Skip to main content

Ridge Bangla

আলজেরিয়ার স্বাধীনতা যুদ্ধ: ঔপনিবেশিক শক্তির হাত থেকে মুক্তির আখ্যান

একসময় উত্তর আফ্রিকার বার্বার রাজ্যগুলোর অন্যতম ছিল আলজেরিয়া। বহুদিন পর্যন্ত ভূমধ্যসাগরে ইউরোপিয়ান শক্তিগুলোকে তটস্থ করে রাখা জলদস্যুদের অন্যতম কেন্দ্র ছিল আলজিয়ার্সে। তবে ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে তাদের প্রতাপ। ১৮৩০ সালে আলজেরিয়া দখল করে নেয় ফ্রান্স, শুরু হয় ঔপনিবেশিক শাসন।

স্বাধীনতার পথে যাত্রা

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় থেকেই আরম্ভ হয় আলজেরিয়ার স্বাধিকার লাভের আন্দোলন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে প্রাক্কালে অধিকতর স্বায়ত্বশাসনের লোভ দেখিয়ে উপনিবেশের সমর্থন আদায় করে ফরাসিরা, তবে যুদ্ধের পর বেমালুম ভুলে যায় সেই প্রতিশ্রুতি।

১৯৫৪ সালে ন্যাশনাল লিবারেশন ফ্রন্ট/এফএলএন (National Liberation Front/ Front de Libération Nationale) শুরু করে গেরিলা যুদ্ধ। জাতিসংঘের কাছে স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বীকৃতিও দাবি করে তারা। এফএনএলকে কেবল ফরাসি প্রভু নয়, তাদের বশংবদ আলজেরিয়ানদের বিরুদ্ধেও লড়তে হয়েছিল। আট বছরের এই সংঘর্ষের ফলশ্রুতিতেই মুক্ত হয় আলজেরিয়া, পতন ঘটে যুদ্ধ পরবর্তী চতুর্থ ফরাসি প্রজাতন্ত্রের। চার্লস দ্যু গলের (Charles de Gaulle) হাত ধরে স্থাপিত হয় পঞ্চম প্রজাতন্ত্র (Fifth Republic)।

লড়াইয়ের স্ফুলিঙ্গ

১৯৫৪ সালের পয়লা অক্টোবর এফএলএনের কার্যক্রম প্রকাশ পায়। আলজেরিয়া জুড়ে স্বাধীনতার স্বপক্ষে প্রচুর লিফলেট বিলি করে তারা। দেশকে মুক্ত করতে দ্বৈত উপায়ের অবতারণা করা হয় প্রচার-প্রচারণায়।

এক. আলজেরিয়ার ভূমিতে ফরাসী শক্তির বিরুদ্ধে সশস্ত্র লড়াই।
দুই. আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কূটনীতির মাধ্যমে নিজেদের পক্ষে সমর্থন তৈরি।

বাটনা (Batna) আর অরেস (Aurès) এই দুই জায়গায় প্রাথমিকভাবে লড়াই শুরু হয়। সুপ্রশিক্ষিত ফরাসিরা সহজেই পরাজিত করে গেরিলাদের। গণগ্রেফতারে আটক হয় এমটিএলডি (Movement for the Triumph of Democratic Liberties) নামে একটি রাজনৈতিক দলের প্রায় ২০০০ সদস্য। এফএলএনের নেতারা একসময় এই দলের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন বটে, কিন্তু এমটিএলডি প্রকাশ্যে এই বিদ্রোহের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিল।

দ্রুতই সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে আলজেরিয়া জুড়ে। রাজধানী থেকে দূরে দুর্গম কাবাইলিয়া (Little Kabylia) আর অরেস পর্বতাঞ্চল পরিণত হয় গেরিলাদের শক্ত ঘাঁটিতে। ফরাসিদের নিয়ন্ত্রণ সীমিত হয়ে পড়ে শহর এলাকায়। বিদ্রোহ দমনে আট বছরে প্রায় দুই মিলিয়ন নাগরিককে সেনাদায়িত্ব পালনের জন্য ডেকে পাঠিয়েছিল ফরাসিরা।

১৯৫৫ সালে এফএলএন শহরাঞ্চলে ফরাসি লক্ষ্যবস্তুর ওপর হামলা জোরদার করে। ফরাসি সংসদ আলজেরিয়ায় জরুরি অবস্থা জারির পক্ষে ভোট দেয়। নতুন গভর্নর জেনারেল হিসেবে তারা পাঠায় জ্যাকুইস সুস্তেলকে (Jacques Soustelle)।

সেই বছরের আগস্টে ঘটে যায় দুর্ভাগ্যজনক এক ঘটনা। কন্সট্যান্টাইন অঞ্চলের উত্তরাংশে গেরিলাদের সাথে সংঘর্ষের ফলে প্রাণ হারায় প্রায় ১০০ বেসামরিক নাগরিক। এর মধ্যে ইউরোপিয়ান ছাড়াও ছিল স্থানীয় মুসলিম কর্মকর্তারা। সুস্তেল কঠোর পদক্ষেপের ঘোষণা দেন, শুরু হয় ব্যাপক ধরপাকড়।

সরকারি হিসেবমতে ১২৭৩ জন বিদ্রোহীকে হত্যা করেছিল তারা। তবে এফএলএন এবং নানা গণমাধ্যমের হিসেব মতে এই সংখ্যা আসলে ১২০০০, এবং এর মধ্যে সাধারণ নাগরিকই ছিল বেশি। কেবল ফরাসি সেনাবাহিনী নয়, তাদের লেজুড়বৃত্তি করা পুলিশ এবং স্থানীয় ফরাসি নাগরিকদের দ্বারা গঠিত সহিংস গ্যাংও নির্বিচার হত্যাযজ্ঞে মত্ত হয়েছিল। ফরাসিরা এই সংঘর্ষকে যুদ্ধ বলে স্বীকৃতি দিতে নারাজ ছিল, কারণ তাহলে জেনেভা কনভেনশন মেনে চলার বাধ্যবাধকতা দেখা দেবে। সুতরাং নীতিনৈতিকতা শিকেয় তুলে রাখতে সমস্যা হয়নি তাদের।

সুস্তেলের বাড়াবাড়িতে সাধারণ জনগণের সমর্থন হারায় ফরাসিরা, বাড়তে থাকে এফএলএনের জনপ্রিয়তা। ১৯৫৬ আর ৫৭ সালজুড়ে বেশ কিছু সফল গেরিলা আক্রমণ পরিচালনা করে বিদ্রোহীরা। সেনাচৌকি, পুলিশ স্টেশন, গুরুত্বপূর্ণ খনি, খামার, সেতু আর রাস্তাঘাট তাদের নিশানায় পরিণত হয়। ঝটিকা হামলা করেই দুর্গম এলাকায় পালিয়ে যেত তারা। এই হুমকি মোকাবেলায় প্রায় অর্ধ মিলিয়ন নতুন সেনা আলজেরিয়াতে পাঠায় ফরাসিরা।

সশস্ত্র সংগ্রামের পাশাপাশি দেশ চালানোর জন্যেও প্রস্তুত হচ্ছিল এফএলএন। ১৯৫৬ সালের অনুষ্ঠিত হয় তাদের প্রথম সম্মেলন। সেখানে দেশকে ছয় ভাগে ভাগ করে প্রতি ভাগের জন্য একজন করে সমরপ্রধান নিযুক্ত করেন দলনেতারা। দলের উদ্দেশ্য নিয়ে একটি সনদও প্রকাশ করে তারা।

ব্যাটল অব আলজিয়ার্স

১৯৫৬-৫৭ সালে এফএলএন গ্রাম্য এলাকার বাইরে কার্যক্রম সম্প্রসারিত করে। রাজধানীতে থাকা ফরাসি প্রশাসনকে ব্যতিব্যস্ত করাই ছিল তাদের লক্ষ্য। বিচ্ছিন্নভাবে সরকারি সেনাদের সাথে গেরিলাদের বেশ কিছু সঙ্ঘর্ষ সংঘটিত হয়। সব মিলিয়ে যুদ্ধের এই পর্যায় পরিচিত আলজিয়ার্সের লড়াই (Battle of Algiers) নামে।

বিদ্রোহ দমনে চরমপন্থা অবলম্বন করে ঔপনিবেশিক শক্তি। আন্তর্জাতিক রীতিনীতির বাইরে গিয়ে নির্যাতন, গুম, নির্বিচার হত্যা সবধরণের অপরাধেই নাম লেখায় ফরাসি সেনাবাহিনী। বহু মানুষকে বিমানে তুলে আকাশ থেকে পানিতে ফেলে মেরে ফেলে তারা। এই পদ্ধতি পরিচিত ছিল ডেথ ফ্লাইট (Battle of Algiers) নামে। অগণিত সাধারণ নাগরিককে খুন করা হয় বিদ্রোহের সাথে জড়িত থাকার অভিযোগ তুলে।

ফরাসিরা সফল হয়েছিল এফএলএনের মূল নেতৃত্ব অপসারণ করতে। তাদের অনেকে নিহত হয়, বাকিরা পালায়। কিন্তু সাধারণ আলজেরিয়ানদের সমর্থন হারিয়ে ফেলে ফরাসিরা। এফএলএনের প্রতি সমর্থন ছিল না এমন মানুষও তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে পড়ে। খোদ ফ্রান্সেই বামপন্থী দলগুলো সোচ্চার হয় ফরাসি বাহিনীর বিরুদ্ধে। সরকার সব অভিযোগ অস্বীকার করে। বিরুদ্ধমতের বহু সংবাদপত্র, বই এবং চলচ্চিত্র নিষিদ্ধ করে তারা।

নতুন সরকার

আলজেরিয়ার সীমান্ত সংলগ্ন তিউনিসিয়ার বিভিন্ন এলাকায় এফএলএনের কিছু উপদল ছিল। তাদের দমন করতে সেখানে অবস্থান নেয় ফরাসি সেনারা। ১৯৫৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে এক গ্রামে এফএলএনের ঘাঁটি লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালায় ফরাসিরা। হতাহতের মধ্যে ছিল স্কুলশিশু ও বেসামরিক লোকজন। আন্তর্জাতিক মহলে শোরগোল পড়ে যায় এই নৃশংস ঘটনায়। যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের চাপে তিউনিসিয়া থেকে সৈন্য প্রত্যাহারে বাধ্য হয় ফ্রান্স।

এপ্রিলে প্রতিবেশী মরক্কো এবং তিউনিসিয়ার উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হয় সম্মেলন। আলজেরিয়ার প্রতিনিধি হিসেবে আমন্ত্রিত ছিল এফএলএন। তারা একটি স্বাধীন রাজনৈতিক সরকার গঠনের ঘোষণা দেয়। এর পাঁচ মাস পর ফারহাত আব্বাসের নেতৃত্বে দায়িত্ব নেই এই সরকার।

এদিকে আলজেরিয়াতে ফরাসি বসতি স্থাপনকারী এবং স্থানীয়দের মধ্যে বিরোধ চরমে ওঠে। মে মাসে গভর্নর জেনারেলের কার্যালয় ঘেরাও করে উত্তেজিত ফরাসিরা। সেনাবাহিনীর মদদে হাঙ্গামা করতে থাকে তারা, দাবি করে আলজেরিয়াকে অবিলম্বে ফ্রান্সের সাথে একীভূত করা হোক। পরিস্থিতি সামলাতে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বীর চার্লস দ্য গলকে অনুরোধ করেন।

নতুন সূচনা

প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়ে দ্য গল ঘোষণা দেন সকল আলজেরিয়ান মুসলিম ফরাসি নাগরিকত্ব পাবেন। তবে তাতে আলজেরিয়ানদের ক্ষোভ স্তিমিত হল না, বরং ১৯৬০ সালে দেশজুড়ে এই দাবিতে বিক্ষোভ ব্যাপক আকার ধারণ করে। ততদিনে আগের ফরাসি সরকার পদত্যাগ করেছে, নতুন প্রেসিডেন্ট দ্য গল সংবিধান সংশোধন করে পত্তন করেছেন ফিফথ রিপাবলিক।

জাতিসংঘ তাকে চাপ দেয় আলজেরিয়ার বিষয় নিষ্পত্তি করার জন্য। দ্য গল বুঝতে পারলেন আলজেরিয়ার স্বাধীনতার প্রশ্ন তাদের নাগরিকদের হাতেই ছেড়ে দিতে হবে। তিনি এফএলএনের সাথে আলোচনা আরম্ভ করেন, প্রত্যাহার করে নেন ফরাসি সেনাদল।

সামরিক বাহিনীর একটি অংশ দ্য গলের এই পদক্ষেপ সুনজরে দেখেনি। বেশ কয়েকবার তাকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়। অন্তত চারজন জেনারেল ক্যুর চেষ্টা করেন। কিন্তু সেনাবাহিনীর মূল অংশ প্রেসিডেন্টের পক্ষে থাকায় ভেস্তে যায় তাদের প্ল্যান। দ্য গল অনড় থাকেন, ১৯৬১ সালের মে’তে ফারহাত আবব্বাসের সরকারের সাথে আলাপ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়।

মতপার্থক্যের জেরে অবশ্য জুলাইতে ভেস্তে যায় আলোচনা। এরপরেই আব্বাসের জায়গায় আসেন বেন খেদা (Benyoussef Ben Khedda)। সমঝোতার পথে কাঁটা তৈরি করতে ওদিকে একজোট হয় বসতি স্থাপনকারীরা, সিক্রেট আর্মি অর্গানাইজেশন (Organisation de l’ArméeSecrète/OAS) নামে একটি সংগঠন তৈরি করে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে তারা।

তবে সমস্ত কূটচাল ব্যর্থ করে পরের বছরের মার্চে নতুন করে সভায় বসে দুই পক্ষ। এবার মতৈক্যে পৌঁছায় সবাই, স্বাক্ষরিত হয় এভিয়ান চুক্তি (Évian Accords)। ফরাসি শাসনের পরিবর্তে অস্থায়ী আলজেরিয়ান সরকার ক্ষমতা নেয়। ঠিক হয় তারা গণভোটের আয়োজন করবে। যদি সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ স্বাধীনতার পক্ষে ভোট দেয় তাহলে নতুন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে আলজেরিয়া। ইত্যবসরে অব্যাহত থাকবে ফরাসি সাহায্য সহযোগিতা। আলজেরিয়াতে বসবাস করা ইউরোপিয়ানদের জন্য দেয়া হয় তিনটি বিকল্প- চলে যাওয়া, বিদেশী হিসেবে আলজেরিয়াতে থাকা, অথবা নাগরিকত্ব গ্রহণ।

১৯৬২ সালের জুলাই মাসে অনুষ্ঠিত হয় বহুল প্রতীক্ষিত গণভোট। শতকরা ৯৯ ভাগেরও বেশি মানুষ ভোট দেন স্বাধীনতার পক্ষে। চুক্তি মোতাবেক দ্য গলের সরকার স্বীকৃতি দেয় নতুন রাষ্ট্রকে। পরাধীনতার নাগপাশ থেকে মুক্ত হয় দেশটি।

আলজেরিয়ার স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছিল বহু রক্তের বিনিময়ে। ফরাসি সরকারি হিসেবে প্রায় পাঁচ লাখ আলজেরিয়ান হতাহত হয়েছিল, এদের সিংহভাগ ছিল বেসামরিক নাগরিক। তবে আলজেরিয়ানদের নথিপত্র অনুযায়ী এই সংখ্যা দেড় মিলিয়নের কম নয়। ফরাসিরা হারিয়েছিল ২৭০০০ সেনা এবং ৬০০০ এর মতো বসতি স্থাপনকারীকে।

References
This post was viewed: 68

আরো পড়ুন