দীর্ঘ ১০ মাস বন্ধ থাকার পর বুধবার থেকে বাংলাদেশের একমাত্র প্রবালসমৃদ্ধ দ্বীপ সেন্টমার্টিনে ফের প্রাণচাঞ্চল্য ফিরেছে। বেলা ২টার দিকে হালকা রোদে ঝিলমিল করছে দ্বীপ, সবখানে প্রকৃতির সৌন্দর্য। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা পর্যটকদের উপস্থিতিতে সৈকত, হোটেল, রেস্তোরাঁ ও বাজার আবারও মুখর হয়ে উঠেছে। দীর্ঘদিন পর পর্যটকদের উপস্থিতি দেখে স্থানীয়রা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছেন। স্থানীয়রা বলছেন, ‘দ্বীপে মানুষ এলে আমাদের ঘরেও আলো জ্বলে।’
সেন্টমার্টিনের সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, বুধবার তৃতীয় দিনে চারটি জাহাজে ১৩৯৬ জন পর্যটক দ্বীপে পৌঁছেছেন। স্থানীয় বাসিন্দা মীর আহমেদ, যিনি পর্যটন বন্ধ থাকার কারণে ব্যবসায়িক ক্ষতির মুখে ছিলেন, আনন্দের সঙ্গে বলেন, দীর্ঘদিন পর আবার মানুষ দেখতে পেলাম, দোকান খুলেছি। মনে হলো দ্বীপটা আবার বেঁচে উঠল। প্রবাল সংরক্ষণে কাজ করা যুবক ওসমান গণি বলেন, পর্যটন আমাদের জীবিকা, তবে পরিবেশও বুঝতে হবে। এবার যে নিয়ম-কানুন কঠোর করা হয়েছে, এতে প্রবাল ও প্রকৃতি বাঁচবে বলে আশা করি।
ঢাকা মগবাজার থেকে আসা পর্যটক আরফাত হোসেন প্রথমবার সেন্টমার্টিনে পা রেখেছেন। তিনি বলেন, সমুদ্রযাত্রাটা দারুণ ছিল। দ্বীপে নামার পরই মনে হলো স্বর্গে চলে এসেছি। দীর্ঘদিন অপেক্ষার পর এসে সত্যিই ভালো লাগছে। আজহারুল ইসলাম নামের আরেক পর্যটক বলেন, দ্বীপে প্রবেশের সময় কিউআর কোড স্ক্যান ও তথ্য যাচাই সবই খুব সুশৃঙ্খল মনে হলো। নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনা দেখে অভিভূত। এবার একটু গোছানো মনে হয়েছে। সেন্টমার্টিনের পূর্বপাড়ার ব্লু সী রিসোর্টের ম্যানেজার মোহাম্মদ রাসেল বলেন, “অনেক খরচ করে হোটেল ও রিসোর্ট মেরামত ও সংস্কার করা হয়েছে। দুই দিনে যে পর্যটক এসেছে, মাত্র চারটি রুম বুকিং হলো। প্রথম দিনে পর্যটক আসেনি। সরকারি নিয়মনীতির কারণে ব্যবসায়ীরা দু’মাসে খরচ পূরণ করতে পারবে বলে মনে হচ্ছে না।”
কোস্টাল প্যালেস রিসোর্টের ইয়াসিন জানান, দুই দিনে মাত্র ৪০ শতাংশ রুম বিক্রি হয়েছে। অনেক রিসোর্ট এখনও খোলা হয়নি, কেউ কেউ সংস্কারের কাজ চালাচ্ছেন। সী ক্রুজ অপারেটর ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সাধারণ সম্পাদক হোসাইন ইসলাম বাহাদুর বলেন, আজ মঙ্গলবার তিনটি জাহাজে ১,১৯৪ জন পর্যটক সেন্টমার্টিন গেছেন।
ট্যুরিস্ট পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি আপেল মাহমুদ জানান, পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রতিটি ঘাট, জাহাজ এবং দ্বীপে পর্যাপ্ত ট্যুরিস্ট পুলিশ মোতায়েন আছে। সার্বক্ষণিক নজরদারি চলছে। কেউ কোনো সমস্যায় পড়লে সঙ্গে সঙ্গে সহযোগিতা করা হচ্ছে। পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজার কার্যালয়ের পরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. জমির উদ্দিন জানান, “জাহাজগুলো কঠোর নজরদারিতে থাকবে। দৈনিক দুই হাজারের বেশি পর্যটক সেন্টমার্টিনে যাতায়াত করতে পারবে না। নুনিয়ারছড়া ও সেন্টমার্টিন জেটিঘাটে পৃথক তল্লাশির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।”
প্রতিদিন পর্যটকদের জন্য আরও চারটি জাহাজ প্রস্তুত রয়েছে। প্রশাসনের অনুমতি পেলেই ধাপে ধাপে রুটে নামানো হবে। আগামী ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত নুনিয়ারছড়া ঘাট থেকে পর্যটকবাহী জাহাজ চলাচল অব্যাহত থাকবে। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় গত ২২ অক্টোবর সেন্টমার্টিনে পর্যটন ও পরিবেশ সংরক্ষণ নিশ্চিত করতে ১২টি নির্দেশনাসহ প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। প্রজ্ঞাপনের অধীনে সেন্টমার্টিনে ১ ফেব্রুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত পর্যটক যাতায়াত সম্পূর্ণ বন্ধ ছিল। এবার নভেম্বর থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত তিন মাস পর্যটকরা দ্বীপে যেতে পারবেন। প্রতিদিন সর্বোচ্চ দুই হাজার পর্যটক দ্বীপে প্রবেশ করতে পারবে, তবে সরকারি ১২টি নির্দেশনা মেনে চলা বাধ্যবাধক।
প্রজ্ঞাপনের প্রধান নির্দেশনা হলো, নভেম্বরে দিনভর ভ্রমণের অনুমতি থাকবে; রাতযাপন নিষিদ্ধ। ডিসেম্বর ও জানুয়ারি মাসে রাতযাপন করা যাবে। অনুমোদন ছাড়া কোনো নৌযান দ্বীপে প্রবেশ করতে পারবে না। পর্যটকদের বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের স্বীকৃত ওয়েব পোর্টাল থেকে অনলাইনে টিকিট নিতে হবে। প্রতিটি টিকিটে ট্রাভেল পাস ও কিউআর কোড থাকবে; কিউআর কোড ছাড়া টিকিট নকল হিসেবে গণ্য হবে।
পর্যটকরা রাতে সৈকতে আলো জ্বালাতে পারবেন না, শব্দ সৃষ্টি, বারবিকিউ পার্টি, কেয়াবনে প্রবেশ, কেয়া ফল সংগ্রহ বা বিক্রয় করা যাবে না। সামুদ্রিক কাছিম, পাখি, প্রবাল, রাজকাঁকড়া, শামুক-ঝিনুকসহ জীববৈচিত্র্য ক্ষতি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। সৈকতে মোটরসাইকেল ও সি-বাইকসহ কোনো মোটরচালিত যান চলাচল অনুমোদিত নয়। পর্যটকদের জন্য প্লাস্টিক ব্যবহারের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। একবার ব্যবহার্য প্লাস্টিক যেমন চিপসের প্যাকেট, চামচ, স্ট্র, সাবান, শ্যাম্পুর মিনিপ্যাক বা ৫০০/১০০০ মিলিলিটার বোতল ব্যবহার নিষিদ্ধ। পর্যটকদের নিজস্ব পানির ফ্লাস্ক সঙ্গে রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
সেন্টমার্টিনে পর্যটন শুরু হওয়ায় স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা দেখা দিয়েছে। হোটেল, রেস্তোরাঁ ও দোকানগুলো আবারও চালু হয়েছে। প্রবাল সংরক্ষণে নিয়ম-কানুন মানার প্রতি গুরুত্বারোপ করা হচ্ছে। পর্যটকরা নিয়ম মেনে দ্বীপে প্রবেশ করছেন, নিরাপত্তা ও পরিবেশ সংরক্ষণে প্রশাসনের তৎপরতা অব্যাহত। পর্যটকদের উপস্থিতিতে দ্বীপের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের পাশাপাশি স্থানীয় অর্থনীতি সচল হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা আশা করছেন, আগামী দুই মাস পর্যটন কার্যক্রম থেকে তাদের কিছুটা ক্ষয়ক্ষতি পূরণ হবে। তবে সরকারি বিধি মেনে চলা নিশ্চিত করতে প্রশাসন ও পরিবেশ সংরক্ষকরা নিয়মিত তদারকি চালাচ্ছেন। দীর্ঘ ১০ মাস পর ফের প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে এসেছে সেন্টমার্টিনে। পর্যটন শুরু হওয়ায় স্থানীয়রা আনন্দিত। সৈকতে পর্যটকদের হাসি ও আনন্দ, হোটেল ও রেস্তোরাঁয় ব্যস্ততা, এবং ব্যবসায়ীদের উদ্দীপনা এক নতুন প্রাণ ঢেলে দিয়েছে দ্বীপে। সেন্টমার্টিন আবারও জীবনতরঙ্গের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।