Skip to main content

Ridge Bangla

যেভাবে ইসরায়েল ও ভারত ধ্বংস করতে চেয়েছিল পাকিস্তানের পারমাণবিক স্থাপনা

১৯৮০-এর দশকের গোড়ার দিকে, পাকিস্তানের পারমাণবিক কেন্দ্র ধ্বংস করার লক্ষ্যে ভারত এবং ইসরায়েল একসঙ্গে এক সামরিক অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। তৎকালীন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী মেনাখেম বেগিন এই বিষয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে ১৯৭৯ সালেই যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচারকে চিঠি লেখেন। পাকিস্তান ও লিবিয়ার নেতা মুয়াম্মার গাদ্দাফির মধ্যে সম্পর্ক নিয়ে সতর্ক করে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন, পাকিস্তান হয়ত পারমাণবিক প্রযুক্তি লিবিয়ায় হস্তান্তর করতে পারে।

অপারেশন সম্ভাব্যতা এবং প্রস্তুতি

ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘RAW’ নিশ্চিত করেছিল, পাকিস্তানের কাহুটায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের কাজ চলছে। ইসরায়েল এই তথ্যের ভিত্তিতে ভারতকে সামরিক পরিকল্পনা, বিমান ও রসদ সহায়তার প্রস্তাব দেয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ইসরায়েলি ‘এফ-১৬’ ও ‘এফ-১৫’ যুদ্ধবিমান ভারতের আকাশসীমায় প্রবেশ করে গুজরাটের জামনগর ও জম্মুর উধমপুর ঘাঁটিতে জ্বালানি ভরবে। পাশাপাশি, ভারতের নিজস্ব জাগুয়ার স্ট্রাইক বিমানও অভিযানে অংশ নেবে। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী নাকি প্রাথমিকভাবে এই হামলার অনুমোদন দিয়েছিলেন। তবে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক পরিস্থিতির চাপে সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন। পরে তাঁর পুত্র রাজীব গান্ধী ক্ষমতায় এসে পুরো পরিকল্পনাটিই চিরতরে গুটিয়ে দেন।

অ্যাড্রিয়ান লেভি ও ক্যাথরিন স্কট-ক্লার্ক রচিত ‘Deception: Pakistan, the US, and the Global Weapons Conspiracy’ বইয়ে বর্ণিত আছে, ইসরায়েল পাকিস্তানের কাহুটা পরমাণু স্থাপনাকে লক্ষ্য করে একটি যৌথ সামরিক অভিযানের প্রস্তাব দিয়েছিল। তাদের মূল উদ্বেগ ছিল তথাকথিত “ইসলামিক বোমা”। এই হামলার ছক অনেকটা ১৯৮১ সালে ইরাকের ওসিরাক পরমাণু চুল্লির ওপর ইসরায়েলের সফল বিমান হামলার অনুকরণে গঠিত হয়েছিল।

ইসরায়েল পাকিস্তানের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়ে ভারতের আগেই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। ১৯৬৫ ও ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে জয়লাভের আত্মতুষ্টি ভারতকে কিছুটা উদাসীন বানিয়েছিল। ১৯৭৪ সালের ‘শান্তিপূর্ণ’ পরমাণু পরীক্ষা ভারতে কৃতিত্বের দাবি জাগালেও, তারপর ইন্দিরা গান্ধীর জরুরি অবস্থার ঘোষণা ও দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে গভীর মনোযোগ ব্যাহত করে।

তৎকালীন জনতা পার্টি সরকার এবং প্রধানমন্ত্রী মোরারজি দেশাই ছিলেন শান্তিবাদী। ফলে পরমাণু বা প্রতিরক্ষা নীতি তাঁদের অগ্রাধিকারের তালিকায় ছিল না। এরই মাঝে পাকিস্তান তাদের বোমা তৈরির পথে এগিয়ে যায়, যার মূল নীতি নির্ধারক ছিলেন জুলফিকার আলী ভুট্টো। তাঁর বিখ্যাত উক্তি ছিল, “আমরা ঘাস খেয়ে হলেও পারমাণবিক বোমা তৈরি করব।”

ইসরায়েলের উদ্দেশ্য ছিল, আরেকটি ইসলামি রাষ্ট্রকে পারমাণবিক শক্তিধর হয়ে উঠতে বাধা দেওয়া। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কাহুটা অভিযান বাস্তবায়িত হয়নি। পাকিস্তানের ইসলামপন্থি স্বৈরশাসক জিয়া-উল-হকের আমলে, যখন কাহুটা হয়ে উঠছিল পাকিস্তানের পারমাণবিক মস্তিষ্ক, তখনও ভারত থেমে থাকল। ইসরায়েল অপেক্ষা করল। কিন্তু সে সুযোগ আর এলো না।

কেন শেষমেশ থেমে গেলেন ইন্দিরা?

১৯৮০-এর দশকের ভারত ছিল প্রবল অস্থিরতায় পরিপূর্ণ। পাঞ্জাবে তখন শিখ বিচ্ছিন্নতাবাদ জোরদার হচ্ছে। আফগানিস্তান থেকে সোভিয়েত সেনা বিতাড়নের কাজে পাকিস্তানের ভূমিকার কারণে জিয়া-উল-হকের ইসলামাবাদ ও রোনাল্ড রিগানের আমেরিকার মধ্যে গভীর সম্পর্ক তৈরি হয়। সেই অবস্থান থেকেই জিয়া সাহস পেয়ে ভারতের জম্মু ও কাশ্মীরে অস্থিরতা উসকে দিতে শুরু করেন।

জম্মু ও কাশ্মীর তখন উত্তপ্ত হয়ে উঠছিল। বিশেষ করে দিল্লিতে জে.কে.এল.এফ-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা মকবুল ভাটের ফাঁসির পর। এই অস্থিরতা চলার পাশাপাশি উত্তরের হিমশীতল প্রান্তে, সিয়াচেন হিমবাহ অঞ্চলে ভারত-পাকিস্তান মুখোমুখি হয়ে পড়ে।

এমন পরিস্থিতিতে ভারতের নীতিনির্ধারক মহলে শুরু হয় গোপন আলোচনার আরেক দিক। যদি ইসরায়েল হামলা চালায়, তাহলে পারমাণবিক প্রতিক্রিয়া ও তার বাইরেও সম্ভাব্য পরিণতি ভারতের জন্য কী হতে পারে? হামলার প্রধান দায় নিতে চাইলেও, ইসরায়েল থাকত দূরে আর ভারতের সীমানাতেই হতো তার প্রতিঘাত। ভৌগোলিকভাবে পাকিস্তানের কাছাকাছি থাকায় ভারতকে পড়তে হতো প্রত্যক্ষ বিপদের মুখে।

তার ওপর ছিল আমেরিকান সমীকরণ। সে সময় আফগান মুজাহিদিনদের সোভিয়েত বাহিনীর বিরুদ্ধে অস্ত্র দিতে গিয়ে ওয়াশিংটন পুরোপুরি পাকিস্তাননির্ভর হয়ে পড়ে। তাই দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত-ইসরায়েল যৌথ অভিযানে আমেরিকার অনাস্থা ছিল স্বাভাবিক।

বিভিন্ন সূত্র অনুযায়ী, সিআইএ এই সম্ভাব্য হামলার খবর ইসলামাবাদকে জানিয়ে দেয়। এর জেরে পাকিস্তান ভারতের উদ্দেশে হুমকি দেয়, যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে সদ্য প্রাপ্ত এক-১৬ যুদ্ধবিমান দিয়ে ভারতের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় পালটা হামলা চালানো হবে।

এই সব জটিল প্রেক্ষাপটেই আসে বড় দুটি রাজনৈতিক মৃত্যু। ১৯৮৪ সালে ইন্দিরা গান্ধীর হত্যাকাণ্ড, এবং ১৯৮৮-তে বিমান দুর্ঘটনায় জিয়া-উল-হকের মৃত্যু। পরবর্তী সময়ে রাজীব গান্ধী ভারতের প্রধানমন্ত্রী হন, আর পাকিস্তানে ক্ষমতায় আসেন বেনজির ভুট্টো।

১৯৮০-এর দশকের শেষ দিকে, পাকিস্তান পারমাণবিক অস্ত্র উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি অর্জন করে। এই কর্মসূচির মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন আব্দুল কাদির খান, যিনি ডাচ পরমাণু কেন্দ্রে কাজ করার সময় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ প্রযুক্তির নকশা চুরি করেছিলেন। পরে চীন ও উত্তর কোরিয়ার সহায়তায় পাকিস্তানের পারমাণবিক বোমা বাস্তবতায় রূপ পায়।

১৯৮৮ সালে, ভারতের প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টো পারস্পরিক পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর ওপর হামলা নিষিদ্ধ করে একটি ঐতিহাসিক চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। সেই থেকে প্রতিবছর ১ জানুয়ারি, দুই দেশ একে অপরের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর তালিকা বিনিময় করে আসছে। এর ফলে, অন্তত নীতিগতভাবে, পারমাণবিক কেন্দ্র লক্ষ্য করে হামলার বিষয়টি দক্ষিণ এশিয়ার যুদ্ধ-সমীকরণ থেকে বাদ পড়ে।

তথ্যসূত্র
  1. 1979–1983: When Israel was ready to help India denuclearise
  2. Israel Once Wanted To Strike Pakistan With India Help Here Is Why
  3. India could have destroyed Pakistan’s nuclear site, Israel had …
  4. The Israel Offer Of The 1980s To Neutralise Pakistan Nuclear …
  5. Why India balked at Israel’s plans to do to Pakistan what Israel has …
This post was viewed: 50

আরো পড়ুন