Skip to main content

Ridge Bangla

নারমার: প্রাচীন মিশরের প্রথম ফারাও

প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতার উৎপত্তি আজও রহস্যঘেরা। ইতিহাসের পাতা ঘেঁটে কয়েকজন প্রাচীন রাজার নাম জানা গেলেও, তবে জীবনের বিশদ বিবরণ পাওয়া যায় না। কিন্তু এই অনিশ্চিত ইতিহাসে এক নাম উজ্জ্বলভাবে জ্বলজ্বল করছে। সেটি হলো নারমার। প্রাচীন উৎসগুলোর অধিকাংশই তাকে মিশরের প্রথম রাজা হিসেবে উল্লেখ করে, যিনি দুই মিশরকে একত্র করেছিলেন। ফারাও নারমারের সম্পর্কিত কিছু দিক নিয়েই আজকের এই আলোচনা।

১.

প্রথম ফারাও নারমারের রাজত্বের প্রমাণ পাওয়া যায় বিখ্যাত ‘পালেরমো পাথর’ থেকে, যা রাজাদের নাম ও বার্ষিক ঘটনার তালিকা ধারণ করে রেখেছে। তবে এই পাথরের অনেকটাই ভাঙা। যে অংশে প্রথম রাজা ও তার উত্তরসূরির নাম ছিল, সেটি অনুপস্থিত। তবে মিশরবিদদের মাঝে সাধারণভাবে নারমারকেই ১ম রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে ধরা হয়। চূড়ান্ত প্রমাণের অভাবে বিষয়টি নিয়ে মাঝে মাঝে বিতর্ক উঠলেও, এটিই সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত।

২.

প্রাচীন মিশরীয় লেখার ধরন ছিল আইডিওগ্রাফিক। নারমার নামটি গঠিত হয়েছে দুটি চিহ্ন দিয়ে। একটি ক্যাটফিশ (নার) এবং একটি ছেনি (মার)। এই দুটি চিহ্ন খোদাই করা আছে বিখ্যাত নারমার প্যালেটে, যেখানে রাজাকে এক বিজয়ী যোদ্ধা হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে। অন্যান্য শিল্পকর্মেও রাজাকে ক্যাটফিশরূপে যুদ্ধরত হিসেবে দেখা যায়।

৩.

দুই শতাব্দী ধরে খোঁজাখুঁজির পরও নারমারের সমাধিস্থল নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। প্রাচীন রাজবংশের প্রথম দিককার ফারাওরা ‘মাস্তাবা’ নামে পরিচিত মাটির ইটের সমাধিতে সমাহিত হতেন। ধারণা করা হয়, নারমারও সাক্কারার কোনো মাস্তাবায় সমাহিত। কিন্তু নারমারের নামসহ কোনো মাস্তাবা এখনও আবিষ্কৃত হয়নি। পরে আবিদোসের পাশে উম্ম এল-কাআব নামক স্থানে আবিষ্কৃত হয় রাজকীয় সমাধিক্ষেত্র। ১৯৬৪ সালে জার্মান পুরাতত্ত্ববিদ ভার্নার কাইজার এখানকার এক খোদাই থেকে নারমারের নাম শনাক্ত করেন। কিন্তু সমাধিক্ষেত্রটি অতীতে প্রচুর লুটপাট ও ধ্বংসের শিকার হওয়ায়, নারমারের প্রকৃত কবরটি চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি।

৪.

প্রাচীন গ্রিক ঐতিহাসিক হেরোডোটাস খ্রিষ্টপূর্ব ৪৪৫ সালে মিশর ভ্রমণ করে প্রথম রাজা হিসেবে যাকে উল্লেখ করেন, তিনি ছিলেন ‘মেনেস’। নারমারের নাম তিনি উল্লেখ করেননি। ফলে অনেকেই মনে করেন, নারমার ও মেনেস আসলে একই ব্যক্তি। তবে সমস্যাটি হলো, হেরোডোটাস নারমারের মৃত্যুর প্রায় আড়াই হাজার বছর পর মিশর সফর করেন।

মিশরের রাজারা সাধারণত একাধিক নাম ধারণ করতেন। বিখ্যাত মিশরবিদ উইলিয়াম ফ্লিন্ডার্স পেট্রি দাবি করেন, নারমার ছিল তার জন্মনাম, আর মেনেস একটি উপাধি। আরেক ইতিহাসবিদ, গ্রিক-ভাষী মিশরীয় পুরোহিত মানেথো খ্রিষ্টপূর্ব ৩য় শতকে লেখেন, মেনেসই ছিলেন প্রথম রাজা, যিনি দুই মিশরকে একত্র করে প্রথম রাজবংশ প্রতিষ্ঠা করেন। যদিও তার বিবরণে সময়কাল ও শাসনকাল নিয়ে পার্থক্য আছে, তবু তিনি এবং হেরোডোটাস, উভয়েই তাকে প্রথম রাজা হিসেবে স্বীকৃতি দেন।

৫.

জলহস্তী প্রাচীন মিশরে এক ভয়ঙ্কর ও সম্মানজনক প্রাণী হিসেবে বিবেচিত ছিল। হেলেনিস্টিক যুগের ইতিহাসবিদ মানেথো লিখেছেন, মেনেস একটি জলহস্তীর আক্রমণে প্রাণ হারান। মিশরীয় ঐতিহ্যে রাজাদের মৃত্যু নিয়ে খোলাখুলি কিছু বলা না হলেও, হেলেনিস্টিক যুগে গ্রিক লেখকরা এই তথ্য লিপিবদ্ধ করেন।

৬.

মিশরের ফেরাউনদের যে নির্দিষ্ট পোশাক ও অলংকার দেখা যায়, তার সূচনা নারমারের হাত ধরেই। নারমার প্যালেটে দেখা যায়, তিনি একহাতে শত্রুর চুল চেপে অলংকার আছেন, অন্য একহাতে ধরে আছেন হাতে অস্ত্র। এই প্যালেটে তিনি দুই ধরনের মুকুট পরিধান করেছেন। ঊর্ধ্ব মিশরের জন্য সাদা মুকুট ও নিম্ন মিশরের জন্য লাল মুকুট। দুই মুকুট একত্রে পরাকে একত্রীকরণই বোঝায়। তিনি পরিধান করেছিলেন, শাসক শক্তির প্রতীক পশুর লেজ (প্রথমে ষাঁড়ের, পরে কুকুরের)। তার পরনের ‘শেন্দিত পরবর্তী সমস্ত ফেরাউনই অনুসরণ করেন।

এই প্যালেটেই প্রথম দেখা যায় ‘রাজদাড়ি’, যা পরবর্তীকালে তুতানখামুনসহ প্রায় সব ফেরাউনের মুখমণ্ডলে এক অবিচ্ছেদ্য চিহ্ন হয়ে দাঁড়ায়। তার পাশেই রয়েছে এক রাজপুরোহিত, যার দায়িত্ব পথচলার সময় রাজার জুতা বহন করা। মিশরীয় বিশ্বাসে, রাজ পাদুকা ছিল একমাত্র বস্তু যা ফারাওকে মানবজাতি থেকে পৃথক করে দেবত্বের ভূমিকায় স্থাপন করত। এই প্রথার শুরুটা হয়েছিল নারমার থেকেই।

৭.

নারমার ছিলেন একজন দক্ষ সেনাপতি। হেরোডোটাস ও মানেথোর বিবরণে উঠে আসে তার সামরিক সাফল্যের কাহিনি। তার প্যালেট, হাতুরির মাথা, হস্তিদাঁতের ফলক ও সিলমোহর, সব ছিল কিছুতেই তার যুদ্ধজয়ের চিহ্ন রয়েছে। তার শক্তি কেবল মিশরের অভ্যন্তরেই সীমাবদ্ধ ছিল না। প্রত্নতাত্ত্বিক খননে দক্ষিণ ইসরায়েল অঞ্চলে নারমারের নামাঙ্কিত সেরেখ পাওয়া গেছে। এর মানে, তিনি হয়ত মিশরের সীমানা পেরিয়ে প্যালেস্টাইন পর্যন্ত অভিযান পরিচালনা করেছিলেন।

৮.

মানেথোর বিবরণ অনুযায়ী, নারমার ছিলেন একাধিক গুরুত্বপূর্ণ নগর প্রতিষ্ঠার নায়ক। তিনি মেমফিস নগরী প্রতিষ্ঠা করেন, যা পরে একত্রিত মিশরের প্রথম রাজধানী হয়ে ওঠে। এছাড়াও, তাঁকে শহরের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবেও ধরা হয়। এই শহরেই তিনি দেবতা হোরাসের উপাসনা প্রবর্তন করেন, যা ছিল প্রথম রাষ্ট্র-ধর্মীয় আচার। নগর প্রতিষ্ঠার প্রথায় রাজা নিজ হাতে নদীতীরে লাঙল চালিয়ে নির্দিষ্ট করতেন শহরের সীমা। তারপর শুরু হতো মন্দির, প্রাসাদ ও ধানের গুদাম নির্মাণ। এই প্রক্রিয়াই মিশরের প্রশাসনিক কাঠামো ও সামাজিক জীবনযাত্রার ভিত্তি রচনা করে দেয়।

৯.

নারমারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কীর্তি হলো ঊর্ধ্ব ও নিম্ন মিশরের একত্রীকরণ। এই ঐক্যের মাধ্যমেই আফ্রিকার প্রথম রাষ্ট্র গড়ে ওঠে, যার স্থায়িত্ব হয় হাজার বছরের বেশি। রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও প্রশাসনিক দিক থেকে এই একীকরণ ছিল মানব ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।

১০.

‘নারমার প্যালেট’ আবিষ্কৃত হয় নেখেন শহরের হোরাস মন্দিরের ‘মূল ভাণ্ডার’ থেকে। এর সন্ধান পান খ্রিষ্টীয় উনিশ শতকের প্রত্নতত্ত্ববিদ জেমস কুইবেল ও ফ্রেডেরিক গ্রিন। খননের নথিপত্র অগোছালো থাকলেও এটি স্পষ্ট যে, নারমারের মতো প্রাচীন এক রাজাকে ভবিষ্যতের ফেরাউনেরা সম্মান জানাতেন।

নারমার কেবল একজন রাজা ছিলেন না, ছিলেন রাষ্ট্র, ধর্ম ও সংস্কৃতির একজন মহান স্থপতি। তার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, সামরিক প্রতাপ এবং প্রতীকী প্রতিভা মিশরীয় সভ্যতার ভিত্তি রচনা করেছিল।

Source:
  1. Narmer
  2. Early Dynastic Period Rulers Narmer
  3. Menes | Pharaoh, Accomplishments, Definition, History
  4. The Narmer Palette: Politics in Early Dynastic Egypt
  5. Narmer: 10 Facts on the First Egyptian Pharaoh
This post was viewed: 59

আরো পড়ুন