Skip to main content

Ridge Bangla

সোনার ‘ক্যারেট’ বলতে আসলে কী বোঝানো হয়?

প্রাচীনকাল থেকেই মানবসভ্যতায় আভিজাত্য, সম্পদ এবং সৌন্দর্যের প্রতীক হিসেবে সোনার স্থান সবার উপরে। বিশেষ করে বাঙালি সংস্কৃতিতে বিয়েশাদি বা যেকোনো উৎসবে গয়না কেনার ধুম পড়ে যায়। গয়নার দোকানে গেলে আমরা নিয়মিত কিছু শব্দ শুনি- ২২ ক্যারেট, ২১ ক্যারেট কিংবা ১৮ ক্যারেট। সাধারণ ক্রেতাদের মনে প্রায়ই প্রশ্ন জাগে, এই ‘ক্যারেট’ আসলে কী? এটি কি সোনার ওজন নাকি গুণগত মান? কেনই বা গয়না তৈরিতে ২৪ ক্যারেট সোনা ব্যবহার করা হয় না?

​ক্যারেট (Karat) কী?

সহজ ভাষায় বলতে গেলে, ‘ক্যারেট’ হলো সোনার শুদ্ধতা পরিমাপের একটি একক। এটি কোনো ওজন পরিমাপক একক নয়। সোনার ক্ষেত্রে ‘Karat’ (সংক্ষেপে K) ব্যবহার করা হয় এটি বোঝাতে যে, একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ সংকর ধাতুর মধ্যে কত ভাগ খাঁটি সোনা রয়েছে। ​সোনার শুদ্ধতা পরিমাপের জন্য ২৪-কে ভিত্তি ধরা হয়। অর্থাৎ, কোনো ধাতব খণ্ডে যদি ২৪ ভাগের ২৪ ভাগই সোনা থাকে, তবে তাকে বলা হয় ২৪ ক্যারেট বা ১০০ শতাংশ খাঁটি সোনা। যদি ২৪ ভাগের মধ্যে ২২ ভাগ সোনা এবং বাকি ২ ভাগ অন্য ধাতু থাকে, তবে তা ২২ ক্যারেট সোনা।

​সোনার শুদ্ধতার গাণিতিক হিসাব

সোনার ক্যারেটকে শতাংশে রূপান্তর করার একটি সহজ গাণিতিক সূত্র রয়েছে। সেই সূত্র অনুযায়ী কোন সোনায় কত শতাংশ খাঁটি সোনা রয়েছে, সেটি বের করা সম্ভব।

যেমন- কোন ২৪ ক্যারেটের সোনার বারে ৯৯.৯৯ শতাংশ খাঁটি সোনা পাওয়া যায়। এতে কোনো ধরনের খাদ বা অন্য ধাতুর মিশ্রণ থাকে না। এর রং উজ্জ্বল হলুদ। আবার ২২ ক্যারেটের ক্ষেত্রে ২২ ভাগ সোনা এবং ২ ভাগ অন্য ধাতু (তামা, দস্তা, নিকেল বা রুপা) থাকে। অর্থাৎ, এটিতে ৯১.৬৭ শতাংশ খাঁটি সোনা বিদ্যমান থাকে। বাংলাদেশে গয়না তৈরির জন্য এটিই সবচেয়ে জনপ্রিয়। ২১ ক্যারেটের নামও শোনা যায় অনেক। এতে ২১ ভাগ সোনা এবং ৩ ভাগ খাদ থাকে। অর্থাৎ, এটি ৮৭.৫ শতাংশ খাঁটি সোনা পাওয়া যায়। আর সবচেয়ে কমের ক্ষেত্রে ১৮ ক্যারেটের নাম শুনে থাকবেন। এতে ১৮ ভাগ সোনা এবং ৬ ভাগ অন্য ধাতু থাকে। শতকরার হিসেবে এতে ৭৫ শতাংশ খাঁটি সোনা। পাথর বসানো বা হীরা খচিত গয়না তৈরির জন্য এটি আদর্শ।

গয়না তৈরিতে কেন ২৪ ক্যারেট সোনা ব্যবহার করা হয় না?

এটি একটি অত্যন্ত যৌক্তিক প্রশ্ন। ২৪ ক্যারেট সোনা ১০০ শতাংশ খাঁটি হওয়া সত্ত্বেও গয়না তৈরির জন্য অনুপযুক্ত। এর প্রধান কারণ হলো খাঁটি সোনার চরম নমনীয়তা। খাঁটি সোনা এতটাই নরম যে, তা দিয়ে তৈরি গয়না সাধারণ চাপেই বেঁকে যেতে পারে বা আকৃতি হারিয়ে ফেলতে পারে। এছাড়া খাঁটি সোনা খুব দ্রুত ক্ষয় হয় এবং স্ক্র্যাচ পড়ার সম্ভাবনা থাকে।

​গয়নাকে শক্ত এবং টেকসই করার জন্য এর সাথে তামা, দস্তা, রুপা বা ক্যাডমিয়ামের মতো শক্ত ধাতু মেশানো হয়। এই মিশ্রণই সোনাকে স্থায়িত্ব দেয়, যা দিয়ে সূক্ষ্ম নকশার গয়না তৈরি করা সম্ভব হয়।

​ক্যারেট বনাম ক্যারেট (Karat vs Carat)

অনেকেই ‘Karat’ এবং ‘Carat’ শব্দ দুটির মধ্যে গুলিয়ে ফেলেন। উচ্চারণ এক হলেও এদের অর্থ ভিন্ন। ​Karat (K) বলতে এটি শুধুমাত্র সোনার শুদ্ধতা বা বিশুদ্ধতা বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। আর ​Carat (Ct) এটি হীরা, চুনি, পান্নার মতো মূল্যবান রত্নপাথরের ওজন পরিমাপের একক। ১ ক্যারেট সমান ২০০ মিলিগ্রাম।

​সোনার রঙের বৈচিত্র্য ও ক্যারেট

সোনার সাথে কোন ধরনের ধাতু মেশানো হচ্ছে, তার ওপর ভিত্তি করে সোনার রঙের পরিবর্তন হতে পারে। তামা এবং দস্তার মিশ্রণে তৈরি হয় হলুদ সোনা। আবার সাদা সোনার ক্ষেত্রে হলুদ সোনার সাথে প্যালাডিয়াম, নিকেল বা ম্যাঙ্গানিজ মিশিয়ে এটি তৈরি করা হয়। সাধারণত ১৮ ক্যারেটে এটি বেশি দেখা যায়।

​সোনার সাথে তামার পরিমাণ বাড়িয়ে দিলে এটি গোলাপি আভা ধারণ করে।

​হলমার্কিং ও শুদ্ধতা যাচাই

ক্রেতা হিসেবে আপনি যে সঠিক ক্যারেটের সোনা কিনছেন, তার নিশ্চয়তা দেয় ‘হলমার্ক’। হলমার্ক হলো একটি সরকারি বা স্বীকৃত সংস্থার সিল যা গয়নার ভেতরের দিকে খোদাই করা থাকে। যেমন— ২২ ক্যারেটের গয়নায় ‘916’ লেখা থাকে, যার অর্থ ৯১.৬ শতাংশ সোনা। ১৮ ক্যারেটের ক্ষেত্রে লেখা থাকে ‘750’। গয়না কেনার সময় এই হলমার্ক দেখে নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। ​এছাড়াও বর্তমানে ‘অ্যাসিড টেস্ট’ বা ‘ইলেকট্রনিক গোল্ড টেস্টার’ মেশিনের মাধ্যমে সোনার সঠিক ক্যারেট নিরূপণ করা যায়।

সোনা কেনা মানেই কেবল অলংকার কেনা নয়, এটি একটি দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগও বটে। তাই ক্যারেটের হিসাব বোঝা প্রত্যেক সচেতন ক্রেতার জন্য আবশ্যক। আপনি যদি বিনিয়োগের জন্য সোনা কিনতে চান, তবে ২৪ ক্যারেটের সোনার বার বা কয়েন কেনা বুদ্ধিমানের কাজ। আর যদি ব্যবহারের জন্য গয়না কিনতে চান, তবে স্থায়িত্বের কথা চিন্তা করে ২২ বা ১৮ ক্যারেট বেছে নেওয়াই শ্রেয়। সোনার ক্যারেট সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান থাকলে আপনি প্রতারণা থেকে বাঁচবেন এবং আপনার কষ্টের উপার্জনের সঠিক মূল্য নিশ্চিত করতে পারবেন।

This post was viewed: 28

আরো পড়ুন