Skip to main content

Ridge Bangla

আসহাবে কাহফ: আব্রাহামিক ধর্মে ঘুমন্ত গুহাবাসীর কাহিনী

আসহাবে কাহফের গল্প শোনেনি এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। এই নামে পবিত্র কুরআনে একটি সূরাই আছে। সূরা আল-কাহফ (Surah Al-Kahf) কুরআনের অষ্টাদশ সূরা, যেখানে ১১০টি আয়াত আছে। এই সূরার প্রথম থেকে বিরাশি নম্বর আয়াত মক্কায় অবতীর্ণ বলে প্রমাণ পাওয়া যায়, বাকি অংশ নাযিল হয় মদিনাতে।

ইসলামি বর্ণনা

সূরার নবম আয়াতে প্রথম একদল যুবকের বিবরণে আসহাবে কাহফ শব্দটি ব্যবহার করা হয়। তারা এমন এক অঞ্চলে বাস করতেন যেখানকার শাসক ও অধিবাসীদের অধিকাংশ ছিলেন পৌত্তলিক। নবম-দশম শতকের মুসলিম ধর্মতত্ত্ববিশারদ আত-তাবারির (Muḥammad ibn Jarīr ibn Yazīd al-Ṭabarī) মতে- এই যুবকেরা রোমান অধিকৃত কোনো দেশের বাসিন্দা। তবে রোমের দেবদেবীর পুজো না করে তাঁরা আল্লাহর ইবাদত করতেন।

স্বাভাবিকভাবেই ভিন্ন এই ধর্মকে ভালো চোখে দেখেনি পৌত্তলিক শাসক ও তার সহচরেরা। নানা উপায়ে হেনস্থা করা হয় তাদের। অত্যাচারের মাত্রা বেড়ে গেলে শহর ছেড়ে নির্জনে পালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করলেন তাঁরা, উদ্দেশ্য নির্বিঘ্নে ধর্মকর্ম করা।

যুবকেরা শহর থেকে দূরে এক পাহাড়ের গুহায় লুকিয়ে পড়লেন,সাথে নিলেন তাঁদের পোষা কুকুরটি। শত্রুরা যখন তাদের হন্তদন্ত হয়ে খুঁজছে, তখন ক্লান্ত-শ্রান্ত হয়ে একপর্যায়ে ঘুমিয়ে পড়েন তাঁরা। স্রষ্টার নির্দেশে এই ঘুম দীর্ঘায়িত হয় কয়েকশো বছর। অনেক বিশেষজ্ঞের মতে- প্রায় ৩০৯ বছর ঘুমন্ত ছিলেন তাঁরা।

যখন যুবকদের ঘুম ভাঙল তখন তাঁরা বুঝতেই পারেননি কতটা সময় কেটে গেছে। তাঁদের ধারণা হলো কয়েক ঘন্টা হয়েছে মাত্র। রসদপত্র কিনতে সাথে থাকা মুদ্রা নিয়ে শহরে গেলেন এক যুবক। ধরা পড়লে নির্যাতনের শিকার হতে হবে এই আশঙ্কায় অবলম্বন করলেন গোপনীয়তা। দোকান থেকে মালামাল কিনে যখন টাকা দিতে গেলেন তিনি তখনই দোকানদাররা দেখতে পেল বহু বছর আগের মুদ্রা।

দ্রুত এই কথা ছড়িয়ে পড়ল শহরে। তাঁদের স্মরণে এলো পূর্বপুরুষদের থেকে শোনা গল্প, এক স্রষ্টার উপাসনা করতে পালিয়ে গিয়েছিল কয়েকজন যুবক। ততদিনে অনেক পরিবর্তন হয়েছে সেই দেশে, অবসান ঘটেছে পৌত্তলিক শাসকের। ফলে আর কোনো বিপদের মুখোমুখি হতে হয়নি তাঁদের।

ইসলামি সূত্রগুলোতে যুবকদের সংখ্যা নির্দিষ্ট করে উল্লেখ করা হয়নি, তাই এই বিষয়ে বিভিন্ন মতামত আছে। তিন, পাঁচ, সাত, এমনকি আটজনের কথাও বলা হয়। আত-তাবারির বক্তব্য- সঙ্গী কুকুরসহ এই যুবকদের সংখ্যা সাত, আট কিংবা নয় হতে পারে। কেবল যুবকদের হিসেব ধরলে মুসলিম পণ্ডিতদের একটা বড় অংশ সাতের পক্ষে রায় দেন। অষ্টম হিসেবে তারা একটি কুকুরকে অন্তর্ভুক্ত করেন, যার নাম আর-রাকিম বা কিতমির।

খ্রিষ্টীয় সংস্করণ

বাইবেলেও এই কাহিনী এসেছে আরেকটু বিস্তৃতরূপে। এর সাথে খ্রিষ্টীয় অন্যান্য সূত্র একত্র করলে একটা সময়কালও পাওয়া যায়- তৃতীয় শতকের মধ্যভাগ। রোমের মসনদে তখন ডেসিয়াস (Decius) নামে এক সম্রাট। তিনি ছিলেন চরমভাবে খ্রিষ্টানবিরোধী। ইতিহাস আমাদের বলে রোমান বাদে অন্য যেকোনো ধর্মের প্রতি খড়গহস্ত ছিলেন ডেসিয়াস।

সেই সময় বর্তমান তুরস্কের অন্তর্গত এফেসাস নগরীতে বাস করতেন বেশ কয়েকজন অভিজাত। তাঁরা সকলেই ছিলেন খ্রিষ্টধর্মের অনুসারী, যে কারণে তাঁদের ধর্মদ্রোহী হিসেবে চিহ্নিত করেন সম্রাট। ডেসিয়াসের লোকদের হাতে ধৃত হবার আশঙ্কায় অভিজাতেরা প্রস্তুত হলেন নিরাপদ জায়গায় সরে যেতে। সেই অনুযায়ী নিজেদের সম্পদ দরিদ্রদের মধ্যে বিলিয়ে দিলেন তাঁরা, কেবল সামান্য কিছু মুদ্রা নিয়ে চলে গেলেন এঞ্চিলোস পর্বতের এক গুহায় (Mount Anchilos)। তাঁদের উদ্দেশ্য সেখানেই ঈশ্বরের উপাসনা করতে করতে জীবন কাটিয়ে দেবেন।

ওদিকে সম্রাটের লোকেরা ধর্মদ্রোহীদের খুঁজতে চিরুনি অভিযান চালায়। তাঁদের লুকিয়ে রাখতে ঘুম পাড়িয়ে দেন ঈশ্বর, পাথর ধ্বসিয়ে বন্ধ করে দেন গুহামুখ। ফলে রোমান সৈন্যরা একেবারে কাছে চলে এলেও ঘুণাক্ষরেও টের পায়নি তাঁদের উপস্থিতি।

পঞ্চম শতকে এক লোক গবাদি পশু রাখার জন্য গুহামুখ খোলার কাজ শুরু করেন। সেই শব্দে জেগে ওঠেন ঘুমন্ত খ্রিষ্টানরা। তাঁদের ধারণাই ছিল না কত সময় পার হয়ে গেছে। ডায়োমেডেস নামে এক সঙ্গীকে পাঠানো হয় শহর থেকে সাবধানে খাদ্যদ্রব্য নিয়ে আসতে, যাতে রোমানরা কিছু টের না পায়। কিন্তু প্রাচীন মুদ্রার ফলে তাঁদের উপস্থিতি জানাজানি হয়ে যায়।

তখন ছিল রোমান সম্রাট দ্বিতীয় থিওডোসিয়াসের আমল। রোম তখন পুরোপুরিভাবে এক খ্রিষ্টীয় সাম্রাজ্য। তিনি গুহাবাসীকে সাক্ষাতের আমন্ত্রণ জানান। বলা হয়- তাঁর কাছে আনুপূর্বিক ঘটনা বিবৃত করে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন তাঁরা।

খ্রিষ্টীয় সূত্রেও তাদের সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক আছে। নজরানের লোকদের বিশ্বাস ছিল- তারা ছিলেন তিনজন, আবার নেস্টোরিয়ানরা দাবি করেন গুহাবাসীর সংখ্যা পাঁচ। তবে অধিকাংশ খ্রিষ্টান পণ্ডিত বলেন তারা সাতজন। তাদের নামও লিপিবদ্ধ করা আছে। তবে এই ব্যাপারে রোমান আর ইস্টার্ন অর্থোডক্স চার্চের মধ্যে মতানৈক্য আছে। রোমের নথিতে সাতজনের নাম এমন- ম্যাক্সিমিয়ান, ম্যালচাস, মার্সিয়ান, জন, ডেনিস, সেরাপিয়ন এবং কন্সট্যান্টিন। ইস্টার্ন অর্থোডক্স চার্চ বলে- তারা হলেন ম্যাক্সিমিলিয়ান, জ্যাম্বিলিখাস, মার্টিন, জন, ডাইনোসিয়াস, অ্যান্টোনিয়াস এবং কন্সট্যান্টিন।

ক্যাথলিক ধর্মাবলম্বীদের কাছে গুহাবাসীরা অত্যন্ত সম্মানিত। ভ্যাটিকান প্রতি বছর ২৭ জুলাই তাঁদের জন্য বিশেষ দিবস ঘোষণা করেছে। অর্থোডক্স চার্চে এখানেও ভিন্নতা বজায় রেখেছে। তাঁরা বছরে দুবার এই দিবস পালন করে। ৪ আগস্ট, যেদিন নাকি তাঁদের ঘুমের সূচনা, এবং ২২ অক্টোবর, তাঁদের জেগে ওঠার সময়।

লক্ষ্যণীয় বিষয় যে কুরআন এবং বাইবেলের মূল বর্ণনা কিন্তু অভিন্ন। তবে বাইবেলে কুকুরের কথা বলা নেই, যেটা আবার ইসলামি সূত্রগুলোতে আছে। সম্রাটের নামেও ভিন্নতা আছে। তাফসির আল-মুন্তাখান অনুযায়ী যখন যুবকেরা জেগে উঠেছিলেন তখন থিওডোসিয়াস নয়, ববরং চতুর্থ এন্টিওকাসের রাজত্ত্ব। সেক্ষেত্রে সময়টা হবে দ্বিতীয় শতক। কেউ কেউ মনে করেন এটা হাড্রিয়ানও হতে পারে।

ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতিতে গুহাবাসীর গল্প

মূলত ষষ্ঠ শতকে এই কাহিনী বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে, তৈরি হয় ভিন্ন ভিন্ন সংস্করণ। সপ্তম শতক নাগাদ অন্তত ২০০টি এমন গল্প প্রচলিত ছিল। অনেক বিশেষজ্ঞ দাবি করেন মূল কাহিনী লিপিবদ্ধ করেছিলেন সাইমন মেটাফ্রাস্তেস (Simeon Metaphrastes) নামে এক ব্যক্তি। তিনি একজন বাইজান্টাইন লেখক এবং ইস্টার্ন অর্থোডক্স চার্চ তাকে সাধুর সম্মান দিয়েছে। এর বাইরে ল্যাটিন ও সিরিয়াক ভাষাতেও পাওয়া যায় গুহাবাসীদের কথা। ট্যুরসের সেইন্ট গ্রেগরির হাতে সম্ভবত প্রথম ল্যাটিন রূপটি রচিত, আর সিরিয়াকে রূপান্তর করেছে জেকব (Jacob of Serugh) নামে আরেক ব্যক্তি। নর্স ভাষার লেখা এবং নরম্যান শাসিত ইংল্যান্ডে আবিষ্কৃত কবিতাতেও পাওয়া যায় এমন ঘটনা।

ইহুদি ধর্মগ্রন্থে অবশ্য ঘুমন্ত গুহাবাসীর উল্লেখ নেই। কারণ হিসেবে বলা হয়- এই ঘটনা আরো পরের, ফলে তাঁদের গ্রন্থে সেটা স্থান পায়নি। স্থান-কাল সুনির্দিষ্ট করে অবশ্য জানা না গেলেও এফেসাস নগরে তৃতীয় শতকে এই ঘটনা সংঘটিত হয় মনে করেন অধিকাংশ গবেষক। এজন্য একসময় সেখানে প্রচুর তীর্থযাত্রীর সমাগম ঘটত।

References
  • Cosentino, A. (2024).The Seven Sleepers of Ephesus in the Christian and Islamic magical tradition. EURAS Journal of Social Sciences; 4 (1): 7-23.
  • Rahman, Mohamad & Zikrullah, & Muhajir, Mohamad & Ghazali, Muhammad & Harwanto, Aditya. (2024). The Seven Sleepers (Ashabul Kahf) in the Holy Bible and Qur’an: Lessons for Organic Youth Movements. Peradaban Journal of Religion and Society. 3. 147-156.
  • Grysa, B. (2015). The Legend of the Seven Sleepers of Ephesus in Syriac and Arab sources – a comparative study. Orientalia Christiana Cracoviensia. 2. 45. 10.15633/ochc.1011.
  • Seven Sleepers of Ephesus. Encyclopedia Britannica.
This post was viewed: 30

আরো পড়ুন