Skip to main content

Ridge Bangla

জনসংখ্যা কমছে, বাড়ছে চিন্তা: ভবিষ্যৎ পৃথিবীর সামনে নতুন এক সংকট

আমরা জনসংখ্যা বৃদ্ধিকে সবসময় সমস্যা হিসাবে চিহ্নিত করে আসলেও বর্তমান সময়ে জনসংখ্যা হ্রাস পাওয়াটাই বরং বৈশ্বিক সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে। জনসংখ্যা স্থিতিশীল রাখতে প্রজনন হার হওয়া উচিত প্রতি একজন মায়ের ২.১ করে। ১৯৫০ সালে বৈশ্বিক প্রজনন হার যেখানে ছিল ৪.২, সেখানে ২০২১ সালে সেটা নেমে এসেছে ২.২ এ।

২০২৩ সালে চীনকে টপকে বিশ্বের জনবহুল দেশের শীর্ষে চলে আসে ১৪৬ কোটি জনসংখ্যার ভারত। কিন্তু তা সত্ত্বেও তাদের প্রজনন হার মাত্র ১.৯, যেটা জনসংখ্যা স্থিতিশীল রাখার জন্য প্রয়োজনীয় হারের নিচে। বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে এই হার ছিল ৬।

অন্যদিকে চীন যেখানে দীর্ঘসময় সবচেয়ে জনবহুল রাষ্ট্র ছিল, ২০২২ সালে ৬ দশকের মধ্যে প্রথমবারের মতো তাদের জনসংখ্যা ৮.৫ লক্ষ কমে যায়। ২০২৩ ও ২০২৪ সালেও এই ধারাবাহিকতা বজায় রেখে যথাক্রমে ২০ লক্ষ ও ১৩.৮ লক্ষ জনসংখ্যা কমে যায়। তাদের প্রজনন হার মাত্র ১.০।

ইউরোপীয় দেশগুলোর প্রতিটিতেই প্রজনন হার ২.১ এর নিচে। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়ার জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারও ঋণাত্বক। বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ দেশ। এখানে প্রতি বর্গমাইলে ৩,২৭২ মানুষ বাস করলেও প্রজনন হার মাত্র ২.২। এই প্রবণতা চলতে থাকলে বৈশ্বিক জনসংখ্যা বর্তমানের ৮০০ কোটি থেকে ২০৮০ সালে সর্বোচ্চ ১,০০০ কোটিতে পৌঁছাবে, ২১০০ সালে গিয়ে সেটা কমে আবার ৯৮৮ কোটিতে নেমে আসবে।

জনসংখ্যা কমে যাওয়া সকল দেশের জন্যই উদ্বেগজনক। কারণ, এতে কর্মক্ষম তরুণ জনসংখ্যা কমে যাবে। বয়স্ক জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে। তরুণ জনসংখ্যা কেবল কর্মক্ষম জনশক্তিই বাড়ায় না, তারা নিত্যনতুন ধারণা নিয়ে আসে। অর্থনীতির চাকা সচল রাখে। বয়স্ক জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকলে অর্থনীতি কেবল স্থবিরই হবে না, বরং অবনতি হতে পারে। অচিরেই হয়তো স্কুলগুলো পরিণত হবে বৃদ্ধাশ্রমে। হাসপাতালগুলো হয়ে পড়বে বয়স্ক রোগীদের দিয়ে পূর্ণ। অন্যদিকে বয়স্ক মানুষদের দেখাশোনা করার মতো লোকের সংকট দেখা দেবে।

জাপানের জনসংখ্যা ২০১০ থেকেই হ্রাস পাচ্ছে। কর্মক্ষেত্রে নারী আর ৬৫-৭৪ বছর বয়স্কদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় এখনো কর্মক্ষম জনশক্তি কমে যাওয়াটা দৃশ্যমান হচ্ছে না। কিন্তু এভাবেও এই সংকট মোকাবেলা করা বেশিদিন টেকসই হবে না।

জনসংখ্যা হ্রাস পাওয়া নিয়ে অর্থনৈতিক সংকট নিয়ে উদ্বেগ থাকলেও জলবায়ু এক্টিভিস্টদের ইতিবাচকতা দেখা যায় এতে কার্বন নিঃসরণ কমে আসবে। কারণ ৭০ বছরের উর্ধ্বের বয়স্ক মানুষরা বাড়িতে বেশি সময় অবস্থান করে এবং সাধারণত একা থাকে। এতে বিদ্যুতের ব্যবহার তুলনামূলক বেশি হবে। কার্বন নিঃসরণও বেশি হবে।

জনসংখ্যা হ্রাসের পেছনে ডানপন্থীরা জন্মনিয়ন্ত্রণ আর প্রজনন ক্ষমতা হ্রাস পাওয়াকে দায়ী করে থাকে। কিন্তু বিষয়টি এত সরল নয়। বর্তমানে বাচ্চা জন্ম দেওয়া কিংবা এর লালনপালন করা খুবই ব্যয়বহুল। সন্তানের শিক্ষা খাতের ব্যয়ও প্রচুর। তরুণ দম্পতিদের জন্য এটা সাধ্যের সীমার বাইরে। বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতি আর আবাসন ব্যয় বৃদ্ধিও এর অন্যতম কারণ।

নারীদের কর্মসংস্থান আর সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা বৃদ্ধি পাওয়ায় সন্তান নেওয়ার ক্ষেত্রে মায়েদের বয়স এখন বৃদ্ধি পেয়েছে। ৩০ পরবর্তী বয়সে বাচ্চা নেওয়ার হার প্রাকৃতিকভাবেই হ্রাস পায়। তাছাড়া উন্নত দেশগুলোতে এখন সন্তান নেওয়ার চেয়ে ভ্রমণ, ক্যারিয়ার, বিনোদনই বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে।

এসব কারণে দেশগুলোর সরকার জনসংখ্যা বৃদ্ধিতে উৎসাহ দিয়ে নীতিমালা প্রণয়ন করলেও তা যথেষ্ট মনে করছে না তাদের জনগণ। চীন একসময় ‘এক সন্তান নীতি’ কঠোরভাবে প্রয়োগ করেছিল, যা তারা ২০১৫ সালে রদ করে। কিন্তু এখন তিন সন্তান নীতিতে গিয়েও তারা জনসংখ্যা বৃদ্ধিতে দেশবাসীকে উৎসাহ দিতে পারছে না। কারণ সেই একই- জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধি। সন্তান নেওয়াকে এখন বিশ্বজুড়েই ‘ঝামেলা’ হিসাবে দেখা হচ্ছে।

কট্টর ডানপন্থীরা জন্মনিয়ন্ত্রণ নিষিদ্ধ করে জোরপূর্বক নীতিমালা প্রণয়নের চাপ দিচ্ছে। কিন্তু এসব চাপিয়ে দেওয়া নীতিমালা চীনের এক সন্তান নীতির মতোই সংকট আরো বাড়িয়ে দেবে। সংকট মোকাবেলায় অভিবাসনকে সমাধান হিসাবে দেখার চেষ্টা করা হচ্ছে। কিন্তু এটাও দীর্ঘমেয়াদে সমাধান আনতে পারবে না। কারণ, অন্য দেশ থেকে কর্মক্ষম জনশক্তি আনলেও প্রজনন হার তো বৈশ্বিকভাবেই হ্রাস পাচ্ছে। অর্থাৎ, নবজাতকের সংখ্যা খুব বেশি বাড়বে না। তাছাড়া, পশ্চিমা দেশগুলোতে বর্তমানে ডানপন্থীদের উত্থান হওয়ায় অভিবাসীদের প্রতি ঘৃণার মাত্রাও বৃদ্ধি পাচ্ছে।

জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার সচল রাখার ক্ষেত্রে তরুণ জনসংখ্যার কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, আবাসন ব্যয় হ্রাস, সন্তান নেওয়ার ক্ষেত্রে কর মওকুফ বা হ্রাস করার মতো সুবিধা, মাতৃকালীন ছুটির পাশাপাশি বাবাদের জন্যও ছুটির ব্যবস্থা করা, সর্বোপরি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাই উৎসাহ দিতে পারে।

তবে এটা নিয়ে এখনই আতঙ্কিত হয়ে যাওয়ার পর্যায়ে চলে যায়নি। জনসংখ্যা এই হারে হ্রাস পেতে থাকলে এর চরম প্রভাব পড়বে ২২০০ সালের পর। সে হিসাবে সংকট উত্তরণের জন্য আমাদের হাতে যথেষ্ট সময় আছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অগ্রগতিতে এই সংকট মোকাবেলা করা অনেকটাই সহজ হবে বলে আশাবাদী বিশেষজ্ঞরা।

This post was viewed: 52

আরো পড়ুন