বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাস কেবল একটি ক্ষমতার পালাবদল ছিল না, এটি ছিল একটি প্রজন্মের জেগে ওঠার মহাকাব্য। যে প্রজন্মকে ‘এ্যাপলিটিক্যাল’ অপবাদে দূরে রাখা হয়েছিল, তারাই রাষ্ট্রের মেরামতের হাল ধরেছে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্রধান তিন মুখ- নাহিদ ইসলাম, হাসনাত আব্দুল্লাহ এবং আব্দুল হান্নান মাসুদ- এখন কেবল রাজপথের সমন্বয়ক নন, তারা এ দেশের ইতিহাসের প্রথম তিন ‘জেন-জি’ প্রতিনিধি যারা সংসদীয় এবং নীতি নির্ধারণী পর্যায়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছেন। এই তিন তরুণের হাত ধরে বাংলাদেশের রাষ্ট্রকাঠামোয় সূচিত হয়েছে এক অভূতপূর্ব রূপান্তর।
জেন-জি এবং রাজনৈতিক পরিবর্তনের জোয়ার
১৯৯৭ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে জন্ম নেওয়া প্রজন্মকে বলা হয় জেন-জি। এই প্রজন্মের বৈশিষ্ট্য হলো তারা প্রযুক্তিনির্ভর, স্পষ্টভাষী এবং প্রথাগত আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় অবিশ্বাসী। বাংলাদেশে গত ১৫ বছরের বদ্ধ রাজনৈতিক পরিবেশে এই প্রজন্মের ক্ষোভ যখন দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে, তখন তার নেতৃত্বে ছিলেন নাহিদ, হাসনাত ও মাসুদরা। তাদের এই যাত্রা শুরু হয়েছিল কোটা সংস্কারের দাবি নিয়ে, যা পরবর্তীতে এক দফার গণ-অভ্যুত্থানে রূপ নেয়। আজ তারা যখন সংসদীয় কর্মকাণ্ড ও রাষ্ট্র পরিচালনায় যুক্ত হয়েছেন, তখন তা রাজনীতিতেও এক বিশাল পরিবর্তনের সূচনা হিসেবে গণ্য হচ্ছে।
নাহিদ ইসলাম: বিপ্লবের আপোষহীন মুখ
অভ্যুত্থানের সময় নাহিদের ক্ষতবিক্ষত দেহের ছবি মানুষকে একদিকে করেছে আবেগাপ্লুত, আরেকদিকে ন্যায়বিচারের দাবিতে মাঠে নামতে অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছিল। নাহিদ ইসলাম সফল অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি এবং তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেছেন। রাজপথে নির্যাতনের শিকার হয়েও পিছু না হঠা নাহিদ ইসলামের শান্ত ও ধীরস্থির স্বভাব তাকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। পার্লামেন্টারি বা উপদেষ্টা হিসেবে তার ভূমিকা জেন-জি প্রজন্মের কাছে এক বড় আশার জায়গা। তিনি প্রমাণ করেছেন যে, তরুণরা কেবল ভাঙতে জানে না, তারা গড়ার ক্ষেত্রেও সমান পারদর্শী।
হাসনাত আব্দুল্লাহ: স্পষ্টবাদিতা ও তারুণ্যের কণ্ঠস্বর
হাসনাত আব্দুল্লাহর নাম শুনলেই মনে পড়ে যায় তার সেই দরাজ কণ্ঠ এবং আপোষহীন মনোভাব। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম প্রধান সমন্বয়ক হিসেবে তিনি রাজপথ থেকে শুরু করে বঙ্গভবন পর্যন্ত নিজের কণ্ঠস্বরকে জোরালো রেখেছেন। তিনি বর্তমানে রাষ্ট্র সংস্কার এবং বিভিন্ন সংসদীয় আলোচনা প্রক্রিয়ায় জেন-জি’র প্রতিনিধিত্ব করছেন। তার সোজাসাপ্টা কথা বলার ধরণ এবং প্রথাগত রাজনীতির মারপ্যাঁচকে তুচ্ছ করার মানসিকতা তরুণ সমাজকে দারুণভাবে অনুপ্রাণিত করেছে। তিনি কেবল সংসদীয় প্রক্রিয়ায় অংশ নিচ্ছেন না, বরং সংসদকে জনগণের কাছে জবাবদিহি করার এক নতুন সংস্কৃতি চালুর চেষ্টায় লিপ্ত হবেন– এটাই সবার প্রত্যাশা।
আব্দুল হান্নান মাসুদ: মাঠ পর্যায়ের কারিগর ও সাংগঠনিক শক্তি
আব্দুল হান্নান মাসুদ আন্দোলনের সেই শক্তি, যিনি মাঠ পর্যায় থেকে শুরু করে নীতিনির্ধারণী পর্যায় পর্যন্ত সাংগঠনিক দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। হাসনাত ও নাহিদের পাশাপাশি মাসুদের ভূমিকা ছিল আন্দোলনের সমন্বয় ও সংহতি রক্ষায় অপরিহার্য। অভ্যুত্থানের পরপরই তার এলাকা হাতিয়ার মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি পূরণ করেছেন। বর্তমানে তিনি রাষ্ট্র গঠনের বিভিন্ন ধাপে এবং সংসদীয় সংলাপে তরুণদের অধিকারের কথা বলছেন। জেন-জি’র প্রথম প্রজন্মের প্রতিনিধি হিসেবে মাসুদের উপস্থিতি নিশ্চিত করে যে, গ্রামীণ ও শহর- উভয় প্রান্তের তরুণদের দাবি যেন রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়।
নতুন বাংলাদেশের রাজনীতি: মেধা বনাম পরিবারতন্ত্র
বাংলাদেশের রাজনীতি দীর্ঘদিন ধরে পরিবারতন্ত্র এবং বয়োজ্যেষ্ঠদের বলয়ে বন্দি ছিল। হাসনাত, নাহিদ ও মাসুদের এই সংসদীয় বা রাষ্ট্রীয় যাত্রা সেই বলয়কে চূর্ণ করেছে। তারা কোনো রাজনৈতিক উত্তরাধিকার ছাড়াই নিজেদের মেধা ও ত্যাগের বিনিময়ে এই অবস্থানে পৌঁছেছেন। এটি দেশের কোটি তরুণকে এই বার্তা দিচ্ছে যে, রাজনীতি কেবল পেশীশক্তি বা অর্থের খেলা নয়, বরং এটি দেশপ্রেম এবং সঠিক দর্শনের বহিঃপ্রকাশ। তাদের এই উপস্থিতি সংসদের কার্যক্রমে নতুন প্রাণ সঞ্চার করেছে।
চ্যালেঞ্জ ও আগামীর প্রত্যাশা
তবে এই তিন তরুণের পথচলা মোটেও মসৃণ নয়। দীর্ঘদিনের ধ্বংসপ্রাপ্ত একটি শাসনব্যবস্থাকে সংস্কার করা এবং জনআকাঙ্ক্ষা পূরণ করা তাদের জন্য এক বিশাল চ্যালেঞ্জ। ‘জেন-জি’ প্রজন্মের মানুষের ধৈর্য কম এবং প্রত্যাশা আকাশচুম্বী। তাই হাসনাত, নাহিদ ও মাসুদদের প্রতি মুহূর্তের কাজ এখন সাধারণ মানুষের আতশ কাঁচের নিচে। তারা কি পারবেন পুরনো ঘুণে ধরা সিস্টেমের মধ্যে থেকেও নিজেদের আদর্শ বজায় রাখতে? তারা কি পারবেন রাষ্ট্রকে এমন এক জায়গায় নিয়ে যেতে যেখানে পরবর্তী প্রজন্ম কেবল ভোটের অধিকার নয়, বরং সামাজিক মর্যাদাও খুঁজে পাবে?
হাসনাত আব্দুল্লাহ, নাহিদ ইসলাম ও আব্দুল হান্নান মাসুদ- এই তিনটি নাম কেবল তিনজন ব্যক্তি নন, বরং একটি নতুন যুগের প্রতীক। তারা রাজপথ থেকে রাষ্ট্র পরিচালনার কেন্দ্রে এসে প্রমাণ করেছেন যে, সময় এসেছে প্রবীণদের অভিজ্ঞতা আর নবীণদের সাহসের মেলবন্ধনে একটি নতুন দেশ গড়ার। দেশের ইতিহাসের প্রথম তিন জেন-জি প্রতিনিধি হিসেবে তাদের সাফল্যই নির্ধারণ করে দেবে বাংলাদেশের আগামীর গতিপথ। এক বৈষম্যহীন, আধুনিক এবং গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের স্বপ্ন পূরণে তারা যে মশাল জ্বালিয়েছেন, তা যেন স্তিমিত না হয়- এটাই এখন কোটি মানুষের একমাত্র প্রত্যাশা।