Skip to main content

Ridge Bangla

ঢাকা-১২ আসনে ‘সাইফুল’ ত্রয়ী এবং নির্বাচনী মনস্তত্ত্ব

​বাংলাদেশের রাজনীতিতে কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে ঢাকা। আর ঢাকার একটি গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় আসন হচ্ছে ঢাকা-১২ আসন। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই আসনটি এখন দেশজুড়ে আলোচনার তুঙ্গে। তবে এই আলোচনার কারণ কোনো রাজনৈতিক সংঘাত বা বাগযুদ্ধ নয়, বরং ব্যালট পেপারের একটি অদ্ভুত সমীকরণ।

এই আসনে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে যে তিন প্রভাবশালী প্রার্থীর নাম শোনা যাচ্ছে, তাদের প্রত্যেকের নামেই রয়েছে ‘সাইফুল’। ​রাজনীতিতে এই ঘটনাকে নিছক কাকতালীয় মনে হলেও, সমাজবিজ্ঞান এবং নির্বাচনী মনস্তত্ত্বের (Electoral Psychology) ভাষায় এটি একটি জটিল পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। যখন একজন সাধারণ ভোটার ব্যালট পেপার হাতে নেবেন এবং একই সারিতে তিনজন ‘সাইফুল’কে দেখবেন, তখন তার মস্তিষ্কে ঠিক কী ধরনের প্রতিক্রিয়া তৈরি হবে?– এরকম একটা প্রশ্ন মাথায় আবির্ভাব হওয়া খুবই স্বাভাবিক।

​১. কগনিটিভ ওভারলোড বা তথ্যের ভারে বিভ্রান্তি

​মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘কগনিটিভ ওভারলোড’। একজন ভোটার যখন ভোটকেন্দ্রে যান, তিনি সাধারণত একটি নির্দিষ্ট নাম বা প্রতীকের ছবি নিয়ে যান। কিন্তু ব্যালটে যখন একই নামের একাধিক অপশন থাকে, তখন মস্তিষ্ক সিদ্ধান্ত নিতে অতিরিক্ত সময় ব্যয় করে। ঢাকা-১২ আসনের ক্ষেত্রে যখন তিনজন ব্যক্তি লড়বেন যাদের সকলের নামের মধ্যে ‘সাইফুল’ রয়েছে, তখন বয়স্ক বা কম শিক্ষিত ভোটারদের ক্ষেত্রে ভুল প্রতীকে সিল দেওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়।

​২. নামের আকর্ষণ বনাম প্রতীকের শক্তি

​বাংলাদেশের নির্বাচনী সংস্কৃতিতে ‘নাম’ এর চেয়ে ‘প্রতীক’ বা ‘মার্কা’ বরাবরই বেশি শক্তিশালী। তবে যখন প্রার্থীরা সমানে সমান প্রভাবশালী হন, তখন নাম একটি ব্র্যান্ড হিসেবে কাজ করে। ভোটাররা যদি কেবল ‘সাইফুল’ নামটি মনে রেখে কেন্দ্রে যান, তবে তারা চরম বিপাকে পড়বেন। এই পরিস্থিতিতে ভোটারদের মনস্তত্ত্ব তখন নামের চেয়ে প্রতীকের ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। নির্বাচনী মনস্তত্ত্ব বলে, এই ধরনের বিভ্রান্তিকর অবস্থায় মানুষের মস্তিষ্ক ‘শর্টকাট’ খোঁজে। সেই শর্টকাট হলো প্রার্থীর রাজনৈতিক দলের লোগো বা প্রতীক। অর্থাৎ, নামের মিল আসলে পরোক্ষভাবে দলীয় প্রতীকের গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দেয়।

​৩. ‘হ্যালো ইফেক্ট’ এবং প্রার্থীর ইমেজ

​মনস্তত্ত্বের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ‘হ্যালো ইফেক্ট’ (Halo Effect)। যদি তিন সাইফুলের মধ্যে একজন অত্যন্ত জনপ্রিয় হন, তবে তার নামের প্রভাব অন্য দুই সাইফুলের ওপর পড়তে পারে। অনেক সময় দেখা যায়, জনপ্রিয় প্রার্থীর নামের সাথে মিল থাকার কারণে একজন অপরিচিত বা দুর্বল প্রার্থীও কিছু বাড়তি ভোট পেয়ে যান। ভোটাররা অবচেতন মনেই ভাবেন, “এই সাইফুলই হয়তো সেই ব্যক্তি যাকে আমি খুঁজছি।” এই ‘আইডেন্টিটি ক্রাইসিস’ বা পরিচয় বিভ্রাট অনেক সময় নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফলে বড় ব্যবধান গড়ে দেয়।

​৪. কৌশলগত প্রার্থী বনাম মূল লড়াই

​ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, অনেক সময় শক্তিশালী প্রার্থীর জয় ঠেকাতে তার হুবহু বা কাছাকাছি নামের অন্য কাউকে নির্বাচনে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয়। একে বলা হয় ‘ডামি ক্যান্ডিডেট’ স্ট্র্যাটেজি। এর পেছনে কাজ করে বিশুদ্ধ নির্বাচনী মনস্তত্ত্ব- প্রতিপক্ষের ভোট ব্যাংকে ফাটল ধরানো। ঢাকা-১২ আসনে যদি তিন সাইফুলই হেভিওয়েট হন, তবে একে অপরের ভোট কাটার এক নিরব লড়াই শুরু হবে। ভোটারদের একটি অংশ হয়তো প্রার্থীর নামের পদবী বা বাবার নাম দেখে পার্থক্য করবেন, কিন্তু একটি বড় অংশ কেবল ‘নাম’ দেখে সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে ভুল করে বসতে পারেন।

​৫. প্রার্থীর পাল্টা কৌশল: পরিচিতির সংকট মোচন

​এই পরিস্থিতির মোকাবিলায় প্রার্থীদের প্রচারণায় এক নতুন ধরন দেখা যায়। ঢাকা-১২ আসনের এই তিন সাইফুলকে এখন তাদের নামের চেয়ে বেশি জোর দিতে হবে তাদের বিশেষণের ওপর। কেউ হয়তো ‘ডাক্তার সাইফুল’, কেউ ‘ইঞ্জিনিয়ার সাইফুল’ আবার কেউ ‘জননেতা সাইফুল’ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করবেন। ব্যালট পেপারে এই বিশেষণগুলো ভোটারদের সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে। মনস্তাত্ত্বিকভাবে, ভোটাররা তখন ব্যক্তিকে একটি বিশেষ গুণ বা পেশার সাথে সংযুক্ত করে মনে রাখার চেষ্টা করেন।

​৬. তরুণ বনাম প্রবীণ ভোটারের দৃষ্টিভঙ্গি

​তরুণ ভোটাররা সাধারণত প্রযুক্তিনির্ভর এবং তথ্য সচেতন। তারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বা ইন্টারনেটে প্রার্থীদের অতীত ইতিহাস ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য দেখে সিদ্ধান্ত নেন। তাদের ক্ষেত্রে নামের মিল খুব একটা প্রভাব ফেলে না। কিন্তু প্রবীণ বা গ্রামীণ প্রেক্ষাপট থেকে আসা ভোটারদের ক্ষেত্রে মনস্তাত্ত্বিক প্রভাবটি প্রবল। তারা অনেক সময় প্রার্থীর মুখচ্ছবি বা নাম শুনে অভ্যস্ত। ব্যালটে যখন তারা একই নামের একাধিক বিকল্প দেখেন, তখন তাদের মধ্যে ‘ডিসিশন প্যারালাইসিস’ বা সিদ্ধান্তহীনতা তৈরি হতে পারে।

​ঢাকা-১২ আসনের এই ‘সাইফুল বনাম সাইফুল বনাম সাইফুল’ লড়াই বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসে এক অনন্য উদাহরণ হয়ে থাকবে। এটি কেবল রাজনৈতিক লড়াই নয়, বরং ভোটারদের সচেতনতার এক বড় পরীক্ষা। নির্বাচনী মনস্তত্ত্ব আমাদের শেখায় যে, তথ্য যত বেশি হবে, মানুষের বিভ্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনাও তত বাড়বে। তবে দিনশেষে, এই গোলকধাঁধা কাটিয়ে যারা নিজেদের স্বতন্ত্র পরিচয় ভোটারদের হৃদয়ে গেঁথে দিতে পারবেন, জয়ের মালা তারাই পরবেন। ​ভোটের দিন ব্যালট পেপারের তিনটি ‘সাইফুল’ নামের মাঝে ভোটারদের কলমটি সঠিক প্রতীকের ঘরে পড়ে কি না, সেটাই এখন দেখার বিষয়। নির্বাচনী এই মনস্তাত্ত্বিক খেলায় শেষ হাসি কে হাসবেন- তা জানতে আমাদের অপেক্ষা করতে হবে নির্বাচনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত।

This post was viewed: 28

আরো পড়ুন