Skip to main content

Ridge Bangla

সাবস্ক্রিপশন ইকোনমি: মালিকানা থেকে ব্যবহারের দিকে ঝুঁকে পড়া বিশ্ব

​এক দশক আগেও আমাদের বিনোদন বা কাজের ধরণ ছিল অন্যরকম। পছন্দের সিনেমা দেখতে আমরা ডিভিডি কিনতাম, প্রিয় শিল্পীর গান শুনতে কিংবা পছন্দের গেমের জন্য সিডি সংগ্ৰহ করতাম। এমনকি কম্পিউটারে কোনো কাজ করতে হলে বড় অংকের টাকা দিয়ে সফটওয়্যারের লাইসেন্স কিনে নেয়ার মতো বিষয়গুলো ছিল খুবই সাধারণ। কিন্তু আজকের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখন আমাদের আলমারিতে সিডি বা ডিভিডি-র স্তূপ নেই, বরং ফোনের স্ক্রিনে আছে নেটফ্লিক্স, স্পটিফাই বা মাইক্রোসফট ৩৬৫-এর আইকন। আমরা এখন আর পণ্যটি ‘কিনি’ না, বরং নির্দিষ্ট মাসিক বা বার্ষিক ফি-র বিনিময়ে সেটি ‘ব্যবহার’ করি। এই যে মালিকানার বদলে ব্যবহারের এই জয়জয়কার, একেই অর্থনীতিবিদরা বলছেন ‘সাবস্ক্রিপশন ইকোনমি’।

​সাবস্ক্রিপশন ইকোনমি কী?

​সহজ কথায়, সাবস্ক্রিপশন ইকোনমি হলো এমন একটি ব্যবসায়িক মডেল যেখানে গ্রাহক কোনো পণ্যের পুরো মালিকানা না কিনে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সেটির ব্যবহারের অধিকার বা সার্ভিস কিনে নেয়। এটি কেবল একটি লেনদেন নয়, বরং গ্রাহক ও কোম্পানির মধ্যে দীর্ঘমেয়াদী সম্পর্কের একটি মাধ্যম। এখানে বিক্রেতার লক্ষ্য থাকে কেবল একবার পণ্য বিক্রি করা নয়, বরং গ্রাহককে দীর্ঘকাল ধরে নিরবচ্ছিন্ন সেবা দিয়ে যাওয়া।

​বিবর্তনের ইতিহাস: দুধওয়ালা থেকে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম

​সাবস্ক্রিপশনের ধারণাটি নতুন নয়। বহু বছর ধরে আমরা খবরের কাগজ বা সকালে দুধ ক্রয়ের জন্য সাবস্ক্রিপশন ব্যবহার করে আসছি। তবে একবিংশ শতাব্দীতে প্রযুক্তির ছোঁয়ায় এটি আমূল বদলে গেছে। অ্যাডোবি (Adobe) বা মাইক্রোসফটের (Microsoft) মতো বড় টেক কোম্পানিগুলো যখন তাদের কয়েকশ ডলারের সফটওয়্যার বিক্রি বন্ধ করে মাসিক সাবস্ক্রিপশন মডেলে চলে গেল, তখন থেকেই এই বিপ্লবের প্রকৃত সূচনা। আজ আমরা কেবল মুভি বা মিউজিক নয়, এমনকি পোশাক, খাবার, জিমের সরঞ্জাম এবং বিদেশের অনেক জায়গায় গাড়িও সাবস্ক্রিপশন মডেলে ব্যবহার করছি।

​গ্রাহকরা কেন মালিকানা ত্যাগ করছেন?

​মানুষের এই আচরণগত পরিবর্তনের নেপথ্যে বেশ কিছু যৌক্তিক কারণ রয়েছে। কোনো দামী গাড়ি বা সফটওয়্যার একবারে অনেক টাকা দিয়ে কেনা অনেকের জন্যই কষ্টসাধ্য। কিন্তু নামমাত্র মাসিক ফিতে সেই একই সেবা উপভোগ করা অনেক বেশি সাশ্রয়ী মনে হয়।

আবার এই পদ্ধতিতে রক্ষণাবেক্ষণের ঝামেলা থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। আপনি যখন কোনো গাড়ির মালিক হন, তখন সেটির সার্ভিসিং বা ইন্স্যুরেন্সের দায়িত্ব আপনার। কিন্তু সাবস্ক্রিপশন মডেলে এসব দায়ভার সার্ভিস প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের। গ্রাহক কেবল ব্যবহারকারী হিসেবে নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন। তাছাড়া পুরনো মডেলে নতুন সংস্করণ এলে আবার টাকা দিয়ে কিনতে হতো। সাবস্ক্রিপশন মডেলে গ্রাহক স্বয়ংক্রিয়ভাবে সবসময় আধুনিক এবং উন্নত সেবাটি পান। তবে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য কারণটি হলো– বৈচিত্র্যের স্বাদ। একটি সিডি কিনলে আপনি কেবল সেই দশটি গানই শুনতে পারতেন। কিন্তু স্পটিফাই সাবস্ক্রিপশনে আপনি কোটি কোটি গানের অ্যাক্সেস পাচ্ছেন। এই বিশাল বৈচিত্র্য মালিকানা ত্যাগের অন্যতম প্রধান কারণ।

​কোম্পানিগুলোর লাভ কোথায়?

​ব্যবসায়িক দৃষ্টিকোণ থেকে এই মডেলটি অত্যন্ত আকর্ষণীয়। কোম্পানিগুলো জানে যে প্রতি মাসে তাদের নির্দিষ্ট পরিমাণ আয় হবে, যা ব্যবসায়িক পরিকল্পনা সহজ করে তোলে। এটি গ্রাহক অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণের মাধ্যমে কোম্পানিগুলোকে আরও বেশি সুবিধা প্রদান করে। সাবস্ক্রিপশন মডেলে কোম্পানিগুলো বুঝতে পারে গ্রাহক কোন সেবাটি বেশি পছন্দ করছেন। এই ডেটা ব্যবহার করে তারা তাদের সেবার মান আরও উন্নত করতে পারে। একবার পণ্য বিক্রি করলে গ্রাহকের সাথে সম্পর্ক শেষ হয়ে যাওয়ার ভয় থাকে, কিন্তু সাবস্ক্রিপশনে দীর্ঘ সময় ধরে গ্রাহককে খুশি রাখার চেষ্টা করতে হয়।

​এক্স-অ্যাজ-এ-সার্ভিস (XaaS) এবং নতুন ক্ষেত্র

​ডিজিটাল দুনিয়া ছাড়িয়ে এই মডেল এখন ভৌত পণ্য বা ফিজিক্যাল গুডসের দিকেও ঝুঁকছে। বর্তমানে অনেক দেশে ‘ফার্নিচার-অ্যাজ-এ-সার্ভিস’ চালু হয়েছে, যেখানে আপনি আপনার ঘরের আসবাবপত্র ভাড়ায় ব্যবহার করতে পারেন। ইউরোপের অনেক শহরে ‘মোবিলিটি-অ্যাজ-এ-সার্ভিস’ জনপ্রিয় হচ্ছে, যেখানে মানুষ ব্যক্তিগত গাড়ির বদলে সব ধরণের গণপরিবহনের জন্য একটি একক মাসিক পাস ব্যবহার করে। এমনকি রেস্টুরেন্টে কফি বা খাবার সরবরাহের ক্ষেত্রেও সাবস্ক্রিপশন চালু হয়েছে।

​সাবস্ক্রিপশন ক্লান্তি (Subscription Fatigue)

​তবে এই রঙিন জগতের একটি অন্ধকার দিকও রয়েছে। বর্তমানে অনেক মানুষ ‘সাবস্ক্রিপশন ক্লান্তি’-তে ভুগছেন। নেটফ্লিক্স, অ্যামাজন প্রাইম, ডিজনি প্লাস, নিউজ পোর্টাল, ক্লাউড স্টোরেজ- সব মিলিয়ে মাসের শেষে দেখা যায় ছোট ছোট অনেকগুলো পেমেন্ট মিলে একটি বিশাল অংক দাঁড়িয়েছে। অনেক সময় গ্রাহক ভুলেই যান তিনি কোন কোন সার্ভিসে সাবস্ক্রাইব করে রেখেছেন। একে বলা হয় ‘ভ্যাম্পায়ার এফেক্ট’, যা অজান্তেই ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা শুষে নেয়।

​ব্যক্তিগত মালিকানা কি হারিয়ে যাচ্ছে?

​প্রশ্ন উঠতে পারে, তবে কি আমরা আর কোনো কিছুর মালিক হবো না? গবেষকদের মতে, আবেগীয় মূল্যের জিনিসগুলো মানুষ এখনো কিনতে পছন্দ করে। যেমন- কাগজের বই বা পারিবারিক সম্পদ। কিন্তু যেসব জিনিস মূলত ব্যবহারের জন্য, মানুষ সেখানে মালিকানার চেয়ে ‘অ্যাক্সেস’ বা সহজলভ্যতাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।

​সাবস্ক্রিপশন ইকোনমি কেবল একটি সাময়িক ট্রেন্ড নয়, বরং এটি ভবিষ্যতের মূল অর্থনীতি। এটি মালিকানার বোঝা কমিয়ে আমাদের জীবনকে আরও নমনীয় ও গতিশীল করেছে। তবে গ্রাহক হিসেবে আমাদের সচেতন হতে হবে যেন প্রয়োজনের অতিরিক্ত সাবস্ক্রিপশনের জালে আমরা আটকা না পড়ি। অন্যদিকে, কোম্পানিগুলোর জন্য চ্যালেঞ্জ হলো কেবল সাবস্ক্রাইবার বাড়ানো নয়, বরং গ্রাহকের আস্থা ও সেবার মান ধরে রাখা। মালিকানা থেকে ব্যবহারের এই রূপান্তর আমাদের এক নতুন পৃথিবীর দিকে নিয়ে যাচ্ছে।

This post was viewed: 21

আরো পড়ুন