সন্ধ্যার আবছা আলোয় রাজধানীর কোনো এক গলির মোড়ে বিকট শব্দে হর্ন বাজিয়ে একঝাঁক মোটরসাইকেল চলে গেল। প্রত্যেকের চুল অদ্ভুত কায়দায় ছাঁটা, পরনে একইধরনের পোশাক, আর চোখেমুখে এক ধরনের বেপরোয়া ঔদ্ধত্য। কিংবা তুচ্ছ বিষয়ে ঝামেলা তৈরি হওয়ার পর দলবদ্ধ হয়ে দেশীয় অস্ত্র নিয়ে শোডাউন। এটি এখন কোনো সিনেমার দৃশ্য নয়, বরং বাংলাদেশের বড় শহরগুলোর পাড়া-মহল্লার অতি পরিচিত চিত্র। এই কিশোররা একসময় পাড়ার মাঠে ফুটবল খেলত কিংবা দল বেঁধে আড্ডা দিত। কিন্তু গত এক দশকে অনেক ক্ষেত্রে সেই আড্ডা রূপান্তরিত হয়েছে ‘কিশোর গ্যাং’-এ। গলি থেকে শুরু হওয়া এই সিনিয়র-জুনিয়র দ্বন্দ্ব আজ গিয়ে ঠেকেছে বিভিন্ন ধরনের আর মাদক ব্যবসায়।
গ্যাং কালচারের উত্থান ও নামকরণের বিচিত্রতা
বাংলাদেশে কিশোর গ্যাংয়ের বিষয়টি প্রথম বড় আকারে আলোচনায় আসে ২০১৭ সালে উত্তরায় আদনান কবির হত্যাকাণ্ডের পর। এরপর থেকে একের পর এক বের হয়ে আসতে থাকে ‘নাইন স্টার’, ‘ডিসকো বয়েজ’, ‘ফার্স্ট হিটার’, ‘স্টার বন্ড’ বা ‘০০৭’-এর মতো বিচিত্র নামের সব গ্রুপ। এই গ্রুপগুলোর নামকরণের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে এক ধরনের সস্তা বীরত্ব আর আধিপত্য বিস্তারের আকাঙ্ক্ষা। মূলত পাড়া বা এলাকার দখল নেওয়া, মেয়েদের ইভটিজিং করা এবং নিজেদের শক্তির মহড়া দেওয়াই এসব গ্রুপের প্রাথমিক লক্ষ্য থাকে।
রাজনৈতিক ‘বড় ভাই’ ও ছত্রছায়া
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কিশোর গ্যাংয়ের ভয়াবহ হয়ে ওঠার পেছনে সবচেয়ে বড় অনুঘটক হিসেবে কাজ করে স্থানীয় রাজনৈতিক ‘বড় ভাই’ সংস্কৃতি। স্থানীয় অনেক নেতা বা প্রভাবশালী ব্যক্তি নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে, মিছিলে লোক বাড়াতে কিংবা জমি দখল ও চাঁদাবাজির মতো কাজে এই কিশোরদের ব্যবহার করেন। কিশোররা যখন দেখে যে তাদের পেছনে কোনো বড় শক্তির হাত আছে, তখন তারা আইন-কানুনের তোয়াক্কা করা ছেড়ে দেয়। পুলিশের হাতে ধরা পড়লেও যখন এই বড় ভাইয়েরা তাদের ছাড়িয়ে আনেন, তখন সেই কিশোরের কাছে অপরাধ করাটা সাহসিকতার কাজ হয়ে দাঁড়ায়। এই রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা তাদের সাধারণ কিশোর থেকে ভয়ংকর অপরাধীতে রূপান্তর করে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও ডিজিটাল হিরোইজম
বর্তমান সময়ের কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তারে ফেসবুক, টিকটক এবং লাইকির মতো প্ল্যাটফর্মগুলো বিশেষ ভূমিকা রাখছে। নিজেদের গ্যাংয়ের প্রচার, অস্ত্র হাতে ছবি তোলা কিংবা বাইক স্টান্টের ভিডিও শেয়ার করে তারা এক ধরনের ‘ডিজিটাল হিরোইজম’ তৈরি করতে চায়। অনেক সময় এক গ্রুপের কিশোর অন্য গ্রুপকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয়, যা পরবর্তীতে রাজপথে রক্তাক্ত সংঘর্ষে রূপ নেয়। সস্তা লাইক-কমেন্ট আর ভিউয়ের নেশায় তারা হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলে।
পারিবারিক ও মনস্তাত্ত্বিক কারণ
মনোবিজ্ঞানীদের মতে, কৈশোরকাল হলো মানুষের জীবনের সবচেয়ে সংবেদনশীল সময়। এই সময়ে কিশোররা চায় অন্যদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে এবং নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ করতে। যখন কোনো কিশোর তার পরিবারে পর্যাপ্ত সময় বা স্নেহ পায় না, তখন সে বাইরের জগতে নিজের একটি পরিচয় খুঁজতে শুরু করে। এছাড়া শহুরে জীবনে খেলাধুলার মাঠের অভাব এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের অনুপস্থিতি তাদের বিপথে নিয়ে যাচ্ছে। প্রযুক্তির অপব্যবহার এবং পর্নোগ্রাফি বা ভায়োলেন্ট গেমের প্রতি আসক্তি তাদের মানসিকভাবে সহিংস করে তুলছে।
সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, কিশোর গ্যাংয়ের অধিকাংশ খুনের পেছনে কারণ অত্যন্ত তুচ্ছ। কারো দিকে কড়া চোখে তাকানো, বড় ভাইদের সালাম না দেওয়া কিংবা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বাজে মন্তব্য করার মতো ঘটনা থেকে এই খুনাখুনি শুরু হয়। কিন্তু এই তুচ্ছ ঘটনাগুলো যখন গ্যাংয়ের ‘সম্মানের’ প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়, তখন তারা হিংসে মত্ত হয়ে ওঠে। গত কয়েক বছরে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে কিশোর গ্যাংয়ের হাতে সহপাঠী বা সমবয়সীদের খুনের ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, অপরাধীদের গড় বয়স ১৪ থেকে ১৮ বছর।
আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা ও চ্যালেঞ্জ
পুলিশ ও র্যাব নিয়মিত কিশোর গ্যাংবিরোধী অভিযান পরিচালনা করলেও এর শেকড় উপড়ানো সম্ভব হচ্ছে না। কারণ, গ্রেফতারের পর অধিকাংশ কিশোরই কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রে যায় এবং সেখান থেকে বের হয়ে আবারও একই বৃত্তে ফিরে আসে। অনেক সময় প্রভাবশালী মহলের চাপে পুলিশকে পিছু হটতে হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল জেল-জরিমানা দিয়ে কিশোর অপরাধ দমন করা সম্ভব নয়; বরং এর জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদী সংশোধন প্রক্রিয়া।
উত্তরণের পথ: সমাজ ও পরিবারের ভূমিকা
কিশোর গ্যাং কালচার থেকে আমাদের সন্তানদের বাঁচাতে হলে সবার আগে এগিয়ে আসতে হবে পরিবারকে। সন্তানদের বন্ধু কারা, তারা ইন্টারনেটে কী করছে এবং কাদের সাথে মিশছে—সেদিকে তীক্ষ্ণ নজর রাখা জরুরি। এছাড়া এলাকাভিত্তিক সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করতে হবে। কিশোরদের জন্য পর্যাপ্ত খেলার মাঠ এবং সুস্থ বিনোদনের ব্যবস্থা করতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা, রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে নৈতিক সচেতনতা আসতে হবে যাতে তারা হীন স্বার্থে শিশুদের ব্যবহার না করেন।
আজকের কিশোররাই আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। কিন্তু সেই ভবিষ্যৎ যদি অপরাধের চোরাবালিতে হারিয়ে যায়, তবে জাতির জন্য এর চেয়ে বড় বিপর্যয় আর হতে পারে না। কিশোর গ্যাং কালচার কেবল একটি অপরাধের বিষয় নয়, এটি আমাদের সামাজিক অবক্ষয়ের একটি প্রতিচ্ছবি। এখনই যদি সমন্বিতভাবে এই ব্যাধি দমন করা না যায়, তবে এই অপরাধের বিষবাষ্প পুরো সমাজকে গ্রাস করবে। আইন, পরিবার এবং রাজনীতি- এই তিন শক্তির সঠিক সমন্বয়ই পারে কিশোরদের অন্ধকার জগত থেকে আলোর পথে ফিরিয়ে আনতে।