আফ্রিকার শ্বেতাঙ্গরা দেশটিতে ‘অন্যায় বর্ণবৈষম্য’ ও ‘গণহত্যার’ শিকার হচ্ছেন। তবে দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট একাধিকবার এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন।
দক্ষিণ আফ্রিকায় জন্ম নেওয়া বিশ্বের শীর্ষ ধনী ও ট্রাম্পের সাবেক মিত্র ইলন মাস্কও একই ধরনের দাবি করেছেন।
গত মে মাসে ট্রাম্পের ডেপুটি চিফ অব স্টাফ ফর পলিসি স্টিফেন মিলার বলেন, ‘দক্ষিণ আফ্রিকায় যা ঘটছে, তা শরণার্থী কর্মসূচি কেন তৈরি হয়েছিল তার পাঠ্যপুস্তিকাসুলভ সংজ্ঞার সাথে পুরোপুরি মিলে যায়। এটি একটি সুরক্ষিত বৈশিষ্ট্য-ভিত্তিক নিপীড়ন, এক্ষেত্রে সেটি জাতিগত পরিচয়। এটি জাতি-ভিত্তিক নিপীড়ন।’
দক্ষিণ আফ্রিকার শ্বেতাঙ্গদের প্রথম দল ওয়াশিংটন ডুলেস আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছানোর সময় বিষয়টি নিয়ে মার্কিন সংবাদমাধ্যমের সমালোচনা করেন ট্রাম্প।
তিনি বলেন, ‘ওখানে একটা গণহত্যা চলছে, যা নিয়ে আপনারা লিখতে চান না। এটা একটা ভয়ংকর ঘটনা। ওখানে কৃষকদের হত্যা করা হচ্ছে। ওরা শ্বেতাঙ্গ। তবে ওরা শ্বেতাঙ্গ না কৃষ্ণাঙ্গ, তা আমার কাছে কোনো পার্থক্য তৈরি করে না। কিন্তু দক্ষিণ আফ্রিকায় শ্বেতাঙ্গ কৃষকদের নির্মমভাবে হত্যা করা হচ্ছে, তাদের জমি কেড়ে নেওয়া হচ্ছে।’
তবে গত বছর ওভাল অফিসে বৈঠকের সময় দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসা ট্রাম্পের এসব দাবি প্রত্যাখ্যান করেন। ট্রাম্প কথিত ঘটনার ছবি ও ভিডিও দেখানোর চেষ্টা করলেও রামাফোসা তা গ্রহণ করেননি।
পরে রামাফোসার মুখপাত্র ভিনসেন্ট মাগোনিয়া বলেন, ‘এই মানুষগুলোর চলে যাওয়া থামানো হবে না, যদিও তারা মিথ্যা বয়ানের ভিত্তিতে যাচ্ছে। এই পদক্ষেপকে অনুমোদন দেওয়া নির্বাহী আদেশের কোনো আইনি বা বাস্তব ভিত্তি নেই। শরণার্থীদের সংজ্ঞায় আন্তর্জাতিক আইনের কোনো বিধানই এই ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।’
দক্ষিণ আফ্রিকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ক্রিসপিন ফিরি বলেন, ‘শরণার্থী হওয়ার ভান করে দক্ষিণ আফ্রিকানদের যুক্তরাষ্ট্রে পুনর্বাসন সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। এর লক্ষ্য হলো দক্ষিণ আফ্রিকার সাংবিধানিক গণতন্ত্রকে প্রশ্নবিদ্ধ করা।’
এরপর নভেম্বরে ৪০ জনের বেশি বিশিষ্ট শ্বেতাঙ্গ দক্ষিণ আফ্রিকান ট্রাম্পের বক্তব্যের বিরোধিতা করে খোলা চিঠি দেন। সেখানে তারা বলেন, তারা ‘আমেরিকার সংস্কৃতি যুদ্ধের দাবার ঘুঁটি নন।’
রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, ২১ মে প্রকাশিত প্রেসিডেন্সিয়াল ডিটারমিনেশনে দেখা যায়, ট্রাম্প তাঁর অবস্থানে অনড় রয়েছেন। চলতি বছর আরও বেশি দক্ষিণ আফ্রিকান শ্বেতাঙ্গকে যুক্তরাষ্ট্রে নেওয়ার সুযোগ তৈরি করতে শরণার্থী গ্রহণের সীমা ১০ হাজারে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর।